বিষ্ণু সংহিতা,অত্রিসংহিতায় কি আদৌ একাদশীতে সধবা নারীদের উপবাস পালনে নিষেধ করা হয়েছে?
এক শ্রেণীর নামধারী পুরোহিত তারা তো একাদশী ব্রত উপবাস পালন করে না,কিন্তু যারা একাদশী পালন করে তাদের মধ্যে যারা সধবা তাদের একাদশী পালন করতে বাঁধা প্রদান করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষ্ণুসংহিতা(বিষ্ণুস্মৃতি) এবং অত্রিসংহিতা(অত্রিস্মৃতি) থেকে প্রমান দেখাচ্ছে। “পত্যৌ জীবতি যা যোষিদুপবাসব্রতং চরেৎ। আয়ুঃ সা হরতে ভর্ত্তুর্নরকঞ্চৈব গচ্ছতি।।” ( বিষ্ণু সংহিতা ২৫/১৬) অনুবাদঃ যে স্ত্রী স্বামী জীবিত থাকতে উপবাস ব্রতের আচরন করে, সে স্বামীর আয়ু হরণ ও নরক গমন করে। তাই স্বামী জীবিত থাকতে উপবাস বাঞ্ছনীয় নয়। জীবদ্ভর্ত্তরি যা নারী উপোষ্য ব্রতচারিণী। আয়ুষ্যং হরতে ভর্ত্তুঃ সা নারী নরকং ব্রজেৎ।। (অত্রিসংহিতা ১৩৬নং শ্লোক।) অনুবাদঃ যে নারী স্বামী জীবিত থাকিতে উপবাস করিয়া ব্রত করে,সে নারী স্বামীর আয়ু হরণ করে ও নরকে গমন করেন। পাঠকগণ কৃপা করে উপরোক্ত বিষ্ণু সংহিতা ২৫/১৬,এবং অত্রিসংহিতা ১৩৬নং শ্লোক পর্যবেক্ষণ করে দেখুন উক্ত শ্লোক দুইটিতে কোথাও স্পষ্ট করে একাদশীতে উপবাস পালনে নিষেধ করা হয় নি,বরং উপবাস মাত্রেই সধবাদের পালনে নিষেধ করা হয়েছে। অথচ আমরা দেখি এই সমস্ত পুরোহিতরা সনাতনী সধবাদেরকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার সময় লক্ষ্মীপূজার উপবাস, দুর্গা পূজার অষ্টমী দিনে দূর্গাষ্টমী উপবাস,শিব চতুর্দশী সময় শিব রাত্রীর উপবাস, সন্তোষী মাতার পূজার সময় সন্তোষীর উপবাস,কালীর পূজার সময় কালীর উপবাস,লোকনাথ বাবার পূজার সময় লোকনাথ উপবাস,কার্তিক পূজার সময় কার্তিকের উপবাস,সূর্য পূজার সময় সূর্যের উপবাস,অশ্বিনীকুমারের ব্রত অন্ন রান্নার সময় উপবাসের বিধান দেয়।আর কোন সধবা যদি উপবাস ছাড়া এসমস্ত দেবদেবীর পূজা করতে চাই,তাদের নামে কোন সংকল্প করা হয় না।যদি সধবা নারীরা এসমস্ত দেবদেবীর পূজার সময় উপবাস পালন করতে পারে,তাহলে একাদশী উপবাস পালন করার সময় তাদের কেন এ নিষেধাজ্ঞা?আমরা বুঝতে পারি এসবের মূলে আছে বৈষ্ণবদের প্রতি ঘৃনা,কারন বৈষ্ণবরা বিশেষভাবে একাদশী ব্রত পালন করে।আর একাদশী পালনে জীবের ভগবান শ্রীবিষ্ণুতে প্রেমভক্তি লাভ হয়, তাই এসমস্ত নামধারী পুরোহিতগণ তা সহ্য করতে পারে না। পদ্মপুরাণে স্পষ্টভাবে ৮-৮০ বছর বয়সী সকল নারী পুরুষের জন্য একাদশীতে উপবাস পালনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ঈশ্বরের প্রীতির জন্য উপবাস পালন করা হয় তাহলে সেখানে কিভাবে পাপ হবে,এটির তো কোন যুক্তি থাকতে পারে না।আর তাছাড়া বেদ শাস্ত্রে নারী, পুরুষ, সধবা,বিধবা সহ সকল মানব জাতিকে ঈশ্বরের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য উপবাস পালন করার নির্দেশ করা হয়েছে । এ বিষয়ে নিমোক্ত লিংকে পাঠ করুন। বেদে কি একাদশী উপবাসের কথা বলা হয়েছে? বেদে কি একাদশী উপবাসের কথা বলা হয়েছে? সুতরাং বেদে ঈশ্বরের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য সকল মানব জাতিকে উপবাস পালন করার কথা বলা হয়েছে । আর ভক্তরা একাদশী তিথিতে পরমেশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য উপবাস পালন করে। পরিশেষে বেদে কোন ভেদাভেদ ব্যতীত সধবা, বিধবা সহ সকল মানবজাতিকে ঈশ্বরের সন্তুষ্টির জন্য উপবাস পালন করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও শ্রীমদ্ভাগবত পদ্মপুরাণসহ ১৪ টি শাস্ত্র প্রমানে সধবাদের একাদশী ব্রত পালন করতে উপদেশ করা হয়েছে। সুতারাং এতগুলি শাস্ত্রে একযোগে ভূল তথ্য থাকতে কখনো পারে না। তাই আমাদের সিদ্ধান্ত হল বিষ্ণুসংহিতা (বিষ্ণুস্মৃতি) এবং অত্রিসংহিতা(অত্রিস্মৃতি) সহ অধিকাংশ স্মৃতি নাস্তিকের প্রলোভনে বিক্রি হয়ে নামধারী পুরোহিত দ্বারা কলুষিত হয়েছে বা ভেজাল ডুকানো হয়েছে।তাই এসমস্ত স্মৃতিগুলি পাঠকালে পাঠকদের এসমস্ত বিষয় সম্পর্কে জানা থাকা আবশ্যক। এখন আমরা নিমোক্ত শাস্ত্র প্রমানে সধবা নারীদের যে একাদশীতে উপবাস পালন করতে উপদেশ করা হয়েছে, এ বিষয়ে পাঠ করব- ১)ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রণাঞ্চৈব যোষিতাম্। মোক্ষদং কূর্ব্বতাং ভক্ত্যা বিষ্ণো:প্রিয়তরং দ্বিজাঃ।। [ বৃহন্নারদীয় পুরাণ, অধ্যায়-২১ শ্লোক-২ ] বঙ্গানুবাদ:”ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য,শুদ্র এবং বিবাহিত স্ত্রীলোক – ইহাদিগের মধ্যে যে কোন ব্যক্তি হউক, ভক্তি পূর্ব্বক একাদশী ব্রত পালন করে মুক্তি লাভ করতে পারে।” (২)পতিসহিতা যা যোষিৎ করোতি হরিবাসরম্ । সুপুত্ৰা স্বামিসুভগা যাতি প্রেত্য হরের্গৃহম॥ ৭৬ যো যচ্ছতি হরেরগ্রে প্রদীপং ভক্তিভাবতঃ। হরের্দিনে দ্বিজশ্রেষ্ঠ পুণ্যসঙ্গ্যা ন বিদ্যতে ॥৭৭ যাঙ্গনা ভর্ত্তৃসহিতা কুরুতে জাগরং হরেঃ। হরের্নিকেতনে তিষ্ঠেচ্চিরং পত্যা সহ দ্বিজ ॥৭৮ [ পদ্মপুরাণ, স্বর্গখন্ড, অধ্যায় ৪৪, শ্লোক- ৭৬-৭৮ ] বঙ্গানুবাদ:”যে স্ত্রী পতি সহ একাদশীব্রত করে, সে সুপুত্রা স্বামি-সুভাগা হয়, মরণান্তে হরিগৃহ বৈকুন্ঠে যায়। দ্বিজ শ্রেষ্ঠ! একাদশীতে ভক্তিভাবে যে জন হরির অগ্রে প্রদীপ দান করে, তাহার পুণ্যের সংখ্যা নাই অর্থাৎ অগণিত পুণ্য লাভ করে । আর যে স্ত্রী স্বামীর সহিত একাদশীতে রাত্রি জাগরণ করে, সে চিত্রকাল পতি সহ হরির নিকেতনে বাস করে।” ৩)যা নারী স্বামীসহিতা কুর্য্যাচ্চ হরিবাসরম। সুপুত্রা ভর্ত্তসুভগা ভবেৎ সা প্রতিজন্মানি।। [ পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মখন্ড, ৫।১৯ ] বঙ্গানুবাদ:”যে নারী স্বামীর সাথে একাদশীব্রত করে, সে জন্মে জন্মে সপুত্রা ও স্বামীসুভগা হয়।” (৪)যা নারী ভর্ত্তৃসহিতা করোত্যেকাদশীব্রতম্। সুপ্ৰজা স্বামিসুভগা সা ভবেৎ প্রতিজন্মনি। স্বামিনা সহ যা নারী কুরুতে জাগরং হরেঃ। সা তিষ্ঠেদ্বিষ্ণুভবনে চিরং ভর্ত্রা সহ দ্বিজ ।। [ পদ্মপুরাণ, ত্রিয়াযোগসারঃ অধ্যায়-২২ শ্লোক- ১০৫ ] বঙ্গানুবাদ:”যে নারী স্বামীর সাথে একাদশীব্রত করে, সে জন্মে জন্মে সুপুত্রা ও স্বামীসুভগা হয়। আর যে নারী স্বামীর সঙ্গে জাগরানুষ্ঠান করে, সে স্বামীর সাথে সুচিরকাল বৈকুন্ঠধামে অবস্থান করে।” ৫)দুর্ভাগা যা করোত্যেনাং সা স্ত্রী সৌভাগ্যমাপ্নুয়াৎ। লোকানাঞ্চৈব সর্ব্বোষাং ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী।। [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪৮।৪ ] বঙ্গানুবাদ:”কোন দুর্ভাগা স্ত্রী যদি একাদশী ব্রত আচরণ করেন, তিনি সৌভাগ্য লাভ করেন। এই একাদশী ব্রত সর্বলোকের ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী, সর্ব্বপাপহারিণী ও গর্ভবাসনিবারিণী।” (৬)সপুত্রশ্চ সভাৰ্য্যশ্চ স্বজনৈৰ্ভক্তিসংযুতঃ। একাদশ্যামুপবসেৎ পক্ষয়োরভয়োরপি ॥ [ বিষ্ণুধর্মোত্তর, হ.ভ.বি., ১২।৪৭ ] বঙ্গানুবাদ:”পুত্র, ভার্যা (পত্নী) ও স্বজনবর্গের সহিত ভক্তিযুক্ত হয়ে উভয়পক্ষের একাদশীতে উপবাস কর্তব্য।” ৭)আরিরাধয়িষুঃ কৃষ্ণং মহিষ্যা তুল্যশীলয়া । যুক্তঃ সংবৎসরং বীরো দধার দ্বাদশীব্রতম্ ॥ [ শ্রীমদ্ভাগবতম ৯।৪।২৯ ] অনুবাদ:”ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আরাধনা করার জন্য অম্বরীষ মহারাজ তারই মতো গুণবতী স্ত্রী সহ এক বৎসর কাল যাবৎ একাদশী এবং দ্বাদশীব্রত পালন করেছিলেন।” দেবশর্ম্মার শিষ্য চন্দ্রের পত্নী গুণবতী আজীবন অর্থাৎ বিবাহের পূর্বে ও পরে সর্বদাই একাদশীব্রত ও কার্তিকমাস ব্রত করেছিলেন। যার পুণ্যপ্রভাবে তিনি মৃত্যুর পর বিষ্ণুলোকে গমন করেন এবং পরজন্মে সত্যভামা হয়ে কৃষ্ণপত্নী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। (৮)ব্রতদ্বয়ং তয়া সম্যগাজন্মমরণানৎ কৃতম। একাদশীব্রতং সম্যক সেবনং কার্ত্তিককস্য চ।। [স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখন্ড, কার্ত্তিকমাসমাহাত্ম্যম১৩।১২ ] বঙ্গানুবাদ:”শ্রীকৃষ্ণ সত্যভামাকে বললেন, ‘চন্দ্রের পত্নী গুণবতী জন্ম হইতে মরণ পর্য্যন্ত একাদশী ব্রত ও কার্ত্তিক মাস ব্রত – এ দুই ব্রত সম্যকরূপে আচরণ করেছিলেন।” (৯)শ্রীনারদ উবাচ। ইতি রাধামুখাচ্ছুত্বা যজ্ঞসীতাশ্চ গোপিকাঃ। একাদশীব্রত চক্রবিধিবৎ কৃষ্ণলালসাঃ।।২৩ একাদশীদিনেনাপি প্রসন্নঃ শ্রীহরিঃ স্বয়ম। মার্গশীর্ষে পূর্ণিমায়াং রাসং তাতিশ্চকার হ।।২৪ [ গর্গসংহিতা, মাধুর্য্যখন্ড, অধ্যায় ৯, শ্লোক ২৩-২৪, নারদ উক্তি ] বঙ্গানুবাদ:নারদ বলিলেন,”যজ্ঞসীতা গোপীগণ রাধার মুখে একাদশী মাহাত্ম্য শুণে কৃষ্ণপ্রাপ্তির জন্য যথাবিধি একাদশী ব্রত করেন ; তাঁদের একাদশী ব্রত ফলে স্বয়ং গোপবালক হরি প্রসন্ন হয়ে অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমায় তাঁহাদের সহিত রাসনৃত্য করেছিলেন।” (১০)শ্রীকৃষ্ণ উবাচ। শৃণু রাজন যথা বৃত্তং দৃষ্টং তৎকথয়ামি তে । মর্ত্যলােকে পুরা হাসীদব্ৰাহ্মণ্যেকা চ ভারত ব্রতচৰ্য্যারুতা নিত্যং দেবপূজারতা সদা। ২৩ মাসোপবাসনিরতা মম ভক্তা চ সৰ্ব্বদা। কৃষ্ণোপবাসসংযুক্তা মম পূজাপরায়ণ।। ২৪ [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪২। ২২-২৪ ] বঙ্গানুবাদ:”শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন,–রাজন! শ্রবণ করুন, বৃত্তান্ত বলিতেছি- হে পার্থিব যুধিষ্ঠির! পুরাকালে মর্ত্যলোকে ব্রতচর্য্যানিরতা, নিত্য দেবপূজা পরায়ণ এক ব্রাহ্মণী ছিলেন। তিনি আমার নিত্যভক্তা, মাসােপবাসে নিয়তা, কৃষ্ণপ্রীত্যৰ্থ উপবাস পরায়ণা এবং মদীয় পূজায় একান্ত অনুরক্তা।” (১১)দেবীনামুপদেশেন ষটতিলায়া ব্রতং কৃতম্ । মানুষ্যা সত্যব্রতয়া ভুক্তিমুক্তিফলপ্রদম। রূপকান্তিসমাযুক্তা ক্ষণেন সমবাপ সা॥ ৪৬ ধনং ধান্যঞ্চ বস্ত্রাদি সুবর্ণং রৌপ্যমেব চ। ভবনং সর্বসম্পন্ং ষটতিলায়াঃ প্রভাবতঃ ॥৪৭ [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৪২। ৪৫-৪৭ ] বঙ্গানুবাদ:”দেবপত্নীগণের উপদেশে তাপসী মানুষী ভুক্তিমুক্তিফলপ্ৰদ ষটতিলা
চিন্ময় জগৎ কি? চিন্ময় জগত বা ভগবদ্ধাম সম্পর্কে আলোচনা করুন।
চিন্ময় জগৎঃ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাস্ত্রে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দুটি জগতের কথা বর্ণনা করেন- অপরা প্রকৃতি বা জড় জগৎ এবং পরা প্রকৃতি বা চিন্ময় জগৎ।চতুর্দশ ভূবন সমন্বিত যেখানে আমরা বর্তমানে বসবাস করছি, সেটিকে বলা হয় জড় জগৎ বা অপরা প্রকৃতি।আর এ জড় জগতের বিপরীতে রয়েছে সমগ্র জীবের পরম গন্তব্য পরা প্রকৃতি বা চিন্ময় জগৎ।সে চিন্ময় জগতকে ভগবদ্ধাম বা ভগবানের ধামও বলা হয়। সেই চিন্ময় জগতে নিত্য আনন্দ বর্তমান।সেখানে সমস্ত জীব জন্ম,মৃত্যু, জরা, ব্যাধি,ত্রিতাপ ক্লেশ (আদিভৌতিক,আদিদৈবিক, আধ্যত্মিক) থেকে সর্বদা মুক্ত। “অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধিমে পরাম্। জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ।।” -(গীতা ৭/৫ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ” হে মহাবাহো! এই অপরা প্রকৃতি ( জড় জগৎ) ব্যতীত আমার আর একটি পরা প্রকৃতি(চিন্ময় জগৎ) রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য-স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জগৎকে ধারণ করে আছে।” কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় কঠ উপনিষদ শাস্ত্রেও চিন্ময় জগত সম্পর্কে বলা হয়েছে.. “ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।।” – (কঠ উপনিষদ ২/২/১৫) অনুবাদঃ “চিন্ময় জগতে সূর্য প্রকাশিত হয় না,চন্দ্র ও তাঁরাগনও সেখানে প্রকাশিত হয় না,এমনকি বিদ্যুৎ ঝলকায় না,তাহলে এই লৌকিক অগ্নিই কিভাবে সেখানে প্রকাশিত হতে পারে, তার প্রকাশের দ্বারাই সমস্ত (সূর্য চন্দ্র তারকাদি) কিছু প্রকাশিত হয়,তার জ্যোতিতেই সম্পূর্ণ চিন্ময় জগৎ প্রকাশিত হয়।” ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান, ব্রহ্মসংহিতা সহ বিভিন্ন সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে গোলক বৃন্দাবন নামক কৃষ্ণলোক, যেখানে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তারই অভিন্ন প্রকাশ শ্রীমতি রাধারাণী, বলরাম সহ অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত।গোলক বৃন্দাবনের অধোদিকে বৈকুন্ঠলোক,এই বৈকুন্ঠ লোকে ভগবান শ্রীনারায়ন মাতা লক্ষ্মী সহ অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত। এরপর রয়েছে শিবলোক,এখানে ভগবান সদাশিব, যিনি স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু তিনি অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত। অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদে চিন্ময় জগতের গোলক বৃন্দাবন সম্পর্কে বলা হয়েছে… “তমেকং গোবিন্দং সচ্চিদানন্দ বিগ্রহং পঞ্চপদং বৃন্দাবনসুরভূরুহতলাসীনং সততং সমরুদগণোহহং পরময়া স্তুত্যা তোষয়ামি।।” -(গোপালতাপনী উপনিষদঃ পূর্ব ২/৩৫) অনুবাদঃ “যিনি গোলক বৃন্দাবনের কল্পতরুমূলে সমাসীন আছেন,সতত আমি মরুদগনের সহিত পরম স্তুতি দ্বারা পঞ্চপদাত্মক সেই গোবিন্দদেবের(শ্রীকৃষ্ণের) সন্তোষ বিধান করি।” অষ্টাদশ পুরানের শাস্ত্রের ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে চিন্ময় জগতের গোলক বৃন্দাবন ধাম এবং তার অধোদেশে বৈকুন্ঠ এবং শিবধাম সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরন পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে… “সূর্য্যকোটিপ্রভং নিত্যমসখ্যং বিশ্বব্যাপকম। স্বেচ্ছাময়স্য চ বিভোস্তজ্জ্যোতবরুজ্জ্বলং মহৎ।। জ্যোতিরভ্যন্তরে লোকত্রয়মেব মনোহরম। অদৃশ্য যোগিবি স্বপ্নে দৃশ্য গম্যঞ্চ বৈষ্ণবৈঃ।। যোগেন ধৃতমীশেন চান্তরীক্ষস্থিতং পরম। আধিব্যাধিজরামৃত্যুশোকবীতিবিবর্জিত।। সদ্রত্মরচিতাসংখ্যমন্দিরৈঃ পরিশোবিত। লয়ে কৃষ্ণযুতং সৃষ্টৌ গোপগোপীভিরাবৃতম।। তদধো দক্ষিনে সব্যে পঞ্চাশংকোটিযোজনাৎ। বৈকুন্ঠং শিবলোকঞ্চ তৎসমং সুমনোহরম।। কোটিযোজনবিস্তীনং বৈকুন্ঠং মন্ডলাকৃতম। লয়ে শূণ্যঞ্চ সৃষ্টৌ চ লক্ষ্মীনারায়নন্বিতম।। গোলকাভ্যন্তরে জ্যোতিঃ সর্ব্বতেজোগুণান্বিতম। চতুর্ভুজৈ পার্ষদৈশ্চ জন্মমৃত্যুবিবর্জ্জিতৈ।। সব্যে চ শিবলোকশ্চ কোটিযোজনবিস্তৃতম। লয়ে সৃষ্টৌ চ সপার্ষদশিবান্বিতম।।” – (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানঃ ব্রহ্মখন্ড ২/৪-১১) অনুবাদঃ”কোটিসূর্যের প্রভাসমন্বিত চিন্ময় জগৎ,যার অভ্যন্তরে স্বেচ্ছাময় পরমেশ্বর ভগবান বিরাজমান।সেই উজ্জ্বল জ্যোতির অভ্যন্তরে অবস্থিত মনোহর ত্রিলোক( গোলক বৃন্দাবন, বৈকুন্ঠ এবং শিবধাম)।যোগীগন স্বপ্নেও সেই চিন্ময় জগতকে দর্শন করতে পারে না,কিন্তু বৈষ্ণবগন সেই জগৎ দর্শন করতে পারে এবং সেখানে গমন করতে পারে।সে জগৎ আধিভৌতিক, আদি দৈবিক, আধ্যত্মিক ক্লেশ থেকে মুক্ত।জরা,মৃত্যু, শোক বিবর্জিত। সে জগত অসংখ্য রত্মখচিত মন্দির দ্বারা পরিবৃত।সে জগতের মধ্যে গোলক বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ অসংখ্য গোপ গোপী সমন্বিত হয়ে অবস্থান করছেন।গোলক বৃন্দাবনের অধোদেশে(“তদধো”- তৎ+ অধ)পঞ্চাশ কোটি যোজন দক্ষিণে অবস্থিত বৈকুন্ঠ।গোলক বৃন্দাবনের মতোই মনোরম বৈকুন্ঠ এবং শিবলোক ।বৈকুন্ঠের পরিধি কোটি যোজন বিস্তৃত। সৃষ্টির সময় থেকে বৈকুন্ঠে নারায়ন লক্ষ্মী সমন্বিত রুপে বিরাজমান।সে বৈকুন্ঠে বিষ্ণুর পার্ষদগন চতুর্ভুজ, তারা জন্মমৃত্যু বর্জিত।শিবলোক কোটিযোজনবিস্তৃত,এবং সে লোক সৃষ্টির সময় থেকে স্বপার্ষদ শিব সমন্বিত।” ব্রহ্মসংহিতা শাস্ত্রেও চিন্ময় জগতের সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়।সেখানে বলা হয়েছে… “গোলকনাম্নি নিজধাম্নি তলে চ তস্য দেবী-মহেশ-হরি-ধামসু-তেষু তেষু। তে তে প্রভাবনিচয়া বিহিতাশ্চ যেন গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি॥ -(ব্রহ্মসংহিতা-৫/৪৩ঃব্রহ্মা) অনুবাদঃ” এই চৌদ্দভুবন বিশিষ্ট দেবীধাম বা জড় জগৎ।তার উপরে রয়েছে (চিন্ময়জগৎ) শিবধাম,তার উপরে বৈকুন্ঠধাম এবং সবার উপরে গোলক নামক কৃষ্ণধাম।সেই সমস্ত ধামে বিভিন্ন প্রভাব সমূহ যিনি বিধান করেছেন,সেই আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।” “চিন্তামনিপ্রকরসন্মসু কল্পবৃক্ষ- লক্ষাবৃতেষু সুরভীরভিপালয়ন্তম। লক্ষ্মীসহস্রশতসম্ভ্রমসেব্যমানং গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।” –( ব্রহ্মসংহিতা ৫/২৯, ব্রহ্মা) অনুবাদঃ লক্ষ লক্ষ কল্পবৃক্ষ দ্বারা আবৃত চিন্তামণিকর গঠিত গৃহসমূহে সুরভী অর্থাৎ কামধেনুগণকে যিনি পালন করছেন এবং শত সহস্র লক্ষ্মীগণ(গোপীগন) কর্তৃক সাদরে যিনি সেবিত হচ্ছেন সে আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি। ” শ্রিয়ঃ কান্তাঃ কান্তঃ পরমপুরুষঃ কল্পতরবো দ্রুমা ভূমিশ্চিন্তামনিগণময়ী তোয়মমৃতম।। কথা গানং নাট্যং গমনমপি বংশী প্রিয়সখী চিদানন্দং জ্যোতি পরমপি তদাস্বাদ্যমপি চ।। স যত্র ক্ষীরাব্ধিঃ স্রবতি সুরভীভ্যশ্চ সুমহান্ নিমেষার্ধাখ্যো বা ব্রজতি ন হি যত্রাপি সময়ঃ। ভজে শ্বেতদ্বীপং তমহমিহ গোলকমিতি যং বিদন্তস্তে সন্তঃ ক্ষিতিবিরলচারাঃ কতিপয়ে।।” –(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৫৬ঃ ব্রহ্মা) অনুবাদঃ যে স্থানে চিন্ময়ী লক্ষ্মীগন( গোপীগণ) কান্তারুপা,পরমপুরুষ কৃষ্ণই একমাত্র কান্ত,বৃক্ষমাত্রই চিদগত কল্পতরু,ভূমিমাত্রই চিন্তামণি ( চিন্ময় মণিবিশেষ),জলমাত্রই অমৃত,কথামাত্রই গান,গমনমাত্রই নাট্য,বংশী – প্রিয়সখী,জ্যোতি- চিদানন্দময়,আহার মাত্রই আস্বাদনীয়( সুস্বাদু),যে স্থানে কোটি কোটি সুরভী হতে চিন্ময় মহা – ক্ষীরসমুদ্র নিরন্তর স্রাবিত হচ্ছে,ভূত ও ভবিষ্যৎরুপ খন্ডত্ব রহিত চিন্ময় কাল নিত্য বর্তমান, সুতারাং নিমেষার্ধ প্রাপ্ত হয় না,সেই শ্বেতদ্বীপরুপ পরমপীঠকে আমি ভজনা করি।সেই ধামকে এই জড় জগতে বিরলচর অতি স্বল্পসংখ্যাক সাধুব্যক্তিই গোলক বলে জানেন। হরে কৃষ্ণ।প্রনাম প্রচারে- স্বধর্মম্ : Connect to the inner self.
নরক কি? নরক সম্পর্কে আলোচনা করুন।

নরকঃ মনুষ্য জীবের পাপকর্মের ফল স্বরুপ যে স্থান পরমেশ্বর ভগবান কতৃর্ক নির্ধারিত আছে, তাকে নরক বলা হয়। শ্রীমদ্ভাগবতের ৫/২৬/৫ নং শ্লোকের বর্ণনা অনুসারে, গর্ভোদক সমুদ্রের উপরে অথাৎ ব্রহ্মান্ডের ৭ টি অধঃলোকের মধ্যবর্তী স্থানে নরকের অবস্থান। “অন্তরাল এব ত্রিজগত্যাস্ত দিশি দক্ষিণস্যামধস্তাত্তুমেরু পরিষ্টাচ্চ জলাদ্যস্যামগ্নিষ্বাত্তাদয়ঃ পিতৃগণা দিশি স্বানাং গোত্রাণাং পরমেণ সমাধিনা সত্যা এবাশিষ আশাসানা নিবসন্তি ॥”৫ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবতের ৫/২৬/৫) অনুবাদ-“সমস্ত নরক ত্রিলোকের অন্তরালে অবস্থিত। দক্ষিণ দিকে ভূমণ্ডলের অধঃভাগে এবং গর্ভোদক সমুদ্রের উপরিভাগে নরকের অবস্থান। পিতৃলোকও সেই প্রদেশে অর্থাৎ গর্ভোদক সমুদ্র এবং নিম্নলোকের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। অগ্নিষ্বাত্তা আদি পিতৃগণ পরম সমাধিযোগে ভগবানের ধ্যান করেন এবং তাঁদের গোত্রভূত ব্যক্তিদের মঙ্গল কামনা করেন।” শ্রীমদ্ভাগবত পুরান সহ অষ্টাদশ পুরান,বেদ, উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারত,গীতা ইত্যাদি বহুবিধ সনাতনী শাস্ত্রে নরক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ভগবদগীতা ১/৪১ এবং ৪৩ নং শ্লোকে নরক সম্পর্কে বলা হয়েছে… ” সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ। পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিন্ডোদকক্রিয়াঃ।।”৪১।। -(গীতা ১/৪১ঃ অর্জুন) অনুবাদঃ “বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়।সেইকুলে পিন্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়।” “উৎসন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন। নরকে নিয়তং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম।।”৪৩।। -(গীতা ১/৪৩ঃ অর্জুন) অনুবাদঃ হে জনার্দন!আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়। শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৭ শ্লোকে ২৮ টি নরকের কথা শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বর্ণনা করেন। “তত্র হৈকে নরকানেকবিংশতিং গণয়ন্তি অথ তাংস্তেরাজন্নামরূপলক্ষণতোহনুক্রমিষ্যামস্তামিম্রোহ ন্ধতামিম্রো রৌরবো মহারৌরবঃ কুন্তীপাকঃ কালসূত্রমসিপত্রবনং সূকরমুখমন্ধকূপঃ কৃমিভোজনঃ সন্দংশস্তপ্তসূর্মিবজ্রকণ্টকশাল্মলী বৈতরণী পৃয়োদঃ প্রাণরোধো বিশসনং লালাভক্ষঃ সারমেয়াদনমবীচিরয়ঃপানমিতি। কিঞ্চ ক্ষারকদমো রক্ষোগণভোজনঃ শূলপ্রোতো দন্দশূকোহ বটনিরোধনঃ পর্যাবর্তনঃ সূচীমুখমিত্যষ্টাবিংশতির্নর কাহবিবিধযাতনাভূময়ঃ ॥” -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৭) অনুবাদঃ”কেউ কেউ বলেন যে, ২১টি নরক রয়েছে, এবং অন্য কেউ বলেন ২৮টি। হে রাজন, আমি তাদের নাম, রূপ এবং লক্ষণ অনুসারে বর্ণনা করব। সেগুলি হচ্ছে-তামিস্র, অন্ধতামিস্র, রৌরব, মহারৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, অসিপত্রবন, সূকরমুখ, অন্ধকূপ, কৃমিভোজন, সন্দংশ, তপ্তসূর্মি, বজ্রকণ্টক-শাল্মলী, বৈতরণী, পূয়োদ, প্রাণরোধ, বিশসন, লালাভক্ষ, সারমেয়াদন, অবীচি, অয়ঃপান, ক্ষারকর্দম, রক্ষোগণ-ভোজন, শূলপ্রোত, দন্দশূক, অবটনিরোধন, পর্যাবর্তন এবং সূচীমুখ। এইগুলি জীবের দণ্ডভোগের স্থান।” এরপর শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৮-৩৬ নং শ্লোকে মুক্তপূরুষ শ্রীল শুকদেব গোস্বামী কিরুপ পাপকর্মে যুক্ত হওয়ার ফলে পাপীগণকে যমদূতগন কোন কোন নরকে নিক্ষেপ করে কঠিন শাস্তি প্রদান করেন তার বিস্তীত বিবরণ প্রদান করেন। নিম্নে তা আলোচনা করা হল- ১/ তামিস্র নরকঃ তত্র যস্তু পরবিত্তাপত্যকলত্রাণ্যপহরতি স হি কালপাশবদ্ধো যম- পুরুষৈরতিভয়ানকৈস্তামিস্রে নরকে বলান্নিপাত্যতে অনশনানুদপানদণ্ডতাড়ন- সন্তর্জনাদিভির্যাতনাভির্যাত্যমানো জন্তুর্যত্র কশ্মলমাসাদিত একদৈব মূর্ছামুপযাতি তামিস্রপ্রায়ে ॥ ৮।। -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৮) অনুবাদঃ “হে রাজন, যে ব্যক্তি অপরের ধন, স্ত্রী ও পুত্র অপহরণ করে, অত্যন্ত ভয়ঙ্কর যমদূতেরা তাকে কালপাশে বেঁধে বলপূর্বক তামিস্র নরকে নিক্ষেপ করে। এই তামিস্র নরক ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন; সেখানে যমদূতেরা পাপীকে ভীষণভাবে প্রহার, তাড়ন এবং তর্জন করে। সেখানে তাকে অনশনে রাখা হয় এবং জল পান করতে দেওয়া হয় না। এইভাবে ক্রুদ্ধ যমদূতদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে সে মূর্ছিত হয়।” ২/ অন্ধতামিস্র নরকঃ এবমেবান্ধতামিস্রে যস্তু বঞ্চয়িত্বা পুরুষং দারাদীনুপযুঙক্তে যত্র শরীরী নিপাত্যমানো যাতনাস্থো বেদনয়া নষ্টমতির্নষ্টদৃষ্টিশ্চ ভবতি যথা বনস্পতিবৃশ্চমানমূলস্তস্মাদগ্ধতামিস্রং তমুপদিশন্তি।। ৯ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৯) অনুবাদঃ “যে ব্যক্তি পতিকে বঞ্চনা করে তার স্ত্রী-পুত্র উপভোগ করে, সে অন্ধতামিস্র নরকে পতিত হয়। বৃক্ষকে ভূপাতিত করার পূর্বে যেমন তার মূল ছেদন করা হয়, তেমনই সেই পাপীকে ঐ নরকে নিক্ষেপ করার পূর্বে যমদূতেরা নানা প্রকার যন্ত্রণা প্রদান করে। এই যন্ত্রণা এতই প্রচণ্ড যে, তার ফলে তার বুদ্ধি এবং দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়। সেই জন্যই সেই নরককে পণ্ডিতেরা অন্ধতামিস্র বলেন।” ৩/রৌরব নরকঃ যত্ত্বিহ বা এতদহমিতি মমেদমিতি ভূতদ্রোহেণ কেবলং স্বকুটুম্বমেবানুদিনং প্রপুষ্ণাতি স তদিহ বিহায় স্বয়মেব তদণ্ডভেন রৌরবে নিপততি ॥১০৷৷ যে ত্বিহ যথৈবামুনা বিহিংসিতা জন্তবঃ পরত্র যমযাতনামুপগতং ত এব রুরবো ভূত্বা তথা তমেব বিহিংসন্তি তস্মাস্ত্রেীরবমিত্যাহুঃ রুরুরিতি সর্পদিতিক্রুরসত্ত্বস্যাপদেশঃ ॥ ১১ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১০-১১) অনুবাদঃ”যে ব্যক্তি তার জড় দেহটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে, তার নিজের দেহ এবং দেহের সম্পর্কে সম্পর্কিত আত্মীয়-স্বজনদের ভরণ-পোষণের জন্য দিনের পর দিন অপর প্রাণীর হিংসা করে, সেই ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তার দেহ এবং আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যাগ করে, প্রাণী হিংসাজনিত পাপের ফলে রৌরব নরকে নিপতিত হয়।এই জীবনে যে হিংসা-পরায়ণ ব্যক্তি অন্য প্রাণীদের যন্ত্রণা দেয়, মৃত্যুর পর যখন সে তার কৃত কর্মের ফলে যম-যাতনা প্রাপ্ত হয়, তখন সেই সমস্ত প্রাণীসমূহ, যাদের হিংসা করা হয়েছে, তারা ‘রুরু’ হয়ে তাকে পীড়া দেয়। এই জন্য পণ্ডিতেরা সেই নরককে রৌরব নরক বলেন। রুরু প্রাণীকে এই পৃথিবীতে দেখা যায় না, তারা সর্পের থেকেও হিংস্র।” ৪/মহারৌরব নরকঃ এবমেব মহারৌরবো যত্র নিপতিতং পুরুষং ক্রব্যাদা নাম রুরবস্তং ক্রব্যেণ ঘাতয়ন্তি যঃ কেবলং দেহন্তরঃ ॥ ১২ –(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১২) অনুবাদঃ”যারা অন্যদের কষ্ট দিয়ে নিজেদের দেহ ধারণ করে, তাদের মহারৌরব নরকে দণ্ডভোগ করতে হয়। সেই নরকে ক্রব্যাদ নামক রুরু পশুরা তাদের যন্ত্রণা দিয়ে মাংস আহার করে।” ৫/কুম্ভিপাক নরকঃ যস্ত্বিহ বা উগ্রঃ পশুন পক্ষিণো বা প্রাণত উপরন্ধয়তি তমপকরুণং পুরুষাদৈরপি বিগর্হিতমমূত্র যমানুচরাঃ কুম্ভীপাকে তপ্ততৈলে উপরন্ধয়ন্তি । ১৩ ॥ –(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৩) অনুবাদঃ “যে সমস্ত নিষ্ঠুর মানুষ তাদের দেহ ধারণের জন্য এবং জিহ্বার তৃপ্তি সাধনের জন্য নিরীহ পশু-পক্ষীকে হত্যা করে রন্ধন করে, সেই প্রকার ব্যক্তিরা নর- মাংসভোজী রাক্ষসদেরও ঘৃণিত। মৃত্যুর পর যমদূতেরা কুন্তীপাক নরকে ফুটন্ত তেলে তাদের পাক করে।” ৬/কালসূত্র নরকঃ যস্ত্বিহ ব্রহ্মধ্রুক্ স কালসূত্রসংজ্ঞকে নরকে অযুতযোজনপরিমণ্ডলে তাম্রময়ে তপ্তখলে উপর্যধস্তাদগন্যর্কাভ্যামতিতপ্যমানেহভিনিবেশিতঃ ক্ষুৎপিপাসাভ্যাং চ দহ্যমানান্তবহিঃশরীর আস্তে শেতে চেষ্টতেহবতিষ্ঠতি পরিধাবতি চ যাবন্তি পশুরোমাণি তাবদ্বর্ষসহস্রাণি ॥ ১৪ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৪) অনুবাদঃ” ব্রহ্মঘাতীকে কালসূত্র নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়, যার পরিধি ৮০,০০০ মাইল এবং যা তাম্রনির্মিত। নীচ থেকে অগ্নি এবং উপর থেকে প্রখর সূর্যের তাপে সেই তাম্রময় ভূমি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়। সেখানে ব্রহ্মঘাতীকে অন্তরে এবং বাইরে দগ্ধ করা হয়। অন্তরে সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় দগ্ধ হয় এবং বাইরে সে প্রখর সূর্যকিরণ ও তপ্ত তাম্রে দগ্ধ হতে থাকে। তাই যে কখনও শয়ন করে, কখনও উপবেশন করে, কখনও উঠে দাঁড়ায় এবং কখনও ইতস্তত বিচরণ করে। এইভাবে একটি পশুর শরীরে যত লোম রয়েছে, তত হাজার বছর ধরে তাকে যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়।” ৭/অসিপত্রবন নরকঃ যস্ত্বিহ বৈ নিজবেদপথাদনাপদ্যপগতঃ পাখগুং চোপগতস্তমসিপত্রবনং প্রবেশ্য কশয়া প্রহরস্তি তত্র হাসাবিতস্ততো ধাবমান উভয়তোধারৈস্তালবনাসিপত্রৈশ্ছিদ্যমানসর্বাঙ্গো হা হত্যেহম্মীতি পরময়া বেদনয়া মূর্ছিতঃ পদে পদে নিপততি স্বধর্মহা পাখণ্ডানুগতং ফলং ভুঙক্তে ।। ১৫৪।। -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৫) অনুবাদঃ” আপৎকাল উপস্থিত না হলেও যে ব্যক্তি স্বীয় বেদমার্গ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পাষণ্ড ধর্ম অবলম্বন করে, যমদূতেরা তাকে অসিপত্রবন নামক নরকে নিক্ষেপ করে বেত্রাঘাত করতে থাকে। প্রহারের যন্ত্রণায় সে যখন সেই নরকে ইতস্তত ধাবিত হয়, তখন উভয় পার্শ্বের অসিতুল্য তালপত্রের ধারে তার সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত হয়। তখন সে “হায়, আমি এখন কি করব। আমি এখন কিভাবে রক্ষা পাব।” এই বলে আর্তনাদ করতে করতে পদে পদে মূর্ছিত হয়ে পড়তে থাকে। স্বধর্ম ত্যাগ করে পাষণ্ড মত অবলম্বনের ফল এইভাবে ভোগ করতে হয়।” ৮/সূকরমূখ যস্ত্বিহ বৈ রাজা রাজপুরুষো বা অদণ্ড্যে দণ্ডং প্রণয়তি ব্রাহ্মণে বা শরীরদণ্ডং স পাপীয়ান্নরকেহ মুত্র সুকরমুখে নিপততি তত্রাতি- বলৈবিনিষ্পিষ্যমাণাবয়বো যথৈবেহেক্ষুখণ্ড আর্তস্বরেণ স্বনয়ন্ কচিক্ষুর্জিতঃ কশ্মলমূপগতো যথৈবেহাদৃষ্টদোষা উপরুদ্ধাঃ ॥ ১৬ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৬) অনুবাদঃ” ইহলোকে যে রাজা বা রাজপুরুষ দণ্ডদানের অযোগ্য
স্বর্গ কি? স্বর্গ সম্পর্কে আলোচনা করুন। কেন মুক্তিকামী ব্যক্তি স্বর্গলোক কামনা করে না ???

আজকাল কিছু শাস্ত্রজ্ঞানহীন ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করছে যে, স্বর্গ ও নরক নামে নাকি কোন কিছু নেই।তাদের কথা শুনলে আমাদের হাসি পায়।কারন সনাতনী সমগ্র শাস্ত্রে স্বর্গ এবং নরক সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে। নিম্নে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হল- স্বর্গঃ স্বর্গ হল জীবের পুন্যফলে লভ্য চতুর্দশ ভুবনের মধ্যে একটি সুখময় স্থান। বেদ(শ্রুতি),স্মৃতি,ইতিহাস(মহাভারত, রামায়ন) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা , অষ্টাদশ পুরাণ, পঞ্চরাত্র ইত্যাদি বিভিন্ন শাস্ত্রে স্বর্গের বর্ণনা পাওয়া যায়।শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৩৮ নং শ্লোকে চতুর্দশ ভূবন বিশিষ্ট এই ব্রহ্মান্ডের কথা আলোচনা করা হয়েছে। অথাৎ আমাদের এই ব্রহ্মান্ডে রয়েছে ৭ টি উদ্ধলোক ও ৭ টি অধঃলোক। ব্রহ্মান্ডের ৭ টি উদ্ধলোক সমূহ হল – ভূলোক( পৃথিবী),ভূবলোক, স্বর্গলোক(ইন্দ্রলোক), মহলোক, জনলোক, তপলোক এবং সত্যলোক(ব্রহ্মলোক)। এবং ৭ টি অধলোক হল -অতল,বিতল,সুতল,তলাতল, রসাতল, মহাতল এবং পাতাল। “এতাবানেবান্ডকোশো যশ্চতুর্দশধা পুরাণেষু বিকল্পিত উপগীয়তে” – (শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৩৮) ঋগ্বেদের ৩/৬২/১০ মন্ত্রে এ ব্রহ্মান্ডের উদ্ধলোকের তিনটি লোকের মধ্যে স্বর্গলোকের বিবরন পাওয়া যায়। “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি। ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।” -ঋগ্বেদ ৩/৬২/১০ অনুবাদঃ “যিনি ভুলোক,ভুবলোক এবং স্বর্গলোক এই ত্রিলোকের স্রষ্টা,অথাৎ সমস্ত বিশ্বলোকের প্রসবিতা, সেই সচ্চিদানন্দঘন পরমব্রহ্মের বরনীয় জ্যোতিকে আমরা ধ্যান করি।তিনি আমাদের মন ও বুদ্ধিকে শুভ কার্যে প্রেরনা প্রদান করুন।” এছাড়াও বেদের বহু মন্ত্রে স্বর্গলোকের বর্ণনাপাওয়া যায়।ভগবদগীতা ২/২ নং শ্লোকে পরমাত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্বর্গলোক বা ইন্দ্রলোক সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করেন। “কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্। অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুন।।” -(ভগবদগীতা ২/২,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ”প্রিয় অর্জুন, এই ঘোর সঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকুত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্বলিত হল? এই ধরনের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে।” “ত্রৈবিদ্যা মাং সোমপাঃ পূতপাপা যজ্ঞৈরিষ্ট্বা স্বর্গতিং প্রার্থয়ন্তে। তে পুন্যমাসাদ্য সুরেন্দ্রলোকম্ অশ্নন্তি দিব্যান্ দিবি দেবভোগান্।।” (গীতা ৯/২০,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ “ত্রিবেদজ্ঞগণ যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা আমাকে আরাধনা করে যজ্ঞাবশিষ্ট সোমরস পান করে পাপমুক্ত হন এবং স্বর্গে গমন প্রার্থনা করেন। তাঁরা পুণ্যকর্মের ফলস্বরূপ ইন্দ্রলোক লাভ করে দেবভোগ্য দিব্য স্বর্গসুখ উপভোগ করেন।” “তে তং ভুক্ত্বা স্বর্গলোকং বিশালং ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি। এবং ত্রয়ীধর্মমনুপ্রপন্না গতাগতং কামকামা লভন্তে।।” (গীতা ৯/২১,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ “তাঁরা সেই বিপুল স্বর্গসুখ উপভোগ করে পুণ্য ক্ষয় হলে মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন। এভাবেই ত্রিবেদোক্ত ধর্মের অনুষ্ঠান করে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের আকাঙ্ক্ষী মানুষেরা সংসারে কেবলমাত্র বারংবার জন্ম-মৃত্যু লাভ করে থাকেন।” উপরোক্ত আলোচনায় এভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় স্বর্গলোকের বর্ণনা প্রদান করেন,এবং সাথে সাথে স্বর্গকামীগনের অভিলাষিত স্বর্গলোকে গমন করার জন্য অনুৎসাহী করে গীতা ৭/৫ এবং গীতা ১৫/৬ নং শ্লোকে স্পষ্টভাবে তার স্বীয় ধাম চিন্ময় পরা প্রকৃতি গোলক বৃন্দাবন ও বৈকুন্ঠ ধামে ফিরে যাওয়ার জন্য আমাদের উৎসাহিত করেন,যেখানে গেলে আর কখনো আমাদের এই অপরা প্রকৃতি বা জড় জগতে ফিরে আসতে হবে না। “অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধিমে পরাম্। জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ।।” -(গীতা ৭/৫ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ “হে মহাবাহো! এই অপরা প্রকৃতি ( জড় জগৎ) ব্যতীত আমার আর একটি পরা প্রকৃতি(চিন্ময় জগৎ) রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য-স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জগৎকে ধারণ করে আছে।” ” ন তদ্ ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ। যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।।” -(গীতা ১৫/৬ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ ” সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি বা বিদ্যুৎ আমার সেই পরম ধামকে আলোকিত করতে পারে না। সেখানে গেলে আর জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।” হরে কৃষ্ণ। প্রনাম। নিবেদন-স্বধর্মম্ : Connect to the inner self.
রাধাতন্ত্র অনুসারে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কি শিব এবং পার্বতীর নাম?!

রাধাতন্ত্র অনুসারে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কি শিব এবং পার্বতীর নাম??? হ্যাঁ। রাধাতন্ত্র, দ্বিতীয় পটল ৩৯-৪৪ নং শ্লোকে ১৬ নাম সমন্বিত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রকে শিব ও পার্বতীর মন্ত্র বলা হয়েছে। “হকারস্তু সূত শ্রেষ্ঠ শিব সাক্ষান্ন সংশয়।রেফস্তু ত্রিপুরাদেবী দশমূর্ত্তিময়ী সদা।একারঞ্চভগৎ বিদ্যাৎ সাক্ষাৎ যোনিং তপোধন।হকার শূণ্য রুপীচ রেফোবিগ্রহ ধারকঃ।।৩৯।।হরিস্তু ত্রিপুরা সাক্ষাৎ ম্মম মূর্ত্তি নর্সংশয়ঃ।ককারং কামদা কামরুপিনী স্ফুরদব্যয়া।ঋকারস্তু সূত শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠা শক্তি রিতারিতা।ককারঞ্চ ঋকারঞ্চ কামিনী বৈষ্ণবী কলা।৪০।।ষকার শ্চন্দ্রমা দেব কলা ষোড়শ সংযুতঃ।ণকারঞ্চ সূত শ্রেষ্ঠ সাক্ষান্নিবৃতি রুপিনী।দ্বয়োরৈকং তপঃ শ্রেষ্ঠ সাক্ষাৎ ত্রিপু ভৈরবী।।৪১।।কৃষ্ণ কৃষ্ণ সুত শ্রেষ্ঠ মহামায়া জগন্ময়ী।হরে হরে তাতা দেবী শিবশক্তি স্বরুপিনী।।৪২।।……৪৪।।” এবং একইসাথে রাধাতন্ত্র: দ্বিতীয় পটল ২৯-৩১ নং শ্লোকে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের উল্লেখ এবং তার মহিমা বর্ণনা করে, ৩২ নং শ্লোকে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাকে ত্রিপুরাসুন্দরী, এবং ছন্দকে গায়ত্রী ছন্দ হয়েছে,( “হরিনাম্নো মন্ত্রস্য বাসুদেব ঋষিঃ স্মৃতঃ। গায়ত্রী ছন্দ ইত্যুক্তং ত্রিপুরা দেবতা মতা।”) যা চরম ভূল। কারন বেদে সাতটি ছন্দ দৃষ্ট হয়। যথা: গায়ত্রী, উষ্ণিক, অনুষ্টূপ, বৃহতী, পঙক্তি, ত্রিষ্টুপ ও জগতী। এর মধ্যে গায়ত্রী ছন্দ হল ২৪ অক্ষর এবং অনুষ্টুপ ছন্দ ৩২ অক্ষর বিশিষ্ট।সুতরাং, হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র হল ৩২ অক্ষর বিশিষ্ট, তাই তার ছন্দ হল অনুষ্টুপ। অথচ রাধাতন্ত্র দ্বিতীয় পটল ৩২ নং শ্লোকে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের ছন্দকে গায়ত্রী বলা হয়েছে। এরপর এ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা রুপে ত্রিপুরাসুন্দরীকে বুঝানো হয়েছে। অথচ মহাভারত, অষ্টাদশ পুরাণ, পঞ্চরাত্র, কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত কলির্সন্তরণ উপনিষদ শাস্ত্রে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা (ঈশ্বর )হিসেবে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বুঝানো হয়েছে। তাহলে এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে রাধাতন্ত্রে এরূপ ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল তথ্য কিভাবে থাকতে পারে,যা অন্যান্য কোন সনাতনী শাস্ত্রের সাথে বিন্দু পরিমাণ মিল নেই?! এর জবাব হল পদ্মপুরাণ, যেখানে ভগবান বিষ্ণু, মহাদেব শিবকে নির্দেশ দিচ্ছেন… “পুরাণানি চ শাস্ত্ৰাণি ত্বয়া সত্ত্বেন বৃংহিতাঃ। কপালচৰ্ম্মভস্মাস্থিচিহ্নাসমরসৰ্ব্বশঃ।। ৩০।।ত্বমেব ধৃতবান্ লোকান্ মোহয়ম্ব জগত্ৰয়ে । তথা পাশুপতং শাস্ত্ৰং ত্বমেব কুরু সৎস্কৃতঃ ॥৩১।। কঙ্কালশৈব পাষণ্ডমহাশৈবাদিভেদতঃ।অলক্ষ্যঞ্চ মত সম্যগ্বেদবাহ্যং নরাধমাঃ ॥ ৩২।।ভস্মাস্থিধারিণঃ সর্ব্বে ভবিষ্যন্তি হচেতসঃ। ত্বাং পরত্বেন বক্ষ্যন্তি সৰ্ব্বশাস্ত্রেষু তামসাঃ ॥৩৩ তেষাং মতমধিষ্ঠায় সর্ব্বে দৈত্যাঃ সনাতনাঃ। ভবেয়ুস্তে মদ্বিমুখাঃ ক্ষণাদেব ন সংশয়ঃ ॥৩৪।। অহপ্যবতারেষু ত্বাঞ্চ রুদ্র মহাবল। তামসানাং মোহনার্থং পূজয়ামি যুগেযুগে। মতমেতদবষ্টভ্য পতস্ত্যেব ন সংশয়ঃ ॥”৩৫।। – পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, অধ্যায় ২৩৫, শ্লোক ৩০-৩৫ অনুবাদঃ শ্রীহরি শিবকে বললেন- “হে শিব! তুমি সংকোচ পরিত্যাগ করে জগতে তামসিক পুরাণ ও অন্যান্য তামসশাস্ত্রের প্রচার করো। তুমি কপাল, চর্ম্ম, ভস্ম ও অস্থি চিহ্ন ধারণ করে ত্রিজগতের অখিল লোককে মোহিত কর। তুমি পাশুপাত্ শাস্ত্ৰ প্রণয়ন করে তা প্রচার কর। তুমি কঙ্কাল, শৈব, পাষণ্ড ও মহাশৈব প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত করে বেদবিরুদ্ধ মত অলক্ষ্যে প্রবর্তিত কর। এইরূপ করলে সকলে ভস্মাস্থিধারণ করে অধম হবে ও জ্ঞানহীন হয়ে যাবে। তখন তারা তামসিক হয়ে তোমাকেই সকল শাস্ত্রে শ্রেষ্ঠ বলে কীৰ্ত্তন করবে। (যারা বিষ্ণুভক্তির ছল করে ত্রিলোকে উৎপাত সৃষ্টি করে) সে সকল সনাতন দানবগণ এ বেদবিরুদ্ধ মত গ্রহণ করে ক্ষণকাল মধ্যে নিঃসংশয় বিষ্ণুবিমুখ হয়ে যাবে। হে মহাবল রুদ্র ! আমিও যুগে যুগে অবতার পরিগ্রহ করে তামসিক লোকদের মোহিত করার জন্য তোমার পূজা করব। তা দেখে দানবেরাও সেই মতের অনুবর্তী হইয়া নিঃসংশয় পতিত হইবে। সুতরাং, রাধাতন্ত্র একটি তামসিক শাস্ত্র, যার প্রবক্তা স্বয়ং শিব, তিনি ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের প্রতিটি শব্দকে শিব ও পার্বতীরূপে উপস্থাপন করেছিলেন, যা সনাতনী অন্যান্য কোন শাস্ত্রের সাথে মিল নেই। এ তামসিক শাস্ত্রটি প্রবর্তন করার পেছনে মহাদেব শিবের আর একটি কারণ থাকতে পারে, সেটি হল বৃহন্নারদীয় পুরাণ ৩/৮/১২৬, যেখানে বলা হয়েছে, হরিনাম হল কলিযুগে মুক্তির একমাত্র পথ (“হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম।কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা।।”)। শিবের ভক্তরা তো শিবকে পরমেশ্বর রূপে মানে, তারা শিবের মন্ত্র ছাড়া আর কোন মন্ত্র তো জপ করবে না, তাই তারাও যাতে এই কলিযুগে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপা পেতে পারে, তাই ১৬ নাম সমন্বিত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের কিছু কিছু শব্দ এবং কিছু কিছু বর্ণকে তাঁর নাম (শিব) ও তাঁর নিত্য পত্নী পার্বতীর নামে বর্ণনা করেছেন। যাই হোক আমরা এখন মহাভারত,অষ্টাদশ পুরাণ,পঞ্চরাত্র, কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত কলির্সন্তরণ উপনিষদ শাস্ত্রের আলোকে জানার চেষ্টা করব, রাধাতন্ত্রে উল্লেখিত ১৬ নাম সমন্বিত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র প্রকৃতপক্ষে শিব ও পার্বতীকে নির্দেশ করে না,তা স্পষ্টভাবে পরমাত্মা,পরমব্রহ্ম, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে নির্দেশ করে। হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের উল্লেখ আছে, কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত কলির্সন্তরণ উপনিষদ, ব্রহ্মান্ড পুরাণ, পদ্মপুরাণ, অনন্ত সংহিতা,অগ্নি পুরাণ, মহাভারত ইত্যাদি শাস্ত্রে। হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রে তিনটি শব্দ বিদ্যমান- হরে, কৃষ্ণ, রাম।এ তিনটি শব্দ প্রকৃতই শ্রীকৃষ্ণেরই নাম। ‘হরে’ শব্দটির উৎপত্তি হরি শব্দ থেকে, সম্বোধনে হরে (বহু বৈষ্ণব আচার্যগণ হরে শব্দে অভিন্ন কৃষ্ণবিগ্রহ রাধারাণীকেও দর্শন করেন, কেননা রাধারাণীর আরেক নাম ‘হরা’ সম্বোধনে হরে), ‘কৃষ্ণ’ শব্দটির অর্থ শ্রীকৃষ্ণ, ‘রাম’ শব্দটির অর্থ বলরাম বা শ্রীরাম। শ্রীকৃষ্ণ হলেন স্বয়ং বিষ্ণু বা হরি তাই তিনি হরে, শ্রীকৃষ্ণ হলেন স্বয়ং বলরাম বা শ্রীরাম তাই তিনি রাম। এভাবে এ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রে হরে,কৃষ্ণ, রাম প্রকৃতপক্ষে শ্রীকৃষ্ণের নাম, তাই এ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা (ঈশ্বর) হলেন স্বয়ং পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ। নিম্নে এ বিষয়ে শাস্ত্রসম্মত বিস্তৃত আলোচনা প্রদত্ত হল… ১/ ব্রহ্মান্ড পুরাণঃ ব্রহ্মান্ড পুরাণ হল অষ্টাদশ পুরাণ শাস্ত্রের মধ্যে একটি পুরাণ।ব্রহ্মান্ড পুরাণ, উত্তরখন্ড, রাধাহৃদয়, ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে লোমহর্ষণ সূতের প্রশ্নের উত্তরে শ্রীল ব্যাসদেব ৫৫ নং শ্লোকে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রটি উল্লেখ করেন। “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে। হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।” – ব্রহ্মান্ড পুরাণঃ উত্তরখন্ড, রাধাহৃদয়, ৬/৫৫ এবং৫৬-৬১ নং শ্লোক পর্যন্ত উপরোক্ত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন।এরপর৬২ নং শ্লোকে স্পষ্টভাবেশ্রীল ব্যাসদেব বর্ণনা করেন… “বিদ্বেষাদপি গোবিন্দং দমঘোষাত্মজঃ স্মরণ। শিশুপালো গতঃ স্বর্গং কিং পুন স্তৎ।।” – ব্রহ্মান্ড পুরাণঃউত্তরখন্ড,রাধাহৃদয়, ৬/৫৫ অনুবাদঃ দমঘোষপুত্র শিশুপাল বিদ্বেষভাবে ভগবান গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ) স্মরণ করিয়া বৈকুন্ঠাখ্য পরাৎপর স্বর্গলোকে গমন করিয়াছেন, ইহাতে ( ১৬ নাম সমন্বিত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র) তৎপরায়ণ হইয়া যাহারা গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ) স্মরণ করে তাহারদিগের কথা আর কি কহিব? এভাবে উপরোক্ত ব্রহ্মান্ড পুরাণ, উত্তরখন্ড, রাধাহৃদয়, ৬/৫৫ নং শ্লোক অনুযায়ী, ব্রহ্মান্ড পুরাণঃউত্তরখন্ড,রাধাহৃদয়, ৬/৫৫ নং শ্লোকটিতে লিখিত হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা গোবিন্দকে নির্দেশ করে,যা কখনো মহাদেব শিব এবং দুর্গা(পার্বতী) মাতাকে নয়। ২/ পদ্মপুরাণঃ ক) পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ডঃ পদ্মপুরাণ হল অষ্টাদশ পুরাণ শাস্ত্রের মধ্যে একটি পুরাণ। পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ড ১০ম অধ্যায়ে এক ব্রাহ্মণ, রাজাকে উপদেশ প্রদানকালে একটি প্রনাম মন্ত্র উচ্চারণ সময়ে হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ উচ্চারণ করেন, যা ভগবান বিষ্ণু, যিনি হলেন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁকে নির্দেশ করে। “হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ ভক্তবৎসল গোপতে। শরণ্য ভগবনবিষ্ণো মাং পাহি বহুসংসৃতে।।” – পদ্মপুরাণঃ পাতালখন্ড ১০/২৫ অনুবাদঃ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, হে ভক্তবৎসল জগৎপতে ভগবান বিষ্ণু, আমাকে এই বিভীষিকাময় বিশাল সংসার হতে রক্ষা কর। এইভাবে উপরোক্ত পদ্মপুরাণঃ পাতালখন্ড ১০/২৫ শ্লোক অনুসারে হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র ভগবান বিষ্ণু, যিনি হলেন পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং তাঁকে নির্দেশ করে।তা কখনো মহাদেব শিব এবং দুর্গা (পার্বতী) মাতাকে নয়। খ) পদ্মপুরাণ, ক্রিয়াযোগসারঃ পদ্মপুরাণ, ক্রিয়াযোগসার, ২৩ তম অধ্যায়ে কোটিরথ নামে এক রাজা
‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্রের অর্থ -শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরকৃত
‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্রের অর্থ -শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরকৃত হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রের গূঢ় তত্ত্ব। মহামন্ত্রের অষ্টশ্লোকে সম্মন্ধ, অভিধেয়, প্রয়োজন তত্ত্ব।। হরেকৃষ্ণ ষোলনাম অষ্টযুগ হয়। অষ্টযুগ অর্থে অষ্টশ্লোক প্রভু কয়।। আদি হরেকৃষ্ণ অর্থে অবিদ্যাদমন। শ্রদ্ধার সহিত কৃষ্ণনামসংকীর্তন।। -[হরে কৃষ্ণ] আর হরেকৃষ্ণ নাম কৃষ্ণ সর্বশক্তি। সাধুসঙ্গে নামাশ্রয়ে ভজনানুরক্তি।। সেইত ভজনক্রমে সর্ব্বনর্থনাশ। অনর্থাপগমে নামে নিষ্ঠার বিকাশ।। – [হরে কৃষ্ণ] তৃতীয়ে বিশুদ্ধতক্ত চরিত্রের সহ। কৃষ্ণ কৃষ্ণ নামে নিষ্ঠা করে অহরহ।। -[কৃষ্ণ কৃষ্ণ] চতুর্থেতে অহৈতুকী ভক্তি উদ্দীপন। রুচি সহ হরে হরে নামসংকীর্তন।। -[হরে হরে] পঞ্চমেতে শুদ্ধ দাস্য রুচির সহিত। হরেরাম সংকীর্তন স্মরণবিহিত।। -[হরে রাম] ষষ্ঠে ভাবাঙ্কুরে হরে রামেতি কীর্তন। সংসারে অরুচি কৃষ্ণে রুচি সমর্পণ।। -[হরে রাম] সপ্তমে মধুরাসক্তি রাধাপদাশ্রয়। বিপ্রলম্ভে রামরাম নামের উদয়।। -[রাম রাম] অষ্টমে ব্রজেতে অষ্টকাল গোপীভাব। রাধাকৃষ্ণ প্রেম সেবা প্রয়োজন লাভ।। -[হরে হরে] -শ্রীভজন রহস্যম্। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর
‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্রের অর্থ -শ্রীল গোপালগুরু গোস্বামী প্রভুপাদ কৃত।
‘হরে কৃষ্ণ’ মহামন্ত্রের অর্থ -শ্রীল গোপালগুরু গোস্বামী প্রভুপাদ কৃত। বক্রেশ্বর পণ্ডিতের শিষ্য এবং ধ্যানানন্দ গোস্বামীর গুরুদেব গোপালগুরু গোস্বামী পাঁচশো বছর পূর্বে জগন্নাথ পুরীতে থাকতেন এবং নিয়মিত মহাপ্রভুর সঙ্গ করতেন। তাঁর প্রদত্ত মহামন্ত্রের অর্থ শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর তার ভজনরহস্য গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং পয়ার ছন্দে তার অর্থ ব্যাখা করেছেন। শ্রীল গোপালগুরু গোস্বামী প্রভুপাদ কৃত অর্থ: বিজ্ঞাপ্য ভগবত্তত্ত্বং চিদ্ঘনানন্দবিগ্রহম্। হরত্যবিদ্যাং তৎকার্যমতো হরিরিতি স্মৃতঃ হরতি শ্রীকৃষ্ণমনঃ কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী। অতো হরেত্যনেনৈব শ্রীরাধা পরিকীর্তিতা।। অনুবাদ: ভগবত্তত্ত্ব অর্থাৎ শ্রীভগবান্ চিদ্ঘনানন্দবিগ্রহ জানিতে হইবে। তিনি অবিদ্যা হরণ করেন বলিয়া ‘হরি’-নামে স্মরণীয়। শ্রীকৃষ্ণাহ্লাদ-স্বরূপিণী শ্রীরাধা শ্রীকৃষ্ণমন হরণ করেন বলিয়া ‘হরা’ নামে পরিকীর্তিতা। . আনন্দৈকসুখস্বামী শ্যামঃ কমললোচনঃ। গোকুলানন্দনো নন্দনন্দনঃ কৃষ্ণ ঈর্যতে॥ অনুবাদ: আনন্দৈক-সুখস্বামী অর্থাৎ (শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি) আনন্দস্বরূপা শ্রীমতী রাধিকার একমাত্র সুখস্বরূপ স্বামী কমললোচন শ্যাম গোকুলের আনন্দজনক নন্দনন্দন ‘কৃষ্ণ’-সংজ্ঞায় সংজ্ঞিত। . বৈদগ্ধ্য-সারসর্বস্বং মূর্তিলীলাধিদৈবতম্। রাধিকাং রময়ন্নিত্যং রাম ইত্যভিধীয়তে॥ অনুবাদ: শ্রীকৃষ্ণ বৈদগ্ধ্যসার-সর্বস্ব এবং মূর্ত-লীলার অধিদেবতা। শ্রীরাধিকার নিত্য রমন অর্থাৎ প্রীতিবর্ধনের জন্য তিনি ‘রাম’- নামে অভিহিত। . শ্রীল গোপালগুরু গোস্বামীকৃত নামার্থের শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর কৃত ভাষ্য (‘ভজনরহস্য’ গ্রন্থে) চিদ্ঘন আনন্দরূপ শ্রীভগবান্। নামরূপে অবতার এইত’ প্ৰমাণ।। অবিদ্যাহরণ কার্য হৈতে নাম হরি। অতএব হরে কৃষ্ণ নামে যায় তরি’॥ কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী শ্রীরাধা আমার। কৃষ্ণমন হরে তাই হরা নাম তাঁর॥ রাধাকৃষ্ণ-শব্দে শ্রীসচ্চিদানন্দ রূপ। হরে কৃষ্ণ শব্দে রাধাকৃষ্ণের স্বরূপ॥ আনন্দ-স্বরূপ-রাধা তাঁর নিত্য স্বামী। কমললোচন শ্যাম রাধানন্দকামী॥ গোকুল-আনন্দ নন্দনন্দন শ্ৰীকৃষ্ণ। রাধাসঙ্গে সুখাস্বাদে সর্বদা সতৃষ্ণ॥ বৈদগ্ধ্য-সার-সর্বস্ব মূর্ত-লীলেশ্বর। শ্রীরাধারমণ রাম নাম অতঃপর॥ হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র শ্রীযুগল-নাম। যুগল লীলার চিন্তা কর অবিরাম॥ ।।হরে কৃষ্ণ।। স্বধর্মম্
শ্রীরামচন্দ্র কি স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন?

প্রভু শ্রীরামচন্দ্র কি স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন? না। রামায়ণে এ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের শাসন চলাকালীন একদা একসময় রাজ্যের প্রজারা কেমন আছেন বর্ণনা করতে, শ্রীভরত করজোড়ে প্রভু শ্রীরামচন্দ্রকে বললেন- জীর্ণানামপি সত্ত্বানাং মৃত্যুর্নায়াতি রাঘব। অরোগপ্রসবা নার্যো বওুষ্মস্তো হি মানব।।১৯।। হর্ষশ্চাভ্যধিকো রাজঞ্জনস্য পরবাসিনঃ। কালে বর্ষতি পর্জন্যঃ পাতয়ান্নমৃতং পরঃ।।২০।। বাতাশ্চাপি প্রবাস্ত্যেতে স্পর্শযুক্তাঃ সুখাঃ শিবাঃ। ঈদৃশো নশ্চিরং রাজা ভবেদিতি নরেশ্বরঃ।।২১।। কথয়ন্তি পরে রাজন্ পৌরজানপদস্তেথা। [ শ্রীমদবাল্মীকি রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড ৪১।১৯-২২] বঙ্গানুবাদ: হে রাঘব, নারীগণ বিনা কষ্টেই প্রসব করছেন। সকল মানুষকেই হৃষ্টপুষ্ট দেখা যাচ্ছে। হে রাজন্ ! পুরবাসীদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে রয়েছে। মেঘ ঠিক সময়মতো অমৃত সমান জলবর্ষণ করছে। বায়ু এমনভাবে বইছে যে, তার স্পর্শ শীতল ও সুখদায়ক মনে হচ্ছে। রাজন্ ! নগর ও জনপদের লোকে বলা-বলি করছে যে, পুরীতে চিরকাল ধরে এমনই প্রভাবশালী রাজা যেনো থাকে। . শ্রীমদ্ভাগবতে প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্ব সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে- নাধিব্যাধিজরাগ্লানিদুঃখশোকভয়ক্লমাঃ। মৃত্যুশ্চানিচ্ছতাং নাসীদ্ রামে রাজন্যধোক্ষজে।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ৯।১০।৫৩ ] বঙ্গানুবাদ: ভগবান শ্রীরামচন্দ্র যখন এই পৃথিবীতে রাজত্ব করেছিলেন, তখন (প্রজাদের) সমস্ত দৈনিক এবং মানসিক ক্লেশ, ব্যাধি, জড়া, সন্তাপ, দুঃখ, শোক, ভয় ও ক্লান্তি সম্পূর্ণরুপে অনুপস্থিত ছিল। এমনকি ইচ্ছা না করলে মৃত্যুও কারো কাছে উপস্থিত হতো না। . রামায়ণে যুদ্ধকাণ্ডে এ সম্পর্কে আরো উল্লেখ রয়েছে- ন পর্যদেবন্ বিধবা ন চ ব্যালকৃতং ভয়ম্। জনন ব্যাধিজং ভয়ং চাসীদ্ রামে রাজ্যং প্রশাসতি৷৷ নির্দস্যুরভবল্লোকো নানর্থং কশ্চিদস্পৃশৎ। নচস্ম বৃদ্ধা বালানাং প্রেতকার্যাণি কুর্বতে।। সর্বং মুদিতমেবাসীৎ সর্বো ধর্মপরোহভবৎ। রামমেবানুপশ্যন্তো নাভ্যহিংসন্ পরস্পরম্।। [ শ্রীমদবাল্মীকি রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড ১২৮।৯৮-১০০] বঙ্গানুবাদ: প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালে কোনদিন বিধবাদের বিরহ-বিলাপ শোনা যায়নি। সর্পাদি শ্বাপদের ভয় অথবা রোগভয় কখনও প্রাদুর্ভূত হয়নি। সমগ্র রাজ্যের কোথাও চোর-ডাকাতের নাম পর্যন্ত শোনা যেত না। রাজ্যে কেউ অনর্থকারী কার্যে লিপ্ত হোত না কিংবা বৃদ্ধগণের কদাপি নবীনদের জন্য অন্ত্যেষ্টি সৎকার করার প্রয়োজন পড়ত না। সকলে সদা আনন্দে থাকত এবং ধর্মাচরণ করত। প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের শাসনে একে অন্যকে হিংসা করত না। অর্থাৎ প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালে প্রজাদের সুখের কোনো অভাব ছিলো না। প্রজারাও চাচ্ছিলেন পুরীতে চিরকাল ধরে এমনই প্রভাবশালী রাজা যেনো থাকে। ।। হরে কৃষ্ণ ।। [ বি:দ্র: স্বধর্মম্-এর অনুমোদন ব্যাতীত এই লেখার কোনো অংশ পুনরুৎপাদন, ব্যবহার, কপি পেস্ট নিষিদ্ধ। স্বধর্মম্-এর সৌজন্যে শেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত ] নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
ছাগল-মহিষ বলি নয়! কালীসাধক রামপ্রসাদ ৬ রিপুকে বলি দিতে বলেছেন !!

ছাগল-মহিষ বলি নয়! কালীসাধক রামপ্রসাদ ৬ রিপুকে বলি দিতে বলেছেন !! হিন্দু সমাজের অন্যতম সংস্কারক কালীসাধক রামপ্রসাদ সেন পশুবলি কুপ্রথা বিরুদ্ধে ছিলেন সরব। ধর্মের মিথ্যা দোহাই দিয়ে পশুহত্যা করে মন্দিরকে কসাইখানায় পরিনত করাকে নিন্দার দৃষ্টিতে দেখতেন শুদ্ধ সরল হৃদয় মাতৃসাধক রামপ্রসাদ সেন। নিজের ভিতরে থাকা কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য নামক ষড় রিপুরূপী অসুরকে বলি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন মায়ের আশীর্বাদপুষ্ট এ কালীসাধক, রচনা করেন কালবিজয়ী একাধিক রামপ্রসাদী শ্যামাসঙ্গীত। “মেষ ছাগল মহিষাদি, কাজ কী রে তোর বলিদানে । তুমি জয় কালী জয় কালী বলে, বলি দেও ষড় রিপুগণে ॥ তুমি জয় কালী বলি দেও করতালি, মন রাখো সেই শ্রীচরণে ॥” তামসিক পুজারীরা কামনা বাসনা চরিতার্থে অবলা জীবের রক্ত কালীর নিকট মানত করে। কালীসাধক রামপ্রসাদ তাদের সর্তক করে বলেছেন অবলা জীবের জীবন নিয়ে মা কালীর সাথে ঘুষের ব্যবসা চলবে না। কারণ, মা কখনো সন্তানের রক্ত চান না। “মেষ-মহিষ আর ছাগলছানা। জানিস মুক্তকেশী কালী আমার। কারো কাছে ঘুষ খাবেনা।।” যুগে যুগে হিন্দু সমাজে মহান কিছু সমাজ সংস্কারকের মুহুর্মুহু প্রচেষ্টায় হিন্দু সমাজ হতে যেরূপে সতীদাহ কিংবা নরবলির মতো কুপ্রথার বিলুপ্তি ঘটেছে, ঠিক তেমনিভাবে বর্তমানে জাগ্রত সচেতন হিন্দু সমাজের অবারিত প্রচেষ্টায় তামসিক পূজা বহুলাংশে কমে গেছে, ধীরে ধীরে পূজায় পশুবলি, মদ-মাদক সেবন কিংবা ডিজে বাজানোর মতো কুপ্রথা অনেক কমেছে। আশা করা যায়, অতি অল্প সময়ের মধ্যে এ সমস্ত কুপ্রথা থেকে সনাতনী সমাজ মুক্ত হবে, সমুন্নত হবে সাত্ত্বিক চেতনা। ।। হরে কৃষ্ণ ।। [ বি:দ্র: স্বধর্মম্-এর অনুমোদন ব্যাতীত এই লেখার কোনো অংশ পুনরুৎপাদন, ব্যবহার, কপি পেস্ট নিষিদ্ধ। স্বধর্মম্-এর সৌজন্যে শেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত ] নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
বৈদিক শাস্ত্রে কোথায় শ্রীমতি রাধারাণীর উল্লেখ রয়েছে?

বৈদিক শাস্ত্রে কোথায় শ্রীমতি রাধারাণীর উল্লেখ রয়েছে? বেদ সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ। বেদ বা শ্রুতি শাস্ত্র প্রধানত চার প্রকার- ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ। প্রত্যেক বেদ-এর চারটি করে অংশ থাকে। যথা- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদ। সনাতন শাস্ত্রে শ্রীমতি রাধারাণীকে ‘বৃষভানুনন্দিনী’, ‘বার্ষভানবী’ ‘গান্ধর্ব্বী’ ইত্যাদি নামে সম্বোধন করা হয়েছে। শ্রুতি বা বেদ শাস্ত্রে বিশেষ করে ঋগ্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদে শ্রীমতি রাধারাণীর বহু উল্লেখ দেখা যায়। এছাড়াও নারদীয় মহাপুরাণ, পদ্ম মহাপুরাণ, শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্ত মহাপুরাণ, বরাহপুরাণ, স্কন্দ পুরাণ, মৎস্য পুরাণ, ব্রহ্মান্ড পুরাণ, গর্গ-সংহিতা, সনৎকুমার সংহিতা ও নারদ-পঞ্চরাত্র ইত্যাদি শাস্ত্রেও বিশেষভাবে শ্রীমতি রাধারাণীর মহিমা বর্ণিত রয়েছে। শ্রুতি বা বেদ শাস্ত্রে শ্রীমতি রাধারাণী – স্তোত্রং রাধানাং পতে গির্বাহো বীর যস্য তে। বিভূতিরস্তু সূনৃতা ॥ [ ঋগ্বেদ সংহিতা ১।৩০।৫; সামবেদ সংহিতা, উত্তরার্চিক ১৬।৩।৮ ; সামবেদ-১৬০০ ] বঙ্গানুবাদ: হে রাধাপতি (ঐশ্বর্যের পতি), হে বীর! প্রশস্তি দ্বারা স্তুত, যে তোমার স্তুতি করে সে সমৃদ্ধি ও আনন্দ লাভ করে। অর্থাৎ তাঁর সত্য রূপা প্রিয় সমৃদ্ধি লাভ হয়। ইদং হ্যন্বোজসা সুতং রাধানাং পতে। পিবা ত্বাস্য গিৰ্বণঃ ॥ [ ঋগ্বেদ সংহিতা ৩।৫১।১০; সামবেদ সংহিতা, উত্তরার্চিক ২।৩।১ ; সামবেদ-৭৩৭ ] বঙ্গানুবাদ: হে রাধাপতি (ঐশ্বর্যের পতি), হে স্তুতিপ্রিয়! তেজ দ্বারা সম্পন্ন এই মধুর সোমরস তোমার পানের জন্য। তুমি এসে পান কর। তস্য মধ্যে হি শ্রেষ্ঠা গান্ধর্ব্বীত্যুবাচ। তং হি বৈ তাভিরেরং বিচার্য্য।। [ অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদ, উত্তরবিভাগ, মন্ত্র ৯ ] বঙ্গানুবাদ: গোপীদিগের মধ্যে গান্ধর্ব্বী ( রাধারাণীর একটি নাম) নামে এক প্রধানা গোপী তাঁদের সাথে বিচার করে জিজ্ঞাসা করলেন। দ্বে পার্শ্বে চন্দ্রাবলী রাধিকা চেতি যস্যাংশেন লক্ষ্মীদুর্গাদিকা শক্তিরিতি। [ অথর্ববেদ, পুরুষবোধিনী উপনিষদ, ১ম প্রপাঠক ] বঙ্গানুবাদ: “তাঁর(শ্রীকৃষ্ণের) দুই পাশে চন্দ্রাবলী ও রাধিকা। এই রাধিকা হলেন কৃষ্ণের স্বরূপশক্তি যার অংশে লক্ষ্মী দুর্গাদি শক্তি।” এ শ্রুতি মন্ত্রে লক্ষ্মী,দূর্গা প্রাকৃত দেবী নন। ইনারা চিন্ময়ধামস্থিত মহালক্ষ্মী, মহাদূর্গাদি দেবী। তস্যাদ্যা প্রকৃতী রাধিকা নিত্যা নির্গুণা সর্বালঙ্কারশোভিতা প্রসন্নাশেষলাবণ্যসুন্দরী । অস্মদাদীনাং জন্ম তদধীনং অস্যাংশাদ বহুবো বিষ্ণুরুদ্রাদয়ো ভবন্তি । [ অথর্ববেদ, পুরুষবোধিনী শ্রুতি, ৩য় প্রপাঠক ] বঙ্গানুবাদ: সেই পরমপুরুষের আদ্যা প্রকৃতি রাধিকা। তিনিও শ্রীকৃষ্ণের নিত্যা অর্থাৎ কেবল দ্বাপরে কুব্জাদির ন্যায় কৃষ্ণ লীলা সঙ্গিনী নন। শ্রীকৃ্ষ্ণের ন্যায় তিনিও নির্গুণা অর্থাৎ গুণাতীত। সর্ব অলঙ্কারে সুশোভিতা, প্রসন্না অশেষলাবণ্যবতী আমাদের সকলের আদি, তাঁর অংশে কোটি বিষ্ণুরুদ্রাদির জন্ম হয়। . পুরাণ শাস্ত্রে শ্রীমতি রাধারাণী: অথর্ববেদীয় ছান্দোগ্য উপনিষদ-৭।১।২ মন্ত্রে, পুরাণ ও ইতিহাস শাস্ত্রকে পঞ্চম বেদ বলা হয়েছে, “ইতিহাসপুরাণং পঞ্চমং বেদানাং”। দেবী কৃষ্ণময়ী প্রোক্তা রাধিকা পরদেবতা। সর্বলক্ষ্মীস্বরূপা সা কৃষ্ণাহ্লাদস্বরূপিণী।। [ পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ড, ৫০।৫৩ ] বঙ্গানুবাদ: দেবী রাধিকা কৃষ্ণময়ী। তাই তিনি পরদেবতা রূপে কথিতা হন। তিনি সর্বলক্ষ্মীরূপিণী এবং কৃষ্ণের হ্লাদিনী স্বরূপা। . পদ্মপুরাণে আরো উল্লেখ রয়েছে – কথিতুং তৎফলং পুণ্যং ন শক্নোত্যপি নারদ । কোটিজন্মাৰ্জ্জিতং পাপং ব্রহ্মহত্যাদিকং মহৎ। কুৰ্ব্বন্তি যে সকৃদ্ভক্ত্যা তেষাং নশ্যতি তৎক্ষনাৎ।। [ পদ্মপুরাণ, ব্রহ্মখণ্ড ৭।৭] বঙ্গানুবাদ: যে সকল মানুষ ভক্তিভরে একবার মাত্র এই মহাপবিত্র শ্রীরাধাষ্টমী ব্রত পালন করে থাকেন, সেই সকল মানুষের কোটি জন্মের ব্রহ্মহত্যাদি সমস্ত মহাপাপ তৎক্ষনাৎ বিনাশ হয়ে যায়। . পদ্মপুরাণে আরো উল্লেখ হয়েছে – বামপার্শ্বে স্থিতাং তস্য রাধিকাঞ্চ স্মরেত্ততঃ। নীলচোলকসংবীতাং তপ্তহেমসমপ্রভাম্।। পট্টাঞ্চলেনাবৃতার্দ্ধ-সুস্মেরাননপঙ্কজাম্। কান্তবক্তে ন্যস্তনেত্রাং চকোরীর চলেক্ষণাম।। [ পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ড, অধ্যায় ৫০, শ্লোক ৪৪,৪৫ ] বঙ্গানুবাদ: ভক্ত স্মরণ করবে- পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের বামভাগে রাধিকা বিরাজমান রয়েছেন, তাঁর পরিধান-নীলবসন, উত্তপ্ত স্বর্ণের ন্যায় তাঁর দেহপ্রভা; তাঁর ঈষৎ হাসিযুক্ত মুখপদ্ম আঁচলে অর্ধাবৃত। চকোরী পাখি যেমন চন্দ্রের অমৃত কিরণ পান করেন, তেমনি শ্রীমতি রাধিকা তার চঞ্চল নেত্রযুগল দ্বারা নিজ কান্ত(স্বামী) কৃষ্ণের মুখচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে তার রূপমাধুর্য্যসুধা আস্বাদন করছেন। . পদ্মপুরাণে আরও বলা হয়েছে- ততঃ সারিশুকানাঞ্চ শ্রুত্বা বাগাহবং মিথঃ। নির্গচ্ছতস্ততঃ স্থানাদগন্তুকামৌ গৃহং প্রতি ॥ কৃষ্ণঃ কান্তামনুজ্ঞাপ্য গবামভিমুখং ব্রজেৎ। সা তু সূর্যাগৃহৎ গচ্ছেৎ সখীমণ্ডলসংযুতা ॥ [ পদ্মপুরাণ, পাতালখন্ড, অধ্যায় ৫২, শ্লোক ৭৬,৭৭ ] বঙ্গানুবাদ: রাধার ভ্রূভঙ্গী দর্শন ও কৃষ্ণের প্রতি তিরস্কার বাক্য শ্রবণ করার নিমিত্ত শুক-সারিকা- পক্ষিগণ সেখানে উপস্থিত হয়ে নিজেরাই আবার বাগ্যুদ্ধ বাধিয়ে দিলো। রাধা- কৃষ্ণ তাদের বাগযুদ্ধ শ্রবণ করে গৃহগমনাভিলাষে সেখান হতে বহির্গত হন। কৃষ্ণ তার কান্তা(পত্নী) শ্রীমতি রাধিকার অনুমতি নিয়ে গাভীবৃন্দের অভিমুখে গমন করেন। শ্রীমতি রাধা সখীগণসমভিব্যাহারে সূর্য্য পূজা করার জন্য সূর্য্য-গৃহে গমন করেন। . নারদীয় মহাপুরাণে উল্লেখ রয়েছে – কদাচিৎ তয়া সার্দ্ধ স্থিতস্য মুনিসত্তম কৃষ্ণস্য। বামভাগাৎ জাতো নারায়ণঃ স্বয়ম্।। রাধিকায়াশ্চ বামাংগান্মহালক্ষ্মীভূব হ। ততঃ কৃষ্ণো মহালক্ষ্মীং দত্ত্বা নারায়ণায় চ।। বৈকুন্ঠ স্থাপযামাস শশ্বত্পালনকর্মণি।। [ নারদীয় মহাপুরাণ, পূর্বভাগ, ৩।৮৩।১২-১৪ ] বঙ্গানুবাদ: হে মুনিসত্তম, কোনো এক সময় অর্ধাঙ্গিনী রাধা সহিত অবস্থানকালে কৃষ্ণের বামাঙ্গ থেকে নারায়ণ জাত হলো আর শ্রীমতি রাধিকার বামাঙ্গ হতে মহালক্ষ্মীর আবির্ভাব হলো। কৃষ্ণ তখন মহালক্ষ্মী নারায়ণকে প্রদান করলেন এবং বৈকুণ্ঠে স্থিতি প্রদান করে নিত্য পালনকার্যে নিযুক্ত করলেন। . স্কন্দপুরাণে উল্লেখ রয়েছে – বৃষভানুসুতাকান্তবিহারে কীর্ত্তনশ্রিয়া। সাক্ষাদিব সমাবৃত্তে সর্ব্বেহনন্যদৃশোহভবন।। [ স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখন্ড, শ্রীমদ্ভাগবতমাহাত্ম্যম, অধ্যায় ২ ৩১ ] বঙ্গানুবাদ: বৃষভানুর কণ্যা শ্রীমতি রাধিকার কান্ত(পতি) সাক্ষাৎ কৃষ্ণের বিহারভূমি কীর্ত্তনসমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ হলো এবং সকলেই যেন অনন্য নয়ন হয়ে সেই উৎসব দর্শন করিতে লাগিলেন। শিব পুরাণে বলা হয়েছে- কালবতীসুতা রাধা সাক্ষাদগোলোকবাসিনী। গুপ্তস্নেহানিবদ্ধা সা কৃষ্ণপত্নী ভবিষ্যতি।। [ শিব মহাপুরাণ, রুদ্রসংহিতা, পার্বতীখন্ড, অধ্যায় ২ শ্লোক ৪০; সনদকুমার উক্তি] বঙ্গানুবাদ: সাক্ষাৎ গোলকনিবাসিনী রাধা কলাবতীর কণ্যা হয়ে শ্রীকৃষ্ণের সহিত গোপণে স্নেহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ভবিষ্যতে কৃষ্ণপত্নী হবেন। . ব্রহ্মবৈবর্ত মহাপুরাণে উল্লেখ রয়েছে – স্বয়ং রাধা কৃষ্ণপত্নী কৃষ্ণবক্ষঃস্থলস্থিতা । প্রাণাধিষ্ঠাতৃদেবী চ তস্যৈব পরমাত্মনঃ।। [ ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, প্রকৃতিখন্ড, অধ্যায় ৪৮, শ্লোক ৪৭ ] বঙ্গানুবাদ: শ্রীমতী রাধিকা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের পত্নীরূপে অবস্থিতা। নিরন্তর তিনি পরমব্রহ্ম কৃষ্ণের বক্ষঃস্থলে স্থিতি করেন, ফলতঃ সেই রাধা পরাৎপর কৃষ্ণের প্রাণাধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে নির্দিষ্টা আছেন। . ব্রহ্মবৈবর্ত মহাপুরাণে আরো উল্লেখ রয়েছে – তদা ব্রহ্মা তয়োর্মধ্যে প্রজ্বাল্য চ হুতাশনম্ । হরিং সংস্মৃত্য হবনং চকার বিধিনা বিধিঃ ॥উত্থায় শয়নাৎ কৃষ্ণ উবাস বহ্নিসন্নিধৌ । ব্ৰহ্মণোক্তেন বিধিনা চকার হবনং স্বয়ম্ ॥প্রণম্য চ হরিং রাধাং দেবানাং জনকঃ স্বয়ম্। [ ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কৃষ্ণজন্মখণ্ড ১৫।১২৪-১২৬ ] বঙ্গানুবাদ: ব্রহ্মা ভক্তিপূর্ব্বক রাধাকৃষ্ণকে প্রণাম করলেন এবং তাঁদের মধ্যে অগ্নি প্রজ্বলিত করে শ্রীকৃষ্ণকে স্মরণ করে বিবিধক্রমে হোম করতে লাগলেন । তখন কৃষ্ণ শয্যা হতে উত্থান করে অগ্নি সমীপে উপবেশনপূর্ব্বক ব্রহ্মোক্ত বিধিক্রমে স্বয়ং হোম করতে আরম্ভ করলেন। এরপর বেদকর্ত্তা ব্রহ্মা শ্রীকৃষ্ণ ও রাধিকাকে প্রণাম করলেন। . ব্রহ্মবৈবর্ত মহাপুরাণে আরো উল্লেখ রয়েছে – মূঢ়া রায়াণপত্নী ত্বাং বক্ষ্যন্তি জগতীতলে’ [ শ্রীব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কৃষ্ণজন্মখন্ড, অধ্যায় ৩, শ্লোক ১০৩ ] বঙ্গানুবাদ: ভূতলে যারা মূঢ় (মূর্খ), তারাই শ্রীমতি রাধিকাকে রায়াণ(আয়ান) এর পত্নী বলে মনে করে। . ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে উল্লেখ রয়েছে – রাধাকৃষ্ণেতি দ্বেনাম সুস্মৃতোগোপ নন্দিনী। মহাপাপোপ পাপৌঘ কোটিশো যাস্তি সংক্ষয়ং। মৎসাযুজ্য পদমিতো মোদতে দেববৎ সদা।। [ ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ, উত্তরখণ্ড, রাধাহৃদয় ১৩।৭৪ ] বঙ্গানুবাদ: শ্রীকৃষ্ণ বললেন, হে গোপনন্দিনী রাধে, রাধা-কৃষ্ণ এই দুুই নাম যে ব্যাক্তি স্মরণ করেন,মহাপাপ ও উপপাপ প্রভৃতি কোটিপাপ তাঁর বিনষ্ট হবে। মৃত্যুর পর ইহলোক ত্যাগ করে তিনি আমার ধাম (চিন্ময় জগতের গোলক বৃন্দাবন ধাম) প্রাপ্ত হয়ে দেবতার মতো পরমানন্দে দিন যাপন করবেন। শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণে উল্লেখ রয়েছে – অনয়ারাধিতো নূনং ভগবান হরিরীশ্বরঃ। যন্ নো বিহায় গোবিন্দঃ প্রীতো যামনয়দ্রহঃ।। [ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১০।৩০।২৮] বঙ্গানুবাদ: এই বিশেষ গোপী নিশ্চয়ই