ইসকনে নারীদেরকে কি পুরুষদের তুলনায় কম বুদ্ধিমান মনে করা হয়?~পর্ব-২য়

শ্রীল প্রভুপাদের শিক্ষায় নারী ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাখ্যা শ্রীল প্রভুপাদ বিভিন্ন সময়ে নারী ও তাদের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝতে হলে আমাদের বিষয়টি পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করতে হবে। এখানে আমরা তার দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নলিখিত পাঁচটি ধাপে ব্যাখ্যা করবো: আত্মিক সমতা বনাম ভৌতিক পার্থক্য “কম বুদ্ধিমান” কথাটির প্রকৃত অর্থ বৈদিক সামাজিক ভূমিকা ও দায়িত্ব ভক্তিতে বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা আধুনিক সমাজ ও ইসকনে এর প্রয়োগ শিষ্যাদের প্রতি শ্রীল প্রভুপাদের মনোভাব ———————————————————————————————————————————————— ১. আত্মিক সমতা বনাম ভৌতিক পার্থক্য ক. আত্মিক স্তরে সমতা • বৈদিক শিক্ষায় বলা হয়েছে যে আত্মা (ātmā) নির্জাতীয় – অর্থাৎ, পুরুষ বা নারী হিসাবে কেউ জন্ম নেয় না, বরং আত্মা সবার এক। • শ্রীল প্রভুপাদ সবসময় জোর দিতেন যে কৃষ্ণভাবনামৃত অর্জনে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার আছে। • ইতিহাসে অনেক মহান নারী ভক্ত ছিলেন, যেমন কুন্তী দেবী, দ্রৌপদী, ও জাহ্নবা দেবী, যারা তাদের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের জন্য প্রসিদ্ধ। শ্রীল প্রভুপাদের উক্তি: “আত্মিকভাবে, সবাই সমান। একজন নারী নিকৃষ্ট নয়; তিনিও একজন আত্মা। কিন্তু শারীরিকভাবে, তার প্রকৃতি ভিন্ন, যেমন একটি শিশুর বুদ্ধি একজন প্রাপ্তবয়স্কের তুলনায় ভিন্ন হয়।” (প্রবচন, লস এঞ্জেলস, ১৯৭৪) খ. ভৌতিক স্তরে পার্থক্য • আত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারী-পুরুষ সমান হলেও, শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নারী ও পুরুষের ভিন্ন প্রকৃতি আছে। • শ্রীল প্রভুপাদ কখনো কখনো বলতেন যে নারীরা তুলনামূলকভাবে কম বুদ্ধিমান, তবে এটি তাদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত নয়, বরং সাধারণ যুক্তিভিত্তিক চিন্তাভাবনা ও বাস্তবজীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে। ———————————————————————————————————————————————— ২. “কম বুদ্ধিমান” কথাটির প্রকৃত অর্থ ক. বৈদিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুদ্ধিমত্তা বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী বুদ্ধিমত্তাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ১. ভৌতিক বুদ্ধিমত্তা (Buddhi) – যুক্তি, বিশ্লেষণ, ও বিচক্ষণতা। ২. আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা (Bhakti Buddhi) – কৃষ্ণ ও আত্মার সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতা। • শ্রীল প্রভুপাদ যখন বলতেন “নারীরা কম বুদ্ধিমান”, তখন তিনি ভৌতিক বুদ্ধির প্রসঙ্গেই বলতেন। • তিনি মনুসংহিতা (Manu-saṁhitā) থেকে উদ্ধৃতি দিতেন, যেখানে বলা হয়েছে যে নারীরা সাধারণত আবেগপ্রবণ হয়, ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সহজেই প্রভাবিত হতে পারে। খ. আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী • আধুনিক গবেষণাও দেখায় যে নারীরা আবেগপ্রবণ বুদ্ধিমত্তায় (emotional intelligence) বেশি পারদর্শী, আর পুরুষরা বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনায় (logical intelligence) বেশি পারদর্শী। • বৈদিক যুগে এই পার্থক্যের কারণে নারী ও পুরুষের আলাদা সামাজিক ভূমিকা ছিল, কিন্তু এটি কোনোভাবেই নারীর হীনতা প্রকাশ করে না। উদাহরণ: • একজন মা তার সন্তানের প্রতি বিশেষ আবেগপ্রবণ হন, কিন্তু একজন বাবা সাধারণত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কারণ তিনি তুলনামূলকভাবে বিচার-বিবেচনা বেশি করেন। ———————————————————————————————————————————————— ৩. বৈদিক সামাজিক ভূমিকা ও দায়িত্ব ক. বৈদিক সমাজে নারী ও পুরুষের ভূমিকা • প্রাচীন বৈদিক সমাজে, নারী ও পুরুষের স্পষ্ট আলাদা দায়িত্ব ছিল: • পুরুষ: দর্শন, নেতৃত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতেন। • নারী: পরিবার, সন্তান পালন ও ভক্তি কার্যকলাপে মনোনিবেশ করতেন। • “নারীদের কম বুদ্ধিমান” বলা হত এই অর্থে যে তারা বেশি আবেগপ্রবণ, তাই বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে তাদের পিতা, স্বামী বা পুত্রের আশ্রয়ে থাকা উচিত – এটি তাদের নিরাপত্তার জন্য, অপমান করার জন্য নয়। খ. ইসকনে শ্রীল প্রভুপাদের বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি • যদিও তিনি কখনো কখনো বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে কথা বলেছেন, কিন্তু ইসকনে তিনি নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছেন। • নারীরা ইসকনে: • প্রচার ও মন্দির পরিচালনা করেন • কীর্তন ও বক্তৃতা দেন • শাস্ত্র অনুবাদ ও প্রকাশনা করেন উদাহরণ: • আজ ইসকনের অনেক নারী গুরু, আচার্য ও প্রশাসক হিসেবে কাজ করছেন, যা ঐতিহ্যগত বৈদিক সমাজে দেখা যেত না। ———————————————————————————————————————————————— ৪. ভক্তিতে বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা • ভগবদ্গীতা (১০.১০) অনুসারে, কৃষ্ণ বলেন যে যারা তাঁর ভক্ত, তাদের প্রকৃত বুদ্ধি দেন। • শ্রীল প্রভুপাদ জোর দিয়েছিলেন যে সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা হলো কৃষ্ণের প্রতি আত্মসমর্পণ করা। • একজন কৃষ্ণভক্ত নারী প্রকৃতপক্ষে লক্ষ লক্ষ সাধারণ পুরুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। উক্তি: “একজন নারী যদি কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করে, তবে সে লক্ষ লক্ষ সাধারণ পুরুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।” (প্রবচন, মায়াপুর, ১৯৭৭) ———————————————————————————————————————————————— ৫. আধুনিক সমাজ ও ইসকনে এর প্রয়োগ ক. কাল, স্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বয় • শ্রীল প্রভুপাদ সবসময় পরিস্থিতি অনুযায়ী তার শিক্ষা ব্যাখ্যা করেছেন। • তিনি স্বীকার করেছেন যে আধুনিক সমাজে নারীরা শিক্ষিত ও যোগ্য, তাই তাদের আধ্যাত্মিক বিকাশের সুযোগ থাকা উচিত। খ. লিঙ্গের চেয়ে ভক্তির গুরুত্ব • শ্রীল প্রভুপাদ লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যের চেয়ে একজনের ভক্তির গুরুত্ব বেশি দিয়েছেন। • ইসকনে, নারী ও পুরুষ উভয়েই ভক্তি, শিক্ষা ও প্রচারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পেয়েছেন। উদাহরণ: • ইসকনের নারী সাধ্বীরা আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রবক্তা ও আচার্য রূপে প্রতিষ্ঠিত। ———————————————————————————————————————————————— ৬. শিষ্যাদের প্রতি শ্রীল প্রভুপাদের মনোভাব 1. পিতৃসুলভ ভালোবাসা ও যত্ন – শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর মহিলা শিষ্যাদের প্রতি গভীর স্নেহ, যত্ন ও সুরক্ষা প্রদান করতেন, যা এক পিতার ভালোবাসাকেও অতিক্রম করত। 2. সম্মান ও উৎসাহ – বৈদিক নীতিগুলি মেনে চললেও, তিনি কখনোই মহিলাদের নিম্নতর মনে করতেন না। বরং, তিনি তাঁদের ভক্তিমূলক সেবায় উৎসাহ দিতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করতেন। 3. ব্যক্তিগত যত্ন – তিনি তাঁদের সুস্থতার খোঁজখবর রাখতেন, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করতেন। 4. বৈষ্ণবী হিসেবে স্বীকৃতি – তিনি বলেছিলেন যে কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করা মহিলারা সাধারণ নন; তাঁদের বৈষ্ণবী হিসেবে যথাযথ সম্মান দেওয়া উচিত। 5. আধ্যাত্মিক উন্নতি – তাঁর সকল ব্যবহারের লক্ষ্য ছিল তাঁদের কৃষ্ণের নিকটবর্তী করা, যেখানে তিনি সদয়তা, সুরক্ষা ও প্রকৃত আধ্যাত্মিক যত্ন প্রদান করতেন। ———————————————————————————————————————————————— চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: কিভাবে প্রভুপাদের বক্তব্য বুঝতে হবে? ১. আত্মিকভাবে নারী ও পুরুষ সমান – উভয়েরই কৃষ্ণচেতনা অর্জনের সমান সুযোগ আছে। ২. ভৌতিক স্তরে কিছু পার্থক্য আছে – নারীরা আবেগপ্রবণ, পুরুষরা বিশ্লেষণধর্মী। ৩. ভক্তিই সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা – কৃষ্ণকে আত্মসমর্পণ করাই প্রকৃত জ্ঞান। ৪. ইসকনে নারী ক্ষমতায়িত হয়েছে – বৈদিক সমাজের তুলনায় ইসকনে নারীরা অনেক সুযোগ পেয়েছেন। ———————————————————————————————————————————————— শেষ কথা: নারীদের কম বুদ্ধিমান বলার পরিবর্তে, শ্রীল প্রভুপাদ জোর দিয়েছেন যে সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করা। যে নারী বা পুরুষ কৃষ্ণের প্রতি আত্মসমর্পণ করেছেন, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী। ১ম পর্বঃ https://svadharmam.com/why-srimad-bhagavatam-says-that-women-and-sudras-do-not-have-the-ability-to-understand-vedas/ ©শ্রী দেবর্ষি শ্রীবাস দাস
বর্ণসঙ্কর ব্যক্তি কি দীক্ষাগুরু হতে পারেন?~পর্ব-৫

‘বৈষ্ণবগণ দ্বিজোত্তম’ শাস্ত্রবাক্য জেনেও সমাজে কিছু ধর্মব্যবসায়ী প্রায়ই দাবী তুলেন, ‘শূদ্র কিংবা শূদ্রাধম, বর্ণহীন, অন্ত্যজ, বর্ণসঙ্কর, অসৎকূলজাতগণ বৈষ্ণব হলেও দীক্ষাগুরু হতে পারে না!!’ এরূপ ভাগবতম সিদ্ধান্ত বিরুদ্ধ মত যারা প্রসন করেন, তারা নিশ্চিতরূপে নরকের কীট। আজ আমরা মহামুনি মতঙ্গ ঋষির দৃষ্টান্ত দেখবো, যিনি বর্ণসঙ্কর হয়েও বৈষ্ণব ধর্ম পালনের মাধ্যমে ব্রহ্মর্ষি হয়েছিলেন এবং অন্যতম বৈষ্ণব দীক্ষাগুরুরূপে জগতবাসীদের করুণা করেছেন। মতঙ্গ মুনি শূদ্র নাপিতের ঔরসে কামোন্মত্তা ব্রাহ্মণীর গর্ভে জন্ম, অতএব জাতিতে চণ্ডাল ছিলেন। তার জন্ম সম্পর্কে মহাভারতে বলেছে- “ব্রাহ্মণ্যাং বৃষলেন ত্বং মত্তায়াং নাপিতেন হ জাতত্ত্বমসি চাণ্ডালো ’(মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, ২৮।১৭) মতঙ্গ মুনি প্রথম জীবনে ইন্দ্রের তপস্যা করেছিলেন, কিন্তু তাতে অভিষ্ট লাভ না করতে পেরে বিষ্ণুভক্তিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং মহামুনিতে পরিণত হয়েছিলেন। ‘মুনিশার্দ্দুলো মতঙ্গো বিষ্ণুতৎপরঃ’’( স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখন্ড, বেঙ্কটাচলমাহাত্ম্যম, ৩৯।২) মতঙ্গ মুনি ভক্তশ্রেষ্ঠ হনুমানেরও কূলগুরু ছিলেন। স্কন্দপুরাণে (বিষ্ণুখন্ডের বেঙ্কটাচলমাহাত্ম্যের ৩৯ অধ্যায়ে) উল্লেখ আছে, পুত্রলাভ না হওয়ায় বানররাজ কেশরী এবং মাতা অঞ্জনা খুব দুঃখিত ছিলেন। মতঙ্গ মুনি দেবী অঞ্জনাকে তখন মুখ্যপ্রাণ বায়ুর তপস্যায় প্রেরণ করেছিলেন এবং কেশরী-অঞ্জনা বায়ুদেবের তপস্যায় সিদ্ধ হয়ে তিনি মুখ্যপ্রাণকে পুত্র হনুমানরূপে লাভ করেছিলেন। রামায়ণের কিষ্কিন্ধাকাণ্ডের ৭৩-৭৪ সর্গে মতঙ্গ মুনি ও তার শিষ্যগণের উল্লেখ আছে। মতঙ্গমুনির নিষ্ঠাবান শিষ্যগণ গুরুভক্তি দ্বারা এতই তজস্বী হয়েছিলেন যে গুরুদেবের জন্য বন্য ফলমূল সংগ্রহকালে তাদের শরীর থেকে যে ঘাম মাটিতে পড়তো, সে ঘাম থেকে সুগন্ধি পুষ্পবৃক্ষের জন্ম হতো। সে সমস্ত পুষ্পবৃক্ষের পুষ্প কখনো মলিন হত না। মতঙ্গ মুনি ও তার শিষ্যগণ ভক্তিযোগ পূর্ণ করে মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক নিজেদের মন্ত্রপূত দেহকে অগ্নিতে আহুতি দিয়ে ভগবানের নিত্যধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। নিত্যধামে গমনকালে তিনি তার শিষ্যা তপস্বীনি শবরীকে আশীর্বাদ করেছিলেন একদিন তিনি সাক্ষাৎ ভগবান রামচন্দ্রের দর্শন পাবেন। শ্রীরামচন্দ্র মাতা সীতার অন্বেষণকালে মতঙ্গবনে মতঙ্গমুনির আশ্রমে এসেছিলেন এবং শবরীর নিকট নিত্যধামগত মতঙ্গমুনির সমাধিস্থল, পূজাবেদী, পরিধেয় বস্ত্র দর্শন করে ভগবান রামচন্দ্র আনন্দিত হয়েছিলেন। শবর কূলে জন্মালেও গুরুদেব মতঙ্গ মুনির সেবার প্রভাবে তপস্বিনী শবরী সাক্ষাৎ ভগবান শ্রীরামচন্দ্রকে লাভ করেন। ভগবান রাম ভক্ত শবরীর উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করে ভক্তের মানবৃদ্ধি করেন। সাক্ষাৎ ভগবান রামকে সম্মুখে রেখে দর্শন করতে করতে যোগাগ্নিতে জড়দেহকে আহুতি দিয়ে শবরী মাতা দিব্যদেহ ধারণ করে অক্ষয়ধামে গমন করেন। ধন্য গুরু মতঙ্গ! ধন্য শিষ্যা শবরী! মতঙ্গ মুনি বর্ণসঙ্কর হয়েও পতিতপাবন দীক্ষাগুরুর এক আদর্শ দৃষ্টান্ত। অতএব যারা বৈষ্ণবকে জাতভেদ দৃষ্টিতে দর্শন করেন তাদের সুমতি হোক, শূদ্রপুত্র মতঙ্গ মুনির কৃপা তাদের উপর বর্ষিত হোক। ©ব্রজসখা দাস
শ্রীকৃষ্ণের কি মৃত্যু হয়েছিল, নাকি তিনি স্বশরীরে বৈকুন্ঠে গমন করেছিলেন ?

আমাদের সমাজে কিছু শাস্ত্রজ্ঞানহীন ভগবৎ-বিদ্বেষী ব্যক্তি আছে, যারা শ্রীকৃষ্ণকে তাদের মতোই সাধারণ মানুষ মনে করে। অথচ মহাভারত শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলা হয়েছে, স্বয়ং চতুর্ভুজ বিষ্ণু বলা হয়েছে। অনুগ্রহার্থং লোকানাং বিষ্ণুলোক নমস্কৃতঃ। বসুদেবাত্তু দেবক্যাং প্রাদুর্ভূতো মহাযশাঃ।। ( মহাভারত, আদিপর্ব, ৫৮/১৩৮ ) অনুবাদ: ত্রিজগতের পূজনীয় মহাযশস্বী স্বয়ং বিষ্ণু লোকের প্রতি অনুগ্রহ করিবার জন্য বসুদেব-দেবকীতে আবির্ভূত হইয়া ছিলেন। কিন্তু তার পরেও এ সমস্ত অজ্ঞানী মানুষেরা তাদের আসুরিক মতকে প্রচার করতে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করতেছে, যা অশাস্ত্রীয়, ঘৃন্য এবং আসুরিক। অথচ মহাভারত শাস্ত্রের মৌষলপর্ব পাঠ করে আমরা সহজে জানতে পারি, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে তার অন্তর্ধানের সময় নির্ধারন করেছিলেন। তখন তিনি একটি বৃক্ষের উপর চতুর্ভূজ বিষ্ণুরুপে অবস্থান করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণ স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গে এবং পরে বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেন। অসুরেরা যেহেতু মহাভারত শাস্ত্র উক্ত শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণুরুপে মানে না, পরমেশ্বর ভগবানরুপে মানে না, তাই তারা মহাভারত শাস্ত্রের এসমস্ত জ্ঞান সাধারন মানুষের মাঝে প্রচার না করে এর বিপরীতে অশাস্ত্রীয় ভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্ধান লীলা নিয়ে অপপ্রচার করছে। নিম্নে মহাভারতের মৌষল পর্ব অবলম্বনে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা রহস্যের সত্য ইতিহাস পরিবেশিত হল…. ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা: বৃষ্ণিবংশ বা যদুবংশ ধ্বংস হওয়ার পর- ততো গত্বা কেশবস্তুং দদর্শ রামং বনে স্থিতমেকং বিবিক্তে ॥১২৷৷ অথাপশ্যযোগযুক্তস্য তস্য নাগং মুখানিঃসরন্তং মহান্তম্। শ্বেতং যযৌ সততঃ প্রেক্ষ্যমাণে। মহার্ণবে যেন মহানুভাবঃ ॥১৩৷৷ সহস্রশীর্ষঃ পর্ব্বতাভোগবর্ষ্ম। রক্তাননঃ স্বাং তনুং তাং বিমুচ্য। সম্যক্ চ তং সাগরঃ প্রত্যগৃহ্লান্নাগা দিব্যাঃ সরিতশ্চৈব পুণ্যাঃ ॥১৪৷ ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১২-১৪ ) অনুবাদঃতাহার পর কৃষ্ণ যাইয়া নির্জন বনস্থিত একাকী বলরামকে দেখিলেন। ১২।। আরও দেখিলেন যে, যোগপ্রবৃত্ত বলরামের মুখ হইতে একটা শ্বেতবর্ণ বিশাল নাগ নির্গত হইতেছে। সেই নাগ নির্গত হইয়া মহাসমুদ্রে প্রবেশ করিল। যেহেতু, সে মহাপ্রভাবশালী ছিল। ১৩।।সহস্র মস্তক পর্ব্বতের ন্যায় বিশাল দেহ ও রক্তমুখ সেই নাগ নিজ বলরাম- দেহ পরিত্যাগ করিয়া সাগরজলে প্রবেশ করিলেন। তখন সাগরও আদরের সহিত তাঁহাকে গ্রহণ করিল এবং দিব্য নাগসমূহ ও পুণ্য নদীসকলও তাঁহাকে গ্রহণ করিল।” ১৪।। ভগবান বলরামের এরুপ অন্তর্ধানের পর:- ততো গতে ভ্রাতরি বাসুদেবো জানন্ সর্বা গতয়ো দিব্যদৃষ্টিঃ ॥১৭৷ বনে শূন্যে বিচরংশ্চিন্তয়ানো ভূমৌ চাথ সংবিবেশাগ্র্যতেজাঃ। সর্বং তেন প্রাক্ তদা চিন্ত্যমাসীদ্গান্ধাৰ্য্যা যদ্বাক্যমুক্তঃ স পূর্ব্বম ॥১৮৷৷ ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১৭-১৮) অনুবাদঃ”এইভাবে ভ্রাতা বলরাম মর্ত্যলোক হইতে প্রস্থান করিলে দিব্যজ্ঞানশালী কৃষ্ণ সকলেরই সমস্ত অবস্থা জানিতে পারিয়া চিন্তাকুল চিত্তে শূন্য বনে বিচরণ করিতে করিতে ভূতলে শয়ন করিলেন এবং পূর্ব্বে গান্ধারী যে বাক্য বলিয়াছিলেন, মহাতেজা কৃষ্ণ তখন সেই সমস্তই চিন্তা করিতে লাগিলেন।”১৭-১৮৷৷ দুর্বাসসা পায়সোচ্ছিষ্টলিপ্তে যচ্চাপ্যুক্তং তচ্চ সম্মার কৃষ্ণঃ। সঞ্চিন্তয়ন্নন্ধকবৃষ্ণিনাশং কুরুক্ষয়ঞ্চৈব মহানুভাবঃ ॥১৯৷৷ যেনে ততঃ সংক্রমণস্য কালং ততশ্চকারেন্দ্রিযসংনিরোধম্। যথা চ লোকত্রয়পালনার্থং দুর্বাসবাক্যপ্রতিপালনায় ॥২০॥ দেবোহপি সন্দেহবিমোক্ষহেতোনির্ণীত মৈচ্ছৎ সকলার্থতত্ত্ববিৎ। স সংনিরুদ্ধেন্দ্রিয়বাঙ্মনাস্ত শিশ্যে মহাযোগমুপেত্য কৃষ্ণঃ ॥২১৷ জরোহথ তং দেশমুপাজগাম লুব্ধস্তদানীং মৃগলিপ্স রুগ্রঃ। স কেশবং যোগযুক্তং শযানং মৃগাশঙ্কী লুব্ধকঃ সাযকেন ॥২২॥ জরোহবিধাৎ পাদতলে ত্বরাবাংস্তং চাভিতস্তজ্জিবৃক্ষুর্জগাম। অথাপশ্যৎ পুরুষং যোগযুক্তং পীতাম্বরং লুব্ধকোহনেকবাহুম্ ॥২৩৷৷ (মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১৯-২৩) মহানুভাব কৃষ্ণ যদুবংশ ধ্বংস ও কুরুবংশ বিনাশ ভাবিতে থাকিয়া দুর্ব্বাসার উচ্ছিষ্ট পায়স দ্বারা ভূমি লিপ্ত করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন, দুর্ব্বাসার সেই বাক্য স্মরণ করিলেন।১৯।।তাহার পর কৃষ্ণ সেই সময়টাই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করিলেন। পরে তিনি ত্রিভুবন পালন করিবার জন্য এবং দুর্ব্বাসার বাক্য রক্ষা করিবার নিমিত্ত ইন্দ্রিয়গণকে নিরুদ্ধ করিলেন।২০॥ সকলার্থতত্ত্বজ্ঞ কৃষ্ণও সন্দেহ দূর করিবার জন্য নিশ্চিত বিষয় কামনা করিলেন। তখন কৃষ্ণ মহাযোগ অবলম্বন করিয়া ইন্দ্রিয়, বাক্য ও মনকে নিরুদ্ধ রাখিয়া ভূতলে শয়ন করিলেন।২১॥তাহার পর উগ্রমূর্ত্তি ও হরিণলিপ্সু জরানামক এক ব্যাধ সেই সময়ে সেই স্থানে আগমন করিল এবং মৃগ মনে করিয়া বাণদ্বারা যোগযুক্ত অবস্থায় শায়িত কৃষ্ণের পদতলে বিদ্ধ করিল, পরে ত্বরান্বিত হইয়া সেই বিদ্ধ মৃগকে গ্রহণ করিতে ইচ্ছা কবিয়া তাহার নিকট গমন করিল। তদনন্তর সে দেখিল-অনেক বাহু, পীতাম্বরপরিধায়ী ও যোগযুক্ত একটা পুরুষ শায়িত রহিয়াছেন।২২-২৩॥ বিশ্লেষণঃ উপরোক্ত বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন দর্শন করলেন বলরাম সমুদ্রে লীন হলেন তখন তিনি সেই সময়টিকেই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করেছিলেন। অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই জড় জগত ত্যাগ করার সময় নিজেই নির্ধারণ করেছিলেন। সুতারাং যারা শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবানরুপে স্বীকার করতে চায় না, তাদের কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা, শ্রীকৃষ্ণ যদি পরমেশ্বর ভগবান না হন, তাহলে তিনি কিভাবে জড় জগত ত্যাগের সময় নিজেই নির্ধারণ করতে পারেন? এরপর দেখা যাক, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলার পরবর্তী অংশ। মহাত্মানং ত্বপরাদ্ধং স তস্য পাদৌ জরো জগৃহে শঙ্কিতাত্মা।আশ্বাসিতঃ পুণ্যফলেন ভক্ত্যা তথানুতাপাৎ কৰ্ম্মণো জন্মনশ্চ।।২৪।। (মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২৪) অনুবাদঃ”সেই জরা নামক ব্যাধ নিজেকে অপরাধী মনে করিয়া উদ্বিগ্ন চিত্ত হইয়া শ্রীকৃষ্ণের চরণযুগল ধারণ করিল। তখন তাহার পুণ্য, ভক্তি এবং নিজের দুষ্কর্ম ও জন্ম বিষয়ে অনুতাপ করায় কৃষ্ণ তাহাকে আশ্বস্ত করিলেন।” বিশ্লেষণঃ উপরোক্ত শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলার এ অংশে আমরা বুঝতে পারি যে, জরা নামক ব্যাধ শ্রীকৃষ্ণকে মৃগ বা হরিণ মনে করে বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন এবং ব্যাধ যখন তীরবিদ্ধ মৃগকে নিতে আসলেন তখন তিনি দেখলেন সেখানে কোন মৃগ নেই বরং সেখানে অসংখ্য হস্তধারী স্বয়ং বিষ্ণু শায়িত আছেন। এখান থেকে স্পষ্ট প্রমানিত হয় যে, শ্রীকৃষ্ণ কখনো কোন সাধারন মানুষ নন, তিনি হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু। সুতারাং অসুরেরা যে প্রচার করছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ জরা নামক ব্যাধের তীরে মারা গেছেন, প্রকৃতপক্ষে তা হল মিথ্যা প্রচার, কারণ শ্রীবিষ্ণু, যিনি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান, তার কখনো মৃত্যু হতে পারে না।এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে নিম্নে আলোচনা করা হয়েছে। যাহোক ব্যাধ অনেকবাহু শ্রীবিষ্ণুকে ( শ্রীকৃষ্ণ) দর্শন করা মাত্রই নিজের কর্মকে দূষ্কর্ম ও জন্ম বিষয়ে অনুতাপ করলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। এরপর দৃষ্টা তথা দেবমন্তবীর্য্যং দেবৈঃ স্বর্গং প্রাপিতস্ত্যক্তদেহ।গণৈমুনীণাং পূজিতস্তত্র কৃষ্ণো গচ্ছন্নদ্ধং ব্যাপ্য লোকান স লক্ষ্যা।। ২৫।।দিব্যং প্রাপ্তয় বাসবোহথাশ্বণৌ চ রুদ্রাদিত্যা বসবশ্চাথ বিশ্বে।প্রত্যু্যদৃযষুমুর্নয়শ্চাপি সিদ্ধা গন্ধর্বমুখ্যাশ্চ সহাপ্সরোভব।।২৬।। ততো রাজন! ভগবানুগ্রতেজা নারায়নঃ প্রভবশ্চাব্যয়শ্চ।যোগাচার্য্যো রোদসী ব্যাপ্য লক্ষ্যা স্থাং প্রাপ স্বং মহাত্মহপ্রমেয়ম।।২৭।। ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২৫-২৭ ) অনুবাদ: দেবগণ অনন্তবীর্য নারায়ণকে (শ্রীকৃষ্ণ) দর্শন করিয়া ব্যাধের দেহকে রাখিয়া ব্যাধকে স্বর্গে লইয়া গিয়াছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ আপন কান্তিদ্বারা জগৎ ব্যাপ্ত করে উর্দ্ধদিকে গমন করিতে লাগিলেন তখন মুনিগণ শ্রীকৃষ্ণের পূজা করিতে লাগিলেন।২৫।। শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গে উপস্থিত হইলে ইন্দ্র,অশ্বিনীকুমারদ্বয়,একাদশ রুদ্র,দ্বাদশ আদিত্য,অষ্টবসু, বিশ্বদেবগণ,সিগ্ধ মুনিগণ এবং অপ্সরাদের সাথে গন্ধর্বশ্রেষ্টগণ তাহার (কৃষ্ণের) প্রত্যুদ্গমন (আরাধনা) করিয়াছিলেন।২৬।। তাহার পর ভীষণতেজা, জগতের উৎপাদক, অবিনশ্বর, যোগ শিক্ষক, মহাত্মা ভগবান নারায়ন ( শ্রীকৃষ্ণ) আপন কান্তিদ্বারা স্বর্গ,মর্ত্ত্য ব্যাপ্ত করিয়া সাধারণের অর্জ্ঞেয় স্বকীয় বৈকুণ্ঠধাম গমন করিয়াছিলেন।২৭।। বিশ্লেষণ: উপরোক্ত মহাভারতের আলোচনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনেকবাহু ধারন করে স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গ এরপর তার স্বীয় চিন্ময় বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেছিলেন। এ সম্পর্কে ভাগবতেও একই তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে.. লোকাভিরামাং স্বতনুং ধারানাধ্যানমঙ্গলম। যোগধারনয়াগ্নেয়্যাদগ্ধা ধামাবিশ্য স্বকর্ম।। ( শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১১/৩১/০৬ ) অনুবাদ: “সর্বজগতের সর্বাকর্ষক বিশ্রামস্থল, এবং সর্বপ্রকারের ধ্যান ও মননের বিষয়,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার দিব্য শরীরে আগ্নেয় নামক অলৌকিক ধ্যানের প্রয়োগে দগ্ধ না করিয়া তার স্বীয় ধামে গমন করিয়াছিলেন।” পরিশেষে উপরোক্ত মহাভারত এবং শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়,পরমেশ্বর ভগবানরুপে শ্রীকৃষ্ণের কখনো মৃত্যু হয়
সনাতন ধর্মে নারী সম্মান~সমাদৃত নাকি অবহেলিত?

বিধর্মীদের প্রপাগাণ্ডার ফাঁদে না পড়ে নিজ বৈদিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে রাখুন। অনেকে বলে থাকেন আমাদের ধর্ম দিয়েছে নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান ইত্যাদি, ইত্যাদি অথচ, ঐ সমাজ সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখি বাস্তবতা ভিন্ন। আজ ভিন্ন যবন-ম্লেচ্ছ-অনার্য সংস্কৃতি চর্চায় আমাদের বৈদিক সমাজের অধঃযাত্রায় হারিয়েছে নারীর মর্যাদা। তাই সকলের সচেতনতায় ফিরে আসুক সেই সনাতন ঐতিহ্য। বৈদিক সমাজে নারীর অবস্থান সমাদৃত নাকি অবহেলিত এটা বুঝতে গেলে আমার বেদাদি শাস্ত্রের বর্ণনার দিকে তাকিয়ে দেখি নারীর অধিকার সর্বগ্রগণ্য। ♦Ladies First এটা তো বৈদিক শিক্ষা, শুনে থাকবেন নামগুলো- প্রথমেই নারীশক্তি: লক্ষ্মীনারায়ণ, রাধামাধব, রাধাকৃষ্ণ, সীতারাম ইত্যাদি। একনজরে সংক্ষিপ্তভাবে বৈদিক শাস্ত্রের কিছু উদ্ধৃতি: “বাহনে বা যানে আরোহী ব্যক্তির পক্ষে বয়স্ক ব্যক্তি, ক্লান্ত ব্যক্তি, ভারবাহী ব্যক্তি, বর, রাজা, স্নাতক এবং স্ত্রীলোকদের পথ ছেড়ে দেয়া কর্তব্য।” (মনুসংহিতা ২/১৩৮) “একজন পিতা, ভাই, পতি বা দেবর তাদের কন্যা, বোন, স্ত্রী বা ভ্রাতৃবধুকে মৃদুবাক্য, ভদ্র ব্যবহার ও উপহারাদি দ্বারা খুশি ও সন্তুষ্ট রাখবেন। যারা যথার্থ কল্যাণ ও উন্নতি চান, তারা নিশ্চিত করবেন যে, তাদের পরিবারের নারীরা যাতে সর্বদা খুশী থাকেন এবং কখনো দুর্দশা ভোগ না করেন”। (মনুসংহিতা ৩/৫৫) “যে বংশে স্ত্রীলোকেরা বস্ত্রালঙ্কারাদির দ্বারা সমাদৃত হন, সেখানে দেবতারা প্রসন্ন থাকেন। আর যে বংশে স্ত্রীলোকদের সমাদর নেই সেখানে সমস্ত ক্রিয়া (প্রার্থনা, উপাসনাদি) নিষ্ফল।” (মনুসংহিতা ৩/৫৬) “যে বংশে ভগিনী ও গৃহস্থের স্ত্রী (নারীকূল) পুরুষদের কৃতকর্মের জন্য দুঃখিনী হয়, সেই বংশ অতি শীঘ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আর যে বংশে স্ত্রীলোকেরা সন্তুষ্ট থাকে, সেই বংশ নিশ্চিতভাবেই শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে”। (মনুসংহিতা ৩/৫৭) “যে বংশকে উদ্দেশ্য করে ভগিনী, পত্নী, পুত্রবধূ প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা অনাদৃত, অপমানিত বা বৈষম্যের শিকার হয়ে অভিশাপ দেন, সেই বংশ বিষপান করা ব্যক্তি ন্যায় ধন-পশু প্রভৃতির সাথে সর্বতোভাবে বিনাশপ্রাপ্ত হয়।” (মনুসংহিতা ৩/৫৮) “যারা ঐশ্বর্য কামনা করে, তারা স্ত্রীলোকদের সম্মান প্রদর্শন দ্বারা খুশী রাখবে এবং উত্তম অলংকার, পোশাক ও খাদ্যদ্বারা প্রীত রাখবে। স্ত্রীজাতিকে সর্বদা পবিত্র হিসেবে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করবে।” (মনুসংহিতা ৩/৫৯) “যে স্বামী তার স্ত্রীকে সন্তুষ্ট রাখে না, সে তার সমগ্র পরিবারের জন্য দুর্দশা বয়ে আনে। আর যদি স্ত্রী পরিবারের প্রতি সুখী থাকেন, তবে সমগ্র পরিবার শোভাময় হয়ে থাকে।” (মনুসংহিতা ৩/৬২) “নববিবাহিতা বধূ, কন্যা এবং গর্ভবতী মহিলাদের অতিথি ভোজনের পূর্বেই ভোজন প্রদান করতে হবে।” (মনুসংহিতা ৩/১১৪) “নারী অপহরণকারীদের মৃত্যুদণ্ড হবে।” (মনুসংহিতা ৮/৩২৩) “যদি কোন নারীকে সুরক্ষা দেবার জন্য পুত্র বা কোন পুরুষ পরিবারে না থাকে, অথবা যদি সে বিধবা হয়ে থাকে, যে অসুস্থ অথবা যার স্বামী বিদেশে গেছে, তাহলে রাজা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। যদি তার সম্পত্তি তার কোন বন্ধু বা আত্মীয় হরণ করে, তাহলে রাজা দোষীদের কঠোর শাস্তি দেবেন এবং সম্পত্তি ঐ নারীকে ফেরত দেবেন।” (মনুসংহিতা ৮/২৮-২৯) “যদি কেউ মা, স্ত্রী বা কন্যার নামে মিথ্যা দোষারোপ করে তবে তাকে শাস্তি দিতে হবে।” (মনুসংহিতা ৮/২৭৫) “যারা নারীদের ধর্ষণ করে বা উত্যক্ত করে বা তাদের ব্যাভিচারে প্ররোচিত করে তাদের এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে তা অন্যদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে এবং কেউ তা করতে আর সাহস না পায়।” (মনুসংহিতা ৮/৩৫২) “যদি কেউ কোন ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া মা, বাবা, স্ত্রী বা সন্তান ত্যাগ করে, তাকে কঠিন দণ্ড দিতে হবে।” (মনুসংহিতা ৮/৩৮৯) “যে স্ত্রী দুঃশীলতা হেতু নিজে আত্মরক্ষায় যত্নবতী না হয়, তাকে পুরুষগণ ঘরে আটকে রাখলেও সে ‘অরক্ষিতা’ থাকে। কিন্তু যারা সর্বদা আপনা- আপনি আত্মরক্ষায় তৎপর, তাদের কেউ রক্ষা না করলেও তারা ‘সুরক্ষিতা’ হয়ে থাকে। তাই স্ত্রীলোকদের আটকে রাখা নিষ্ফল। স্ত্রীজাতির নিরাপত্তা প্রধানত তাদের নিজস্ব সামর্থ্য ও মনোভাবের উপর নির্ভরশীল।” (মনুসংহিতা ৯/১২) “স্ত্রী লোকেরা সন্তানাদি প্রসব ও পালন করে থাকে। তারা নতুন প্রজন্ম বা উত্তরসুরির জন্ম দেয়। তারা গৃহের দীপ্তি বা প্রকাশস্বরূপ। তারা সৌভাগ্য ও আশীর্বাদ বয়ে আনে। তারাই গৃহের শ্রী।” (মনুসংহিতা ৯/২৬) “প্রজন্ম থেকে প্রজন্মোন্তরে স্ত্রীরাই সকল সুখের মূল। কারণ, সন্তান উৎপাদন, ধর্ম পালন, পরিবারের পরিচর্যা, দাম্পত্য শান্তি এসব কাজ নারীদের দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়ে থাকে।” (মনুসংহিতা ৯/২৮) “নারী ও পুরুষ একে ভিন্ন অপরে অসম্পূর্ণ। এজন্য বেদে বলা হয়েছে ধর্মকর্ম পত্নীর সাথে মিলিতভাবে কর্তব্য”। (মনুসংহিতা ৯/৯৬) “পতি ও পত্নী মৃত্যু পর্যন্ত একসাথে থাকবেন। তারা অন্য কোন জীবনসঙ্গী গ্রহণ করবেন না বা ব্যাভিচার করবেন না। এই হলো নারী-পুরুষের পরম ধর্ম।” (মনুসংহিতা ৯/১০১) “যারা নারী, শিশু ও গুণবান পণ্ডিতদের হত্যা করে, তাদের কঠিনতম শাস্তি দিতে হবে।” (মনুসংহিতা ৯/২৩২) “আমার পূত্র শত্রুর নাশকারী এবং নিশ্চয়রূপে আমার কন্যা বিশিষ্টরূপে তেজস্বিনী।” (ঋগবেদ: ১০।১৫৯।৩) “যেমন যশ এই কন্যার মধ্যে এবং যেমন যশ সম্যকভৃত রথের মধ্যে, ঐরূপ যশ আমার প্রাপ্ত হোক।” (ঋগবেদ: ৯।৬৭।১০) “হে বধূ! শ্বশুরের প্রতি, পতির প্রতি, গৃহের প্রতি এবং এই সব প্রজাদের প্রতি সুখদায়িনী হও, ইহাদের পুষ্টির জন্য মঙ্গল দায়িনী হও। (অথর্ববেদ: ১৪।২।২৬) হে বধু! কল্যাণময়ী, গৃহের শোভাবর্দ্ধনকারী, পতি সেবা পরায়ণা, শ্বশুরের শক্তিদায়িনী, শাশুড়ি আনন্দ দায়িনী, গৃহকার্যে নিপুণা হও। (অথর্ববেদ: ১৪।২।২৭) “হে বধূ! যেমন বলবান সমুদ্র নদী সমূহের উপর সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছে, তুমিও তেমন পতিগৃহে গিয়া সম্রাজ্ঞী হইয়া থাকো। (অথর্ববেদ: ১৪।১।৪০) সবাইকে নারী দিবসে কৃষ্ণপ্রীতি ও শুভকামনা, হরেকৃষ্ণ।
যোগেশ্বরেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ~২য় পর্ব

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি কংস, শিশুপাল, শকুনি, দুর্যোধনাদি অসুরদের মতো পূর্বজন্মের ঈর্ষাপরায়ণ, বিষ্ণুবিদ্বেষী কতিপয় ব্যক্তি ইহজন্মেও অবচেতন মনের সেই প্রবৃত্তির জন্য তাঁকে (শ্রীকৃষ্ণ) সাধারণ মনুষ্য বানাতে ব্যতিব্যস্ত। তারা নানা ফন্দি আঁটে তাঁর ভগবত্তাকে নস্যাৎ করার জন্য। এই নির্বোধদের এমনই এক দাবি, “শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর নন। তিনি যোগযুক্ত হয়ে অর্থাৎ যোগের দ্বারা পরমেশ্বরের সাথে যুক্ত হয়ে ভগবদ্গীতার জ্ঞান প্রদান করেছিলেন”। অথচ পুরো ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ যে ঠিক কখন যোগযুক্ত হলেন আর কখন তার স্বাভাবিক স্বরূপ(মনুষ্য~অর্বাচীনদের ভাষ্যমতে)-এ ফিরে এলেন তার কোন ইয়ত্তা আমরা খুঁজে পাই না। এই নির্বোধরাও এই বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারে না। সমগ্র গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অসংখ্যবার নিজেকে পরমেশ্বর, জীবের অন্তরাত্মা, পরমব্রহ্ম দাবি করেছেন। আবার গুটিকয়েক জায়গায় তিনি পরোক্ষভাবে পরমাত্মা’র শরণ গ্রহণ করার কথাও বলেছেন(গীতাঃ ১৮/৬১-৬২)। এবং এই দুটি শ্লোকের ব্যাখ্যাও আমরা ১ম পর্বে করেছি। ১ম পর্বঃ https://svadharmam.com/krishna-is-the-supreme-personality-of-godhead/ ⚫ মূর্খদের দাবি অনুযায়ী যদি ধরেও নেই যে, “শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার সঙ্গে যোগের দ্বারা যুক্ত হয়ে গীতার জ্ঞান প্রদান করেছিলেন” তবে সেই দাবী অনুযায়ী ১৮/৬১-৬২ শ্লোক বিবেচনা করলে দেখা যায় উক্ত শ্লোক দুটি শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার সহিত যোগবিযুক্ত অবস্থায় বলেছেন। সেজন্য নিজেকে শুধুই শ্রীকৃষ্ণ ভেবেছেন ও অর্জুনকে পরমাত্মার শরণ গ্রহণ করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন । কিন্তু পরক্ষণেই আবার ১৮/৬৬ শ্লোকে পরমাত্মার সহিত যোগযুক্ত হয়ে পরমাত্মায় একাত্ম হয়ে গিয়ে (মূর্খমতে) নিজের (পরমেশ্বরের) শরণ গ্রহণ করার কথা বলেছেন। ⚫ তবে কি শ্রীকৃষ্ণ মুহুর্তেই যোগযুক্ত ও বিযুক্ত(যোগমুক্ত) হয়ে যান??? এইসব হাস্যকর, রম্য দাবি শুনে মনে হয় যেন “ইসব হাস্যকর, রম্য দাবি শুনে মনে হয় যেন “শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার সঙ্গে যোগযুক্ত হওয়ার জন্য যে Internet Connection Providers/Device ব্যবহার করতেন তার সিগন্যাল খুবই দুর্বল ছিল!। তা নাহলে তিনি কখন যে যোগযুক্ত হচ্ছেন (Connected) আর কখন যোগমুক্ত (Disconnected) হচ্ছেন তা বুঝা খুব মুশকিল।” যদিও ভগবদ্গীতায় কয়েক জায়গায়(১১/৮-৯; ১৮/৭৮) ভগবানকে “যোগেশ্বর” বলা হয়েছে। তা এই পর্বে আলোচনা করা হবে যে, শ্রীকৃষ্ণকে কেন “যোগেশ্বর বলা হয়েছে?”। দ্রঃ আমরা শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান জ্ঞানে এবং ভগবদ্গীতা’র “ভগবান উবাচ” বলে যত শ্লোক আছে তা স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণেরই মুখনিঃসৃত বিবেচনা করেই মূর্খদের দাবি খণ্ডণ করবো। ———————————————————————————————————————————————— শ্রীকৃষ্ণ সমস্ত যোগ শক্তির অধীশ্বরঃ যেহেতু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অণিমা-মহিমাদি অষ্টসিদ্ধি ও সমস্ত শক্তির প্রবর্তক – ♦মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে; গীতা ১০/৮ ~ আমার থেকেই সমস্ত কিছু প্রবর্তিত হয়েছে তাই শ্রীকৃষ্ণই সমস্ত যোগ শক্তির অধীশ্বর অর্থাৎ যোগেশ্বর। যেমন শ্রীমদ্ভাগবতের বহু জায়গায় শ্রীকৃষ্ণকে ‘যোগেশ্বর’(১০/১৪/২১, ১/৮/১৪, ১/৮/৪৩), ‘যোগাধীশ’(১০/১৯/১২), ‘যোগবীর্যং’(১০/১৯/১৪) সম্বোধন করা হয়েছে। ———————————————————————————————————————————————— শ্রীকৃষ্ণই সকল জীবের হৃদ্যন্তস্থ পরমাত্মাঃ যারা অণিমা, মহিমা আদি বিভিন্ন যোগশক্তি লাভের আশায় যম, নিয়ম প্রাণায়াম আদি অষ্টাঙ্গ যোগ অনুশীলন করেন তাঁদেরও অন্তিম লক্ষ্য বিষয়ে উপদেশ প্রদান করে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন– ♦যোগীনামাপি সর্বেষাম মদ্গতেন অন্তরাত্মনা গীতা ৬/৪৭ ~যোগীদের মধ্যে যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা সহকারে আমার(শ্রীকৃষ্ণের) ভজনা করেন। ♦সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো গীতা ১৫/১৫ আমি(শ্রীকৃষ্ণ) সকলের হৃদয়ে অবস্থান করি তাই সেইসব যোগীদের তথা সকল জীবের হৃদয়ে অবস্থিত অন্তরাত্মা শ্রীকৃষ্ণই। ———————————————————————————————————————————————— শ্রীকৃষ্ণই যোগেশ্বরেশ্বরঃ অনেক সময় সিদ্ধ যোগী(কর্দম মুনি, শুকদেব গোস্বামী) বা পরমেশ্বর ভগবানের শক্ত্যাবেশ অবতার(নারদ, ব্যসদেব, পরশুরাম) অথবা ভগবানের শুদ্ধভক্ত(যাঁরা ইতিমধ্যেই ব্রহ্মভূত স্তর প্রাপ্ত হয়েছেন) তাঁদের ক্ষেত্রেও (ভক্তিযোগেন, সেবতে…..ব্রহ্মভূয়ায়, কল্পতে; গীতাঃ১৪/২৬) “যোগেশ্বর” সম্বোধন ব্যবহৃত হয়। কারণ তাঁরা বিশেষ কার্যসিদ্ধির জন্য পরমেশ্বরের দ্বারা কৃপাপ্রাপ্ত। তাই তাঁরাও পরমেশ্বরের অনন্ত যোগশক্তির ক্ষীয়োদংশ প্রতিফলিত করেন। যেমন শ্রীমদ্ভাগবতের তৃতীয় স্কন্ধে বর্ণিত আছে যে, কর্দম মুনি নিজেকে নয়টি রূপে বিভক্ত করেছিলেন। আবার কখনও শিব, ব্রহ্মা আদি মহান দেবতাদেরকেও মহান যোগী, পরম যোগী, যোগেশ্বর বলা হয়। কেননা তাঁরাও নিরন্তর শ্রীহরির ধ্যানে মগ্ন থাকেন। কপর্দ্দী জটীলো মুণ্ডঃ শ্মশানগৃহসেবকঃ॥ উগ্রব্রতধরো রুদ্রো যোগী পরমদারুণঃ। দক্ষক্রতুহরশ্চৈব ভগনেত্রহরস্তথা॥ নারায়ণাত্মকো জ্ঞেয়ঃ পাণ্ডবেয় যুগে যুগে॥ মহাভারত, শান্তিপর্ব ৩২৭।১৮-২১ অনুবাদ: যিনি বিশাল জটাজুটযুক্ত, শ্মশানবাসী, কঠোরব্রতপরায়ণ, পরমযোগী রুদ্র যিনি দক্ষযজ্ঞ নাশ করেছিলেন, ভগের চোখ উৎপাটন করেছিলেন তিনি নারায়ণের অংশস্বরূপ। দিষ্ট্যা জনার্দন ভবানিহ নঃ প্রতীতো যোগেশ্বরৈরপি দুরাপগতিঃ সুরেশৈঃ। শ্রীমদ্ভাগবত ১০/৪৮/২৭ অনুবাদঃ হে জনার্দন, আমাদের মহা সৌভাগ্যের দ্বারা এখন আপনি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছেন, কারণ যোগেশ্বরগণ এবং দেবেন্দ্রগণও অতি কষ্টের দ্বারা কেবল এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারেন। তাই পরমেশ্বর ভগবান এই সমস্ত যোগেশ্বরগণেরও ঈশ্বর। যেমনটা বলা হচ্ছে শ্রীমদ্ভাগবতমে— ন চৈবং বিস্ময়ঃ কার্যো ভবতা ভগবত্যজে। যোগেশ্বরেশ্বরে কৃষ্ণে যত এতদ্বিমুচ্যতে ॥ শ্রীমদ্ভাগবত ১০/২৯/১৬ অনুবাদঃ জন্মরহিত যোগেশ্বরেশ্বর পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে তোমার বিস্মিত হওয়া উচিত নয়। শেষ পর্যন্ত এই ভগবানই জগতকে মুক্তি প্রদান করেন। বীক্ষ্য তান্ বৈ তথাভূতান্ কৃষ্ণো যোগেশ্বরেশ্বরঃ। ঈক্ষয়ামৃতবর্ষিণ্যা স্বনাথান্ সমজীবয়ৎ ॥ শ্রীমদ্ভাগবত ১০/১৫/৫০ অনুবাদঃ সেই যোগেশ্বরগণেরও ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণ সেই সমস্ত ভক্তদের প্রতি অনুকম্পা অনুভব করেছিলেন। এভাবেই তিনি তাঁদের প্রতি তাঁর অমৃতবৎ কৃপাদৃষ্টি বর্ষণের দ্বারা তৎক্ষণাৎ তাঁদের পুনর্জীবিত করেছিলেন। নাসাং দ্বিজাতিসংস্কারো ন নিবাসো গুরাবপি। ন তপো নাত্মমীমাংসা ন শৌচং ন ক্রিয়াঃ শুভাঃ । তথাপি হু্যত্তমঃশ্লোকে কৃষ্ণে যোগেশ্বরেশ্বরে। ভক্তির্দৃঢ়া ন চাম্মাকং সংস্কারাদিমতামপি ॥ শ্রীমদ্ভাগবত ১০/২৩/৪৩-৪৪ অনুবাদঃ এই নারীগণের কখনও উপনয়নাদি সংস্কার হয়নি, তারা ব্রহ্মচারীরূপে গুরুর আশ্রমে বাস করেনি, তারা কোনও তপশ্চর্যার অনুষ্ঠান করেনি, তারা আত্মার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বিচার-বিশ্লেষণ করেনি, শৌচাচার অথবা পুণ্য ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানেও যুক্ত নয়, তবুও উত্তমশ্লোক ও যোগেশ্বরেরও ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাদের দৃঢ় ভক্তি রয়েছে। পক্ষান্তরে, এই সমস্ত প্রক্রিয়ার অনুষ্ঠান করেও ভগবানের প্রতি আমাদের এরূপ ভক্তি নেই। ———————————————————————————————————————————————— অনেকেই আবার মনে করেন “শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর গীতার জ্ঞান ভুলে গিয়েছিলেন। তাই তিনি পুনরায় যোগযুক্ত হয়ে “অনুগীতা” প্রদান করেছিলেন।” এর খণ্ডন/উওর দেওয়া হয়েছে লিংকঃ https://svadharmam.com/does-krishna-forgot-the-transendental-knowledge/ ———————————————————————————————————————————————— শ্রীকৃষ্ণের চেয়ে উত্তম যোগী কেউ নেইঃ যেহেতু পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণ এই জগতে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য যুগে যুগে অবতরণ করেন তাই তিনি লোকশিক্ষার জন্য (যদ্ যদাচরতি শ্রেষ্ঠ, গীতাঃ৩/২১) বহুবিধ যাগ-যজ্ঞ, তপস্যা, বিদ্যানুশীলন, গুরুগ্রহণ ও নানা সামাজিক অনুষ্ঠান করেন। এবং যেহেতু তাঁর আরেক নাম অসমোর্ধ তাই তিনি যে আচরণই করেন না কেন তা নিঃসন্দেহে শ্রেষ্ঠ। তাই তিনি শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ বন্ধু, শ্রেষ্ঠ সন্তান, শ্রেষ্ঠ শিষ্য এবং শ্রেষ্ঠ যোগীও। কৃষ্ণ কৃষ্ণ মহাযোগিন্ বিশ্বাত্মন্ বিশ্বভাবন। প্রপন্নাং পাহি গোবিন্দ শিশুভিশ্চাবসীদতীম্ ৷৷ শ্রীমদ্ভাগবত ১০।৪৯।১১ অনুবাদঃ কৃষ্ণ, কৃষ্ণ। হে পরম যোগী! হে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পরমাত্মা ও রক্ষক। হে গোবিন্দ! দয়া করে আপনার শরণাগত আমাকে রক্ষা করুন। সর্বং নরবরশ্রেষ্ঠৌ সর্ববিদ্যাপ্রবর্তকৌ। সকৃন্নিগদমাত্রেণ তৌ সঞ্জগৃহতুনূপ ॥ শ্রীমদ্ভাগবত ১০।৪৫।৩৫ অনুবাদঃ হে রাজন, সেই পুরুষ শ্রেষ্ঠ কৃষ্ণ ও বলরাম, তাঁরা স্বয়ং সকল প্রকার জ্ঞানের আদি উদ্দ্গাতা হওয়ায় প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা একবার মাত্র শ্রবণ করেই তৎক্ষণাৎ সেই বিষয়সমূহ আয়ত্ত করছিলেন। নমঃ কৃষ্ণায় শুদ্ধায় ব্রহ্মণে পরমাত্মনে । যোগেশ্বরায় যোগায় ত্বামহং শরণং গতা ॥ শ্রীমদ্ভাগবত ১০।৪৯।১৩ অনুবাদঃ পরম শুদ্ধ, পরম ব্রহ্ম ও পরমাত্মা, যোগেশ্বর ও সকল জ্ঞানের উৎস স্বরূপ হে কৃষ্ণ, আমি আপনাকে প্রণাম নিবেদন করি। আপনার কাছে আশ্রয়ের জন্য আমি উপস্থিত হয়েছি ———————————————————————————————————————————————— তবে যেহেতু তাঁর থেকে শ্রেষ্ঠ আর কোন বস্তু নেই এবং সাধারণ জীবের মতো তাঁর অন্তরে অন্য কোন পরমাত্মা নেই তাই তিনি নিজেরই ধ্যান করেন। (বসুদেব কর্তৃক শ্রীকৃষ্ণের স্তব) অনাবৃতত্বাদ বহিরন্তরং ন তে সর্বস্য সর্বাত্মন আত্মবস্তুনঃ।। শ্রীমদ্ভাগবতঃ ১০/৩/১৭ অনুবাদঃ আপনি বাহ্য ও অন্তরশূন্য। আপনি কখনও দেবকীর গর্ভে প্রবেশ করেননি; পক্ষান্তরে,
রাসলীলা’র অন্তর্নিহিত তাৎপর্য-(২য় পর্ব)

আপ্তকাম, হৃষিকেশ(ইন্দ্রিয়াধিপতি), জগৎপতি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সর্বোৎকৃষ্ট নর-লীলা ‘রাস’।যা ইন্দ্রিয়তর্পণপরায়ণ সাধারণ মানুষের কাম-ক্রীড়ার মতো মনে হলেও বস্তুত তা জড়াতীত। কেননা এই ‘রাস’ কীর্তনের শ্রোতা-বক্তা উভয়েই ছিলেন সুব্রত(নিষ্ঠা সহকারে ব্রহ্মচর্য ব্রতাদি পালনকারী)। উন্নতস্তরের মানুষের কাছে সহজেই বোধগম্য যে, ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাবিলাস বিষয়ে অজ্ঞ মানুষদের মনেই কেবল এই সকল সন্দেহের উদয় হবে। তাই অনাদিকাল থেকেই মহান ঋষিবর্গ ও পরীক্ষিৎ মহারাজের মতো উন্নত রাজারা ভাবীকালের জন্য প্রামাণ্য উত্তর প্রস্তুত রাখবার উদ্দেশ্যে এই সমস্ত প্রশ্ন প্রকাশ্যেই উত্থাপন করেছিলেন। এ পর্বে আমরা শুকদেব-পরীক্ষিত মহারাজের সেই কথোপকথন শ্রবণ করবো। যা আলোচিত হয়েছে শ্রীমদ্ভাগবত এর ১০/৩৩/২৬-৩৬ শ্লোকে। শ্রীপরীক্ষিদুবাচ সংস্থাপনায় ধর্মস্য প্রশমায়েতরস্য চ । অবতীর্ণো হি ভগবানংশেন জগদীশ্বরঃ ॥ ২৬ ॥ স কথং ধর্মসেতুনাং বক্তা কর্তাভিরক্ষিতা। প্রতীপমাচরদ্ ব্রহ্মন্ পরদারাভিমর্শনম্ ॥ ২৭ ॥ অন্বয়: শ্রীপরীক্ষিৎ উবাচ – শ্রীপরীক্ষিৎ মহারাজ বললেন; সংস্থাপনায় – স্থাপন করার জন্য; ধর্মস্য – ধর্মের, প্রশমায় – দমন করার জন্য; ইতরস্য – অধর্মের; চ – এবং, অবতীর্ণঃ – অবতরণ করেন (পৃথিবীতে); হি – বস্তুত; ভগবান্ – পরমেশ্বর ভগবান; অংশেন – তাঁর অংশপ্রকাশ (শ্রীবলরাম) সহ; জগৎ – সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের, ঈশ্বরঃ – প্রভু; সঃ – তিনি; কথম্ – কিভাবে; ধর্ম-সেতুনাম্ – ধর্ম-মর্যাদার; বক্তা – বক্তা, কর্তা – কর্তা; অভিরক্ষিতা – স্বাক্ষক, প্রতীপম্ – বিপরীত; আচরৎ – আচরণ করলেন; ব্রাহ্মন্ – হে ব্রাহ্মহ্মণ, শুকদেব গোস্বামী, পর – অন্যদের, দার – পত্নীদের, অভিমর্শনম্ – স্পর্শ করলেন। অনুবাদ: পরীক্ষিৎ মহারাজ বললেন-হে ব্রাহ্মণ, যিনি পরমেশ্বর ভগবান, জগদীশ্বর, ধর্ম সংস্থাপন ও অধর্মের বিনাশের জন্য যাঁর অংশপ্রকাশ সহ এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন, প্রকৃতপক্ষে যিনি সমাজধর্মের মূল বক্তা, কর্তা ও সংরক্ষক, তিনি তা হলে কিভাবে পরস্ত্রীদের স্পর্শ করে প্রতিকূল আচরণ করলেন? ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য: শুকদেব গোস্বামী যখন বলছিলেন, তখন পরীক্ষিৎ মহারাজ লক্ষ্য করলেন যে, গঙ্গাতীরের সেই সমাবেশে উপবিষ্ট কিছু ব্যক্তি ভগবানের কার্যাবলী সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করছিলেন। এই সকল সন্দেহগ্রস্ত ব্যক্তিরা ছিল কর্মী, জ্ঞানী ও অন্যান্যরা, যারা ভগবানের ভক্ত নয়। তাদের সেই সন্দেহগুলি নিরসনের জন্য তাদের পক্ষ থেকে পরীক্ষিৎ মহারাজ এই প্রশ্নটি করেছিলেন। আপ্তকামো যদুপতিঃ কৃতবান্ বৈ জুগুপ্সিতম্। কিমভিপ্রায় এতন্নঃ সংশয়ং ছিন্ধি সুব্রত ॥ ২৮ ॥ অন্বয় আপ্তকামঃ-আত্ম-তৃপ্ত, যদুপতি- যদু বংশের অধিপতি, কৃতবান্- করলেন, বৈ-অবশ্যই। জুগুস্পিতম্-এই ধরনের নিন্দনীয়, কিম্-অভিপ্রায়ঃ-কি উদ্দেশ্যে, এতৎ-এই। নঃ-আমাদের, সংশয়ম্- সন্দেহ; ছিদ্ধি- ছেদন করুন, সুব্রত- হে নিষ্ঠাবান ব্রতপালনকারী। অনুবাদ হে নিষ্ঠাবান ব্রহ্মচারী, আত্মতৃপ্ত যদুপতি কি উদ্দেশ্যে এই ধরনের নিন্দিত আচরণ করেন, দয়া করে তা বর্ণনা করে আমাদের সন্দেহ অঞ্জন করুন। তাৎপর্য উন্নতস্তরের মানুষের কাছে সহজেই বোধগম্য যে, ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাবিলাস বিষয়ে অজ্ঞ মানুষদের মনেই কেবল এই সকল সন্দেহের উদয় হবে। তাই অনাদিকাল থেকেই মহান ঋষিবর্গ ও পরীক্ষিৎ মহারাজের মতো উন্নত রাজারা ভাবীকালের জন্য প্রামাণ্য উত্তর প্রস্তুত রাখবার উদ্দেশ্যে এই সমস্ত প্রশ্ন প্রকাশ্যেই উত্থাপন করেছিলেন। শ্রীশুক উবাচ ধর্মব্যতিক্রমো দৃষ্ট ঈশ্বরাণাঞ্চ সাহসম্। তেজীয়সাং ন দোষায় বহ্নেঃ সর্বভুজো যথা ॥ ২৯ ॥ অন্বয় শ্রীশুকঃ উৰাচ-শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন, ধর্ম-ব্যতিক্রমঃ–ধর্মনীতির ব্যতিক্রম; দৃষ্টঃ-দেখা যায়, ঈশ্বরাণাম্- শক্তিশালী নিয়ন্তাগণের, চ-ও, সাহসম্-দুঃসাহস, তেজীয়সাম্-চিন্ময়ভাবে তেজস্বী, ন-না, দোষায়-দোষের; বহ্নেঃ -অগ্নির; সর্ব-সর্ব, ভুজঃ-ভক্ষণ; যথা-যেমন। অনুবাদ শ্রীশুকদেব গোস্বামী বললেন-ঐশ্বরিক শক্তিমান নিয়ন্তাদের কার্যকলাপের মধ্যে আমরা আপাতদৃষ্টিতে সমাজনীতির দুঃসাহসিক ব্যতিক্রম লক্ষ্য করলেও, তাতে তাঁদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না, কারণ তাঁরা আগুনের মতোই সর্বভুক হলেও নির্দোষ হয়ে থাকেন। তাৎপর্য মহান তেজস্বী ব্যক্তিত্বগণ আপাতদৃষ্ট সমাজনীতি লঙ্ঘনের ফলে অধঃপতিত হন না। শ্রীধর স্বামী এই প্রসঙ্গে অন্যত্র ব্রহ্মা, ইন্দ্র, সোম, বিশ্বামিত্র ও অন্যান্যদের দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। আগুন সবকিছুই ভক্ষণ করে, কিন্তু তার ফলে আগুনের প্রকৃতির কোন পরিবর্তন হয় না। তেমনই, মহান ব্যক্তির আচরণের কোনও অনিয়ম হলেও তাঁর মর্যাদাহানি হয় না। যাই হোক, পরবর্তী শ্লোকে শুকদেব গোস্বামী সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণনা করেছেন যে, আমরা যদি ব্রহ্মাণ্ড শাসনকারী শক্তিমান পুরুষদের অনুকরণ করার চেষ্টা করি, তবে তার ফল হবে ভয়াবহ। নৈতৎ সমাচরেজ্জাতু মনসাপি হ্যনীশ্বরঃ। বিনশ্যত্যাচরন্মৌঢ্যাদ্ যথারুদ্রোহব্ধিজং বিষম্ ॥ ৩০ ॥ অন্বয় ন-না, এতৎ- এই; সমাচরেৎ-অনুষ্ঠান করা উচিত; জাতু-কখনও; মনসা-মনে মনে; অপি-ও; হি-নিশ্চিতভাবে, অনীশ্বরঃ- যে ঈশ্বর নয়, বিনশ্যতি-বিনাশ প্রাপ্ত হয়; আচরন মৌঢ্যাৎ-মূঢ়তা প্রযুক্ত আচরণ করে; যথা-যেমন; অরুদ্রঃ-যে রুদ্রদেব নয়; অব্ধিজম্- সমুদ্র হতে উৎপন্ন; বিষম্-বিষ। অনুবাদ যে ঈশ্বর নয়, তার কখনই মনে মনেও ঈশ্বরের আচরণের অনুকরণ করা উচিত নয়। যদি মুঢ়তাবশত কোনও সাধারণ মানুষ এই ধরনের আচরণের অনুকরণ করে, তা হলে সে নিজেকেই কেবল ধ্বংস করবে, যেমন রুদ্রদেব না হয়েই রুদ্রের মতো সমুদ্রপরিমাণ বিষ পান করার চেষ্টার ফলে মানুষ নিজেকেই বংস করে। তাৎপর্য রুদ্র অর্থাৎ ভগবান শিব একবার সমুদ্রপরিমাণ বিষ পান করেছিলেন, আর তার ফলে এক আকর্ষণীয় নীল চিহ্ন তাঁর কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা যদি তেমন বিষের এক ফোঁটাও পান করি, আমরা সঙ্গে সঙ্গে মারা যাব। তাই আমাদের যেমন শিবের লীলা অনুকরণ করা উচিত নয়, তেমনি গোপীগণের সঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাদিও অনুকরণ করা উচিত নয়। আমাদের পরিষ্কারভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে যে, ধর্মসংস্থাপনের জন্য অবতীর্ণ ভগবান কৃষ্ণ আমাদের কাছে প্রতিপাদন করার জন্য অবতীর্ণ হয়েছে যে, নিশ্চিতভাবে তিনিই ভগবান, আমরা নই। সেটি অবশ্যই স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত হওয়া উচিত। ভগবান তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির সঙ্গে উপভোগ করেন আর এইভাবে আমাদের পারমার্থিক স্তরে আকর্ষণ করেন। আমাদের কৃষ্ণকে অনুকরণ করার চেষ্টা করা উচিত নয়, কারণ তা হলে অপরিসীম দুঃখ পেতে হবে। ঈশ্বরাণাং বচঃ সত্যং তথৈবাচরিতং ক্বচিৎ। তেষাং যৎ স্ববচোযুক্তং বুদ্ধিমাংস্তৎ সমাচরেৎ ॥ ৩১ ॥ অন্বয় ঈশ্বরাণাম্-পরমেশ্বর ভগবানের শক্তি প্রদত্ত সেবক, বচঃ-কথা; সত্যম্- সত্য, তথা এব-ও, আচরিতম্- তারা যা করে, কচিৎ-কখনও, তেষাম্-তাদের। যৎ- যাঃ স্ব বচঃ –তাদের নিজ কথার সঙ্গে, যুক্তম- সামঞ্জস্যপূর্ণ, বুদ্ধিমান- যিনি বুদ্ধিমান; তৎ-সেই, সমাচরেৎ-পালন করা উচিত। অনুবাদ পরমেশ্বর ভগবানের শক্তিপ্রদত্ত সেবকদের কথা সকল সময়েই সত্য আর সেই কথার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তাঁদের আচরণ অনুকরণযোগ্য। অতএব তাঁদের নির্দেশ পালন করা বুদ্ধিমান ব্যক্তিগণের উচিত। তাৎপর্য ঈশ্বর শব্দটাকে সচরাচর সংস্কৃত অভিযানে “প্রভু, পরিচালক, রাজ্য” এবং “সমর্থ, সম্পাদনে ক্ষমতাসম্পন্ন” রূপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শ্রীল প্রভুপাদ সাধারণত ঈশ্বর শব্দটিকে “নিয়ন্তা” রূপে অনুবাদ করতেন যা চমৎকারভাবে “পরিচালক বা রাজা” এবং “সমর্থ ব্য সম্পাদনে ক্ষমতাসম্পন্ন” মুখ্যত এই দুই প্রাথমিক ধারণারই সমন্বয় সাধন করে। কোনও পরিচালক অযোগ্য হতে পারেন কিন্তু একজন নিয়ন্ত্রক হন তিনিই, যিনি প্রভু বা পরিচালকরূপে প্রকৃতপক্ষে ঘটনাটিকে সংঘটিত করান। সর্বকারণের পরম কারণ ভগবান কৃষ্ণ নিশ্চিতভাবেই তাই পরমনিয়ন্তা বা পরমেশ্বর। ঈশ্বর বা শক্তিমান পুরুষেরা যে আমাদের ব্রহ্মাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করেন, সেই বিষয়ে সাধারণ মানুষেরা, বিশেষত পশ্চিমী দেশগুলিতে সচেতন নন। ব্রহ্মাণ্ড সম্বন্ধে আধুনিক নির্বিশেণবাদী ধারণা অনুযায়ী বর্ণনা করা হয় যে, প্রাণহীন মহাজগতে পৃথিবী অনর্থক ভাসছে। এইভাবে আমরা জীবনের এক অনিশ্চিত চরম লক্ষ্য নিয়েই নিজেদের সংরক্ষণ করছি আর বংশরক্ষার প্রক্রিয়ায় জন্ম দিচ্ছি এবং পরের পর নিজস্ব ‘চরম লক্ষ্য’ সংরক্ষণ ও জন্মদানের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থেকে একটি অর্থহীন ঘটনাশৃঙ্খল বা ধারা তৈরি হয়ে চলেছে। অজ্ঞ জড়বাদীদের উদ্ভাবিত এই ধরনের নিখালা এবং অর্থহীন জগতের তুলনায় যে প্রকৃত মহা-জগৎ রয়েছে, তা জীবন প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ এবং সবিশেষ ব্যক্তি জীবন এবং প্রকৃতপক্ষে ভগবানের অস্তিত্বে পরিপূর্ণ, যে ভগবান এই সকল অস্তিত্ব ধারণ করে আছেন ও পালন করছেন। পরমেশ্বর
বৈষ্ণবগণ কি বেদবিহিত ধর্ম পালন করেন না?

‘বৈষ্ণব’ হচ্ছেন তাঁরাই, যারা শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের ভক্ত। বেদে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণুকে পরমেশ্বর বলা হয়েছে এবং তার সেবা করাকেই ধর্ম বলে নির্দেশ করা হয়েছে। একইসাথে বেদশাস্ত্রে সমগ্র মানবজাতিকেই বিষ্ণুভক্ত বা বৈষ্ণব হওয়ার জন্য উপদেশ প্রদান করা হয়েছে— “বৈষ্ণবমসি বিষ্ণবে ত্বা॥”: “বৈষ্ণব হও, বিষ্ণুর প্রীতির জন্য তোমাকে নিযুক্ত করছি।” (শুক্লযজুর্বেদ ৫।২১)। সুতরাং যারা বৈষ্ণব, তাঁরা শ্রীবিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের সেবক, তাই তাঁরা শতভাগ বেদ মান্য করেন এবং বেদবিহিত ধর্ম পালন করেন। এখন প্রথমে আমরা বেদ সম্পর্কে আলোচনা করব। বেদ আমাদের মূল ধর্মগ্রন্থ। বেদ শব্দের অর্থ হল জ্ঞান। যে শাস্ত্রে পরমেশ্বর ভগবানের মহিমাগাথা আলোচনা করা হয়েছে, জীবের সুখ এবং শান্তির পথ নির্দেশ রয়েছে তাঁকে বেদ বলা হয়। বেদের অপর নাম শ্রুতি। বেদ চার ভাগে বিভক্ত— ঋগ্বেদ, যর্জুবেদ (শুক্ল ও কৃষ্ণ), সামবেদ এবং অথর্ববেদ। প্রতিটি বেদেরইচারটি অংশ রয়েছে— সংহিতাভাগ, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক এবং উপনিষদ। সামবেদীয় ছান্দোগ্য উপনিষদে (৭।১।২) মহাভারত ও রামায়ণ নামক ইতিহাস এবং অষ্টাদশ পুরাণশাস্ত্রকে পঞ্চম বেদ হিসেবে সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে— “সহোবাচর্গ্বেদং ভগবোধ্যেমি যজুর্বেদং সামবেদমাথর্বণং চতুর্থমিতিহাসপুরাণং পঞ্চমং বেদানাং” নারদ বললেন, “হে ভগবান, আমি অবগত আছি, ঋক্ ,সাম, যজুঃ ও অর্থব— চারটি বেদ। আর বেদের পঞ্চমটি হল অষ্টাদশ পুরাণ এবং ইতিহাস (মহাভারত ও রামায়ণ)।” এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করা হয়েছে অমলপুরাণ শ্রীমদ্ভাগবত শাস্ত্রে (৩।১২।৩৯)। সেখানে বলা হয়েছে পুরাণসমূহই পঞ্চম বেদ “পুরাণাণি পঞ্চমং বেদম্।” আজকাল কিছু ব্যক্তি অল্পবিদ্যার ফলে নিজেরা তত্ত্ব সম্বন্ধে বিভ্রান্ত হয়ে অন্যদেরও বিভ্রান্ত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরল সনাতনীর মাঝে প্রচার করছে বৈষ্ণবগণ নাকি বেদবিহিত ধর্ম পালন করেন না। এইভাবে তাঁরা সনাতনীদের বোঝাতে চাচ্ছে বৈষ্ণবগণ বেদ মানে না বা বেদের ধর্ম পালন করে না। তাই তাঁরা সনাতনী নন। অথচ বৈষ্ণবগণ বেদের প্রকৃত অনুসারী। বেদ অখিল শাস্ত্রের মূল এবং তাই বৈষ্ণবগণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর “বেদ না মানিলে হয় তো নাস্তিক “— এই বাক্যের দৃঢ় অনুসারী। উদাহরণস্বরূপ ব্রহ্ম-মাধ্ব-গৌড়ীয় বৈষ্ণব পরম্পরাগত আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন) এর ভক্তদের দেখা যাক। বৈষ্ণব হিসেবে প্রতিটি ইস্কন ভক্ত প্রতিদিন ভোর চারটায় ব্রাহ্মমুহূর্তে শয্যা ত্যাগ করার পর রাত্র ১০টায় শয়ন করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত বেদবিহিত ধর্ম আচরণ করেন। বেদ নিষেধ করে এমন কোন কর্ম বৈষ্ণবগণ বা ইস্কন ভক্তগণ পালন করেন না। ইস্কনের বৈষ্ণবগণ প্রতিদিন ভোর চারটায় শয্যা ত্যাগ করে স্নান করে— প্রথমে দ্বাদশ অঙ্গে তিলক ধারণ করেন, যা বেদবিহিত। এরপর গুরুদেব এবং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণুর উদ্দেশ্য প্রণতি নিবেদন করে বিনীত প্রার্থনা এবং স্তবস্তুতি পাঠ করেন, যা বেদে নির্দেশিত। এরপর প্রতিটি ইস্কন ভক্ত বেদোক্ত হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন এবং জপ করেন। এরপর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার শ্রীনৃসিংহদেবের উদ্দেশ্যে পূজা এবং স্তব পাঠ করা হয়, যা বেদবিহিত। এছাড়াও গায়ত্রী সংস্কারপ্রাপ্ত ভক্তগণ গায়ত্রী মন্ত্র এবং প্রণব জপ করেন, যা বেদ বিহিত। এরপর তুলসীবৃক্ষের আরাধনা করা হয়, এটিই বেদবিহিত। ভক্তগণ প্রতিদিন শ্রীমদ্ভাগবত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, ঈশোপনিষদ প্রভৃতি বৈদিক শাস্ত্র পাঠ করেন, যা বেদবিহিত। এরপর বৈষ্ণবগণ বেদের বর্ণিত পদ্ধতিতে নিরামিষ খাদ্যসামগ্রী দ্বারা যজ্ঞরূপী বিষ্ণু বা কৃষ্ণের আরাধনাপূর্বক সেই নিবেদিত আহার্য প্রসাদরূ পে গ্রহণ করেন। এছাড়াও ইস্কন বৈষ্ণবগণের দশবিধ সংস্কার অনুষ্ঠানে অগ্নিহোত্র যজ্ঞাদি অনুষ্ঠিত হয়, যা নিঃসন্দেহে বেদবিহিত কেননা সেসব যজ্ঞে বেদমন্ত্র পাঠ করা হয়। এছাড়াও প্রতিটি বৈষ্ণবগণ প্রতি মাসে দুইটি একাদশী ব্রত পালন করেন, যা বেদে নির্দেশিত হয়েছে। এখন আমরা উপর্যুক্ত আলোচ্য বিষয়ের সংক্ষিপ্ত বেদপ্রমাণ তুলে ধরবো – ১। দ্বাদশ অঙ্গে তিলক ধারণ: সামবেদীয় বাসুদেব উপনিষদে গোপীচন্দন দ্বারা উদ্ধপুণ্ড্র তিলক ধারনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে – “ওঁ নমস্কৃত্য ভগবান্নারদঃ সর্ব্বেশ্বরং বাসুদেবং পপ্রচ্ছ অধীহি ভগবন্নূপূণ্ড্র বিধিং দ্রব্যমন্ত্রস্নানাদিসহিতং মে ব্রিহীতি। তংহোবাচ ভগবান বাসুদেবো বৈকুন্ঠস্থানাদুৎপন্নং মম প্রীতিকরং মদ্ভক্তৈর্ব্রহ্মাদিভিধারিতং বিষ্ণুচন্দনং মমঙ্গে প্রতিনিমালিপ্তং গোপীভিঃ প্রক্ষালনাদে গোপীচন্দনমাখ্যাতং মদঙ্গলেপনং পুণ্যাং চক্রতীর্থান্তস্থিতং চক্রসমাযুক্তং পীতবর্ণং মুক্তিসাধনং ভবতি॥ অথ গোপীচন্দনং নমস্কৃত্বোদ্ধৃত্য। গোপীচন্দন পাপঘ্ন বিষ্ণুদেহসমুদ্ভব॥” অনুবাদ: “শ্রীনারদ সর্বেশ্বর ভগবান বাসুদেবকে প্রণাম নিবেদন করে জিজ্ঞাসা করলেন, হে ভগবান, আপনি আমাকে দ্রব্য, মন্ত্র ও স্নানাদির সহিত উর্দ্ধপুণ্ড্রর তিলক ধারণ বিধি সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করুন। ভগবান বাসুদেব তখন বললেন, বিষ্ণুচন্দন নামক দ্রব্য বৈকুণ্ঠস্থান হতে উৎপন্ন হয়েছে, তাই তা আমার অতিশয় প্রিয়। ব্রহ্মা প্রভৃতি আমার ভক্তগণ তা ধারণ করেন। গোপরমণীগণ তা আমার শরীরে লেপন করতেন, এইজন্য তা গোপীচন্দন নামে বিখ্যাত। এ গোপীচন্দন আমার পবিত্র অঙ্গলেপন, তা চক্রতীর্থে অবস্থিত, চক্রচিহ্নযুক্ত এবং পীতবর্ণ, তাই তা মুক্তির সাধন। অতএব গোপীচন্দনকে নমস্কার করে উত্তোলন করবে, কেননা গোপীচন্দন পাপবিনাশকারী এবং বিষ্ণুর দেহ থেকে উদ্ভুত।” উল্লেখ্য, মুক্তিকোপনিষদের ১।২৭-৩৬ মন্ত্রসমূহে ১০৮টি উপনিষদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে ১।৩২ মন্ত্র অনুসারে বাসুদেব উপনিষদ হচ্ছে ৫৬ তম উপনিষদ এবং ১।৫৪ মন্ত্র অনুসারে বাসুদেব উপনিষদ সামবেদের অন্তর্গত। ২। পরমেশ্বর ভগবানরূপে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণু আরাধনা: শ্রীকৃষ্ণের প্রকাশ শ্রীবিষ্ণু। শ্রীবিষ্ণু এবং শ্রীকৃষ্ণ একই পরমেশ্বর ভগবান। সমগ্র বেদে শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণু, কৃষ্ণ,গোপাল, দেবকীপুত্র ইত্যাদি নামে সম্বোধন করা হয়েছে। ঋগ্বেদীয় পুরুষসুক্তের বর্ণনা অনুসারে বিষ্ণু সমগ্র জগতে ব্যাপৃত। পুরুষসূক্তে বিষ্ণুর বিরাটরূপ বা বিশ্বরূপের বর্ণনা করা হয়েছে যা শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দর্শন প্রদান করেছিলেন (গীতা ১১।৫-৪৪)। পরে অর্জুনের প্রার্থনায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে চতুর্ভূজ বিষ্ণুরূপ প্রদর্শন করেছিলেন (গীতা ১১।৪৬-৫০)। বৈষ্ণবগণ বেদোক্ত পরমাত্মা পরমেশ্বর ভগবানরুপে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণুর আরাধনা করেন। ঋগ্বেদপ্রমাণে শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণু হলেন পরমেশ্বর ভগবান – “কালিকো নাম সৰ্পো নবনাগসহস্রবলঃ। যমুনহ্রদে হ সো জাতো অসৌ নারায়ণবাহনঃ॥ যদি কালিকদূতস্য যদি কাঃকালিকাদ্ ভয়ম্। জন্মভূমিং পরিক্রান্তো নির্বিষো যাতি কালিকঃ॥” ~ (ঋগ্বেদ, আশ্বলায়ন শাখা, ০৭।৫৬।৪-৫) অনুবাদ: “যমুনার হ্রদে আগত সহস্র হস্তির ন্যায় বলশালী সেই কালিক নামক সর্প নারায়ণের বাহন (নারায়ণ বা কৃষ্ণ, তিনি তাঁর চরণযুগল স্থাপন করে কালিয় সর্পের উপর নৃত্য করেছিল, তাই কালিয় সর্পকে এখানে নারায়ণের বাহন বলা হয়েছে)। কালিক সর্প কাঃকালিক যার দূত, তাঁর দ্বারা ভীত হয়েছিল। জন্মভূমি ত্যাগ করে সে নির্বিষ হয়েছিল। (গরুড়কে এখানে কাঃকালিক বলা হয়েছে, গরুড়ের ভয়ে কালিয় যমুনা নদী সংলগ্ন একটি হ্রদে আশ্রয় নিয়েছিল। পরবর্তীতে যমুনার হ্রদে বসবাসকারী কালিয় কৃষ্ণের পাদস্পর্শে বিষহীন হয়েছিল) এছাড়াও বিভিন্ন উপনিষদে বর্ণিত হয়েছে, “ব্রহ্মন্যো দেবকীপুত্রঃ” (কৃষ্ণযজুর্বেদোক্ত নারায়ণ উপনিষদ, মন্ত্র ৪) অনুবাদঃ দেবকীপুত্র শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর ভগবান। “নারায়ণায় বিদ্মহে বাসুদেবায় ধীমহি। তন্নো বিষ্ণুঃ প্রচোদয়াৎ॥ (তৈত্তিরীয় আরণ্যক, ১০।১; নারায়ণ উপনিষদ: ১০।১।২৯) অনুবাদ: “আমরা নারায়ণকে জানব। তাই বসুদেবতনয় বাসুদেবের ধ্যান করি। সেই ধ্যানে তিনি আমাদের প্রেরণ করুন।” “যো ব্রহ্মানং বিদধাতি পূর্বং যো বৈ বেদাংশ্চ স্ম কৃষ্ণঃ” (অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদ ১।২৪) অনুবাদ: ব্রহ্মা যিনি পূর্বকালে বৈদিক জ্ঞান প্রদান করেন, তিনি সেই জ্ঞান সৃষ্টির আদিতে শ্রীকৃষ্ণের থেকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। “একো বশী সর্বগঃ কৃষ্ণ ঈড্যঃ” (গোপালতাপনী উপনিষদ ১।২১) অনুবাদ: সেই একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই পরম পুরুষোত্তম ভগবান,তিনিই আরাধ্য। সচ্চিদানন্দরূপায় কৃষ্ণায়াক্লিষ্টকারিনে। নমো বেদান্তবেদ্যায় গুরুবে বুদ্ধিসাক্ষিনে॥ (গোপালতাপনী উপনিষদ ১।১) অনুবাদ: আমি শ্রী কৃষ্ণের প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম জ্ঞাপন করছি যার আপ্রাকৃত রূপ সৎ,চিৎ ও আনন্দময়। তাকে জানার অর্থ সমগ্র বেদকে জানা। “তদ্ধৈতদ্ ঘোর আঙ্গিরসঃ কৃষ্ণায় দেবকীপুত্ৰায়োক্ত্বোবাচাপিপাস এব স বভূব সোঽস্তবেলায়ামেতত্রয়ং প্রতিপদ্যেতাক্ষিতমস্যচ্যুতমসি প্রাণসংশিতমসীতি তত্রৈতে দ্বে ঋচৌ ভবতঃ॥ আদিৎ প্রত্নস্য রেতসঃ উদ্বয়ং তমসম্পরি জ্যোতিঃ পশ্যন্ত উত্তরং স্বঃ পশ্যন্ত উত্তরং দেবং দেবত্রা সূর্যমগন্ম জ্যোতিরুত্তমমিতি জ্যোতিরুত্তমমিতি॥” ~ (ছান্দোগ্য উপনিষদ ৩।১৭।৬-৭) অনুবাদ: “আঙ্গিরস ঘোর পূর্বোক্ত এই যজ্ঞবিজ্ঞান দেবকীপুত্র কৃষ্ণকে উপদেশ
রাসলীলা’র অন্তর্নিহিত তাৎপর্য কি? – ১ম পর্ব

আত্মারাম পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের রাসলীলা নিয়ে বদ্ধজীবের মনে সংশয়ের অন্ত নেই। তার মধ্যে একটি সংশয় বড়ই আশ্চর্যের যে, ব্রজগোপিকাদের নিয়ে শারদ রাতে নৃত্যরত রসিকেন্দ্রচূড়ামণি, রাসেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ যাদের আরাধ্য ভগবান, রাসলীলা যাদের পাঠ্যবিষয়, তারা কীভাবে বৈরাগ্য শিক্ষা লাভ করে? বস্তুত দেখা যায় যে, এই রাসলীলা যাদের পরম আদরণীয় বিষয়, তারা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে বৈরাগ্যবিদ্যা চর্চা করেন এবং ব্রহ্মচর্যব্রত, সন্ন্যাস আশ্রম অবলম্বন করেন। তাই, রাসলীলা শ্রবণ-কীর্তন করে কিভাবে বৈষ্ণবগণ তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে ‘অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ বর্জন’ আদি কঠোর ব্রত গ্রহণ করেন, সেই রহস্য উন্মোচন করা হবে এই ১ম পর্বে। এই পর্বে উওর প্রদান করেছেন শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের শিষ্যবৃন্দ শ্রীমদ্ভাগবত ১০/৩০/৩৪ এর ভাষ্যে: রেমে তয়া স্বাত্মরত আত্মারামোহপ্যখণ্ডিতঃ । কামিনাং দর্শয়ন্ দৈন্যং স্ত্রীণাঞ্চৈব দুরাত্মতাম্ ॥ অন্বয়ঃ রেমে – তিনি বিহার করেছিলেন; তয়া – তাঁর সঙ্গে; চ – এবং; আত্ম-রতঃ – স্ব-ক্রীড়; আত্ম-আরামঃ – আত্মসন্তুষ্ট; অপি – যদিও; অখণ্ডিতঃ – স্বয়ংসম্পূর্ণ; কামিনাম্ – সাধারণ কামুক মানুষের; দর্শয়ন্ – প্রদর্শনের জন্য; দৈন্যম্ – দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা; স্ত্রীণাম্ – সাধারণ নারীদের; চ এব – ও; দুরাত্মতাম্ – দুরাত্মতা। অনুবাদ: [শুকদেব গোস্বামী বলতে থাকেন] ভগবান কৃষ্ণ স্ব-ক্রীড়, আত্মারাম ও স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ কামুক মানুষের দুর্দশা ও নারীদের দুরাত্মতা প্রদর্শনের জন্য সেই গোপীর সঙ্গে বিহার করেছিলেন। তাৎপর্য: জড়জাগতিক মানুষেরা কখনও শ্রীকৃষ্ণের লীলার যে বিরুদ্ধ সমালোচনা করে থাকে, এই শ্লোকে সরাসরি তা খণ্ডন করা হয়েছে। দার্শনিক অ্যারিস্টটল সাধারণ কার্যকলাপ সবই ভগবানের অযোগ্য বলে দাবী করেছিলেন এবং কিছু মানুষ এই ধারণা পোষণ করার ফলে ঘোষণা করে যে, ভগবান কৃষ্ণের কার্যকলাপ যেহেতু সাধারণ মানুষের মতো, তাই তিনি স্বয়ং কখনও পরমব্রহ্ম হতে পারেন না। কিন্তু এই শ্লোকে শুকদেব গোস্বামী দৃঢ়ভাবে বলছেন যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পারমার্থিক আত্ম-সন্তুষ্টির মুক্ত স্তরে ক্রিয়া করেন। এই সত্যটি আত্ম-রত, আত্মারাম, এবং অখণ্ডিত শব্দ গুলির মাধ্যমে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বন-জ্যোৎস্নায় আবেগপ্রবণ প্রণয় উপভোগকারী এক সুন্দর বালক এবং এক সুন্দরী বালিকা স্বার্থপর কামনা-বাসনারহিত শুদ্ধ কর্মে যুক্ত হতে পারে, সাধারণ মানুষের কাছে তা অচিন্তনীয়। যদিও ভগবান কৃষ্ণ সাধারণ মানুষদের কাছে অচিন্তনীয়, কিন্তু যারা তাঁকে ভালোবাসে, তারা সহজেই তাঁর লীলার পরম শুদ্ধতা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। কেউ হয়ত বলতে পারে যে, “সৌন্দর্য তো দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার!”, আর তাই কৃষ্ণভক্তগণ ভগবানের কার্যকলাপকে শুদ্ধ বলে কল্পনা করছেন। এই যুক্তি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ সত্যকে অবজ্ঞা করছে। যেমন প্রথম হল, কৃষ্ণপ্রেমে উন্নত হবার জন্য কৃষ্ণভাবনামৃতের পথে একজন ভক্তকে কঠোরভাবে চারটি বিধি নিষেধ পালন করতে হয় – অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ করা চলবে না, কোন রকম জুয়াখেলা চলবে না, কোন নেশা করা চলবে না এবং মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি আমিষাহার করা চলবে না। কেউ যখন জাগতিক কামনা থেকে মুক্ত হয়ে জাগতিক আকাঙ্ক্ষার অতীত এক মুক্ত স্তরে উন্নীত হন, তখন তিনি শ্রীকৃষ্ণের পরম সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম করেন। এটি কোন তাত্ত্বিক পন্থা নয়, কৃষ্ণভাবনামৃতের পথ সম্বন্ধে উজ্জ্বল দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা রেখে গেছেন যে শত-সহস্র মহান ঋষিগণ, তাঁরা এটি সম্পূর্ণ অভ্যাসের মাধ্যমে আয়ত্ত করেছিলেন। একথা ঠিকই যে, দ্রষ্টার দৃষ্টিভঙ্গির উপর সৌন্দর্য নির্ভর করে। কিন্তু প্রকৃত সৌন্দর্য জাগতিক দেহের কামুক চোখে নয়, আত্মার চোখে অনুভূত হয়। তাই, বৈদিক শাস্ত্রে বারে বারে দৃঢ়ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, জাগতিক আকাঙ্ক্ষা হতে মুক্তজনেরাই কেবল তাঁদের ভগবৎ-প্রেমের অঞ্জনে চর্চিত শুদ্ধ-আত্মার চোখ দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের সৌন্দর্য দর্শন করতে পারেন। অবশেষে লক্ষ্য করা যেতে পারে যে, শ্রীকৃষ্ণের লীলাসমূহ হৃদয়ঙ্গম করার মাধ্যমেই মানুষ জাগতিক ইন্দ্রিয়ের বিষয়গত সকল ইন্দ্রিয় বাসনার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেন। পরিশেষে, চূড়ান্তভাবে বলা যায়, শ্রীকৃষ্ণের প্রণয়লীলা তাঁর পরমতত্ত্বের যোগ্যতা অনুযায়ী যথাযথ। বেদান্তে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পরম ব্রহ্ম সমস্ত কিছুর মূল উৎস। তাই, জড় জগতের কোন সুন্দর বস্তু পরমতত্ত্বে নেই, তা হতে পারে না। যেহেতু জড় জগৎ চিৎজগতের বিকৃত প্রতিফলন, তাই পরমতত্ত্বে শুদ্ধ, অপ্রাকৃতরূপে অধিষ্ঠিত প্রণয় বিষয়ও এই জগতে তার বিকৃত, জাগতিক রূপে প্রকাশিত হতে পারে। তাই, এই জগতের প্রতিভাত সৌন্দর্যকে চরমে পরিত্যাগ না করে, বরং তাকে তার শুদ্ধ অপ্রাকৃত রূপে গ্রহণ করা উচিত। অনাদি কাল হতে স্ত্রী ও পুরুষেরা প্রণয়কলা দ্বারা কাব্যিক আনন্দে উৎসাহিত হয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত, এই জগতে প্রণয় আমাদের হতাশা-ধ্বস্ত করে আমাদের হৃদয়ের পরিবর্তন কিম্বা মৃত্যু ঘটায়। এইভাবে প্রণয় বিষয়টিকে প্রথমত সুন্দর ও উপভোগ্যরূপে দেখা গেলেও, পরিশেষে তা জাগতিক প্রকৃতির প্রচণ্ড আক্রমণের ফলস্বরূপ নষ্ট হয়। তবুও প্রণয়ের ধারণাকে সামগ্রিকভাবে পরিত্যাগ করা অযৌক্তিক। বরং, স্বার্থপরতা বা জাগতিক কামে রঞ্জিত না করে প্রণয় আকর্ষণ যে ভাবে ঈশ্বরের মাঝে বিদ্যমান, সেই পরম, পূর্ণ, শুদ্ধ স্বরূপে আমাদের তা গ্রহণ করা উচিত। সেই পরম প্রণয় আকর্ষণ, পরম সত্যের পরম সৌন্দর্য ও আনন্দকে আমরা শ্রীমদ্ভাগবতের পাতায় পাতায় পাঠ করছি। ।। হরে কৃষ্ণ ।। [ বি:দ্র: স্বধর্মম্ – এর অনুমোদন ব্যতীত এই গবেষণামূলক লেখার কোনো অংশ পুনরুৎপাদন, ব্যবহার, কপি পেস্ট নিষিদ্ধ। স্বধর্মম্ – এর সৌজন্যে শেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত ]
গুরুদেব কে? সদ্গুরুদেব চেনার উপায় কি? গুরুদেব কি পরিত্যাগ করা যায়?

গুরুদেব কে? যিনি অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলো প্রদান করে আমাদের চক্ষু উন্মোচিত করেন তিনিই গুরুদেব। গুরুদেব পরমতত্ত্ব পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধি। গুরুদেব ভগবানের মতোই পূজনীয় কিন্তু তিনি ভগবান নন। গুরুদেব নির্বাচন প্রত্যেক মনুষ্য জীবের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মনুষ্য জীবন অত্যান্ত দূর্লভ। জীবাত্মা অনেক ভাগ্যের ফলে মানুষ্য শরীর প্রাপ্ত হয়। এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে – নৃদেহমাদ্যং সুলভং সুদুর্লভং প্লবং সুকল্পং গুরুকর্ণধারম্। ময়ানুকূলেন নভস্বতেরিতং পুমান্ ভবান্ধিং ন তরেৎ স আত্মহা।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ১১।২০।১৭ ] বঙ্গানুবাদ: জীবনের সর্ব কল্যাণপ্রদ অত্যন্ত দুর্লভ মনুষ্য দেহ, প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে আপনা থেকেই লাভ হয়ে থাকে। এই মনুষ্যদেহকে অত্যন্ত সুষ্ঠুরূপে নির্মিত একখানি নৌকার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে শ্রীগুরুদেব রয়েছেন কাণ্ডারীরূপে এবং পরমেশ্বর ভগবানের উপদেশাবলীরূপ বায়ু তাকে চলতে সহায়তা করছে, এই সমস্ত সুবিধা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি তার মনুষ্য জীবনকে ভবসমুদ্র থেকে উত্তীর্ণ হতে উপযোগ না করে, তাকে অবশ্যই আত্মঘাতী বলে মনে করতে হবে। অর্থাৎ এই দূর্লভ মনুষ্য দেহ নৌকা স্বরুপ আর গুরুদেব সেই নৌকার কাণ্ডারী। জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যে সফল হতে হলে, প্রত্যেক মনুষ্য জীবের অবশ্যই সদ্গুরুদেবের শরণাপন্ন হতে হবে। তাই সদ্গুরুদেব নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। . সদ্গুরুদেবের লক্ষণ কি? সদ্গুরুদেবের লক্ষণ সমন্ধে অথর্ববেদীয় মুণ্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে- তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুম্ এবাভিগচ্ছেৎ। সমিত পাণিঃ শ্রোত্রিয়ম্ ব্রহ্মনিষ্ঠম্।। [ মুণ্ডক উপনিষদ ১।২।১২ ] বঙ্গানুবাদ: গুরুদেব হবেন বৈদিক জ্ঞান সম্পন্ন এবং ব্রহ্মনিষ্ঠম্ অর্থাৎ পরম-পুরুষোত্তম ভগবানের সেবায় নিষ্ঠাবান, পরম সত্যের প্রতি সুদৃঢ় ভক্তিযুক্ত। বিশ্লেষণ: শ্রীকৃষ্ণই পরমব্রহ্ম যে কথা অর্জুন গীতায় (১০/১২) তে বলেছেন,“পরং ব্রহ্ম অর্থাৎ তুমিই পরমব্রহ্ম” এবং শ্রীমদ্ভাগবতে (১/২/১১) তে বলা হয়েছে, “ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবানিতি শব্দতে, অর্থাৎ সেই পরমতত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণকেই মানুষ ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবান বলে থাকে”। তাই এই মন্ত্রে ব্রহ্মনিষ্ঠম্ বলতে যিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় অনুরক্ত তাকেই বুঝতে হবে। . এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে আরো বলা হয়েছে- তস্মাদ্ গুরুং প্রপদ্যেত জিজ্ঞাসুঃ শ্রেয় উত্তমম্ । শাব্দে পরে চ নিষ্ণাতং ব্রহ্মণ্যুপশমাশ্রয়ম্ ।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ১১।৩।২১ ] বঙ্গানুবাদ: যথার্থ সুখশান্তি এবং কল্যাণ আহরণে পরম আগ্রহী যেকোনো ব্যক্তিকে সদগুরুর আশ্রয় গ্রহণ এবং দীক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর কাছে আত্মনিবেদন করতেই হবে। সদগুরুর যোগ্যতা হলো এই যে, গভীরভাবে অনুধ্যানের মাধ্যমে তিনি শাস্ত্রাদির সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করেছেন এবং অন্য সকলকেও সেসব সিদ্ধান্ত সম্পর্কে দৃঢ়বিশ্বাসী করে তুলতে সক্ষম। এ ধরনের মহাপুরুষ, যিনি পরমেশ্বর ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন এবং সকল জাগতিক বিচার-বিবেচনা বর্জন করেছেন, তাকেই যথার্থ পারমার্থিক সদগুরুরূপে বিবেচনা করা উচিত। . এ সম্পর্কে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে – ষটকর্ম নিপুণ বিপ্র মন্ত্র তন্ত্র বিশারদঃ। অবৈষ্ণবঃ গুরু ন স্যাৎ বৈষ্ণবঃ শ্বপচঃ গুরু।। বঙ্গানুবাদ: কোন ব্রাহ্মণ যদি ব্রাহ্মণের ছয়টি কর্মে নিপুন হয় এবং মন্ত্রতন্ত্রে বিশারদও হয়, কিন্তু সে যদি কৃষ্ণভক্ত না হয়, তাহলে সে গুরু হতে পারে না। পক্ষান্তরে চন্ডাল কুলে উদ্ভুত ব্যক্তিও যদি শুদ্ধ কৃষ্ণ ভক্ত হয় তাহলে সেই গুরু হতে পারে। . সদ্গুরু-কে এ সম্পর্কে পদ্মপুরাণে প্রভু সদাশিব বলেছেন- বিমৎসরঃ কৃষ্ণে ভক্তোহনন্য প্রয়োজনঃ। অনন্যসাধনঃ শ্রীমান্ ক্রোধলোভবিবর্জিতঃ।। শ্রীকৃষ্ণরসতত্ত্বজ্ঞঃ কৃষ্ণমন্ত্রবিদাংবরঃ। কৃষ্ণমন্তাশ্রয়ো নিত্যং মন্ত্রতক্তঃ সদা শুচিঃ॥ সদ্ধৰ্ম্মশাসকো নিত্যং সদাচারনিয়োজকঃ। সম্প্রদায়ী কৃপাপূর্ণো বিরাগী গুরুরুচ্যতে ॥ [ পদ্মপুরাণ, পাতালখণ্ড, ৫১।৬-৮ ] বঙ্গানুবাদ: যিনি শান্ত, মাৎসর্য্য-বিহীন, ও কৃষ্ণভক্ত, কৃষ্ণোপাসনা ভিন্ন যাঁহার অন্য প্রয়োজন নাই, কৃষ্ণের অনুগ্রহ ভিন্ন যাঁহার দিন অন্য প্রয়োজন নাই অর্থাৎ কৃষ্ণের অনুগ্রহকেই যিনি সংসার-মুক্তির একমাত্র উপায় স্থির করিয়াছেন, যাঁহাতে ক্রোধ বা লোভের লেশমাত্র নাই, যিনি শ্রীকৃষ্ণরসতত্ত্বজ্ঞ এবং কৃষ্ণমন্ত্রজ্ঞদিগের অগ্রগণ্য, যিনি কৃষ্ণমন্ত্র আশ্রয় করিয়া সর্বদা সেই মন্ত্রে ভক্তিমান্ হইয়া পবিত্রভাবে কালযাপন করেন, সদ্ধর্ম্মের উপদেশ প্রদান করেন, সর্বদা সদাচারে নিযুক্ত থাকেন, যিনি তা এইরূপে বৈষ্ণবসম্প্রদায়ভুক্ত দয়ালু ও সংসার-বিরাগী, তিনিই গুরুপদবাচ্য। . সেই একই সিদ্ধান্ত শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে উল্লেখ রয়েছে- কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শূদ্র কেনে নয় । যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা, সেই ‘গুরু’ হয় ।। [ চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ৮।১২৮ ] বঙ্গানুবাদ: যিনি কৃষ্ণ-তত্ত্ববেত্তা তিনিই গুরু, তা তিনি ব্রাহ্মণ হোন, কিংবা সন্ন্যাসীই হোন অথবা শূদ্রই হোন, তাতে কিছুই যায় আসে না। . শ্রীল রূপগোস্বামী উপদেশামৃতে এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন – বাচোবেগং মনসঃ ক্রোধবেগং জিহ্বাবেগমুদরোপস্থবেগম্। এতান বেগান যো বিষহেত ধীর সর্বামপীমাং পৃথিবীং সশিষ্যাৎ।। বঙ্গানুবাদ: যে ব্যক্তি বাক্যের বেগ, ক্রোধের বেগ, জিহ্বার বেগ, মনের বেগ, উদর এবং উপস্থের বেগ, এই ছয়টি বেগ দমন করতে সমর্থ হন তিনি পৃথিবী শাসন করতে পারেন। অর্থাৎ তিনিই গোস্বামী বা গুরুপদবাচ্য। অর্থাৎ সদ্গুরুদের অবশ্যই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা হবেন এবং সদগুরুদেবের প্রধান লক্ষণ তিনি অবশ্যই কৃষ্ণ ভক্ত হবেন। . সদ্গুরুদেব কি আমিষ-আহারীদের দীক্ষা দেন? এ সম্পর্কে স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে- এবমাদিগুণৈর্ধূক্তং শিষ্যং নৈব পরিগ্রহেৎ। গৃহ্ণীয়াদ্যদি তদ্দোষঃ প্রায়ো গুরুম্ পস্পৃশেৎ।। অমাত্যদেষো রাজানং জায়াদোষঃ পতিং যথা। তথা শিষ্যকৃতো দোষো গুরুং প্রাপ্নোত্যসংশয়ম্।। তন্মাচ্ছিষ্যৎ গুরু-নিত্যং পরীক্ষ্যৈব পরিগ্রহেৎ। [ স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখণ্ড, মার্গশীর্ষ্যমাস মাহাত্ম্য ১৬। ১৬-১৮ ] বঙ্গানুবাদ: এই সকল গুণ (দোষ) যুক্ত মানবকে শিষ্য বলিয়া গ্রহণ করিবে না; আর এই সকল দোষের অনেকগুলি যদি গুরুকে স্পর্শ করে, তবে তাদৃশ গুরুকেও গুরু বলিয়া গ্রহণ করা কর্তব্য নহে। দেখ, যেমন অমাত্যদোষ নৃপকে এবং পত্নীদোষ পতিকে আশ্রয় করে, তদ্রূপ শিষ্যকৃত দোষও গুরুকে আশ্রয় করিয়া থাকে, সন্দেহ নাই; অতএব গুরু শিষ্যকে নিত্য পরীক্ষা করিয়া গ্রহণ করিবেন। বিশ্লেষণ: শ্রীমদ্ভাগবতে (৫/২৬/১৩)-তে উল্লেখ রয়েছে-, “যে সমস্ত নিষ্ঠুর মানুষ তাদের দেহ ধারণের জন্য এবং জিহ্বার তৃপ্তি সাধনের জন্য নিরীহ পশু-পক্ষীকে হত্যা করে রন্ধন করে, মৃত্যুর পর যমদূতেরা কুন্তীপাক নরকে ফুটন্ত তেলে তাদের পাক করে।” এই রকম পশু-পক্ষী হত্যাকারীকে গুরুদেব কখনো দীক্ষা দিবেন না। যদি গুরুদেব এমন শিষ্যকে দীক্ষা দেন তাহলে রাজার প্রজারা যদি অধার্মিক হয়, যেভাবে রাজাকে নরকে যেতে হয়। স্ত্রী যদি অধার্মিক হয়, চরিত্রহীন হয় সেই দোষে যেভাবে স্বামী কে নরকে যেতে হয়। ঠিক সেই রকম যথার্থ গুরু এবং যথার্থ শিষ্য না হয়, গুরুর কারণে শিষ্য নরকে যাবে এবং শিষ্যের কারণে গুরুকে নরকগামী হতে হবে। তাই যিনি সদ্গুরুদেব তিনি কখনোই আমিষ আহারী ব্যক্তিকে দীক্ষা দিবেন না, দীক্ষার আগে তিনি শিষ্যকে পরিক্ষা করে দেখবেন তিনি আমিষাশী, নেশা এবং অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত কিনা। যদি কোনো গুরুদেব এমন পাপীকে দীক্ষা দেন, বুঝতে হবে তিনি সদ্গুরুদেব নন। এমন গুরুর থেকে দীক্ষা নিলে অবশ্যই সেই গুরু সহ শিষ্য নরকে নিমজ্জিত হতে হবে। . অসদ্গুরু কি ত্যাগ করা যায়? এ সম্পর্কে মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে- গুরোরপ্যবলিপ্তস্য কার্যাকার্যমজানতঃ। উৎপথপ্রতিপন্নস্য পরিত্যাগো বিধীয়তে ॥ [ মহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ১৬৭।২৫ ] বঙ্গানুবাদ: কার্য ও অকার্যে অনভিজ্ঞ কৃষ্ণভক্তিবিরুদ্ধগামী গর্বিত আত্মশ্লাঘী গুরুকে পরিত্যাগ করাই বিধি। যদি গুরুদেব ইন্দ্রিয় তর্পণের প্রতি আসক্ত হয় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে ভক্তিযুক্ত ভগবৎসেবার পথ পরিত্যাগ করে পতনমুখী পথের দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তাকে ত্যাগ করা উচিত। [ অর্থাৎ অসদ্গুরুকে অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। এই একই সিদ্ধান্ত স্কন্দপুরাণ, কূর্মপুরাণ, নারদ পঞ্চরাত্র শাস্ত্রেও উল্লেখ রয়েছে ] . এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা রয়েছে – গুরুর্ন স স্যাৎ স্বজনো ন স স্যাৎ পিতা ন স স্যাজ্জননী ন সা স্যাৎ। দৈবং ন তৎস্যান্ন পতিশ্চ স স্যা-ন্ন মোচয়েদ্ যঃস মুপেতমৃত্যুম্।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ৫।৫।১৮ ] বঙ্গানুবাদ: যিনি তাঁর আশ্রিত জনকে সমুপস্থিত মৃত্যুরূপ সংসার মার্গ থেকে উদ্ধার করতে না পারেন, তাঁর
ইসকনে নারী পুরুষের মধ্যে কেমন সম্পর্কের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে?

এই জগতের কল্যাণের স্বার্থে কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই স্বর্ন সংস্থা স্থাপন করছেন। প্রভুপাদের শিক্ষার একমাত্র আঁধার ছিল জীবনের সকল কার্যে জড় বিষয় পরিত্যাগ করে পারমার্থিক পথনির্দেশ অনুসরণ করা হবে। দেহের কোনো পার্থক্য থাকছে না, “হোক এই দেহটি কোনো নারী অথবা পুরুষের” আমরা সকলেই আত্মা যদি আমরা পারমার্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি। কিন্তু প্রকৃতির নির্দেশ অনুসারে শারীরিক ও মানসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষ এবং নারীকে ভিন্ন ভিন্নভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতির বিধি অনুসারে নারীরা সাধারণত বেশিরভাগ আবেগপ্রবণ হয়ে থাকেন, ভগবান তাদের এই বিশেষ গুণটি প্রদান করেছেন যে তারা নিজেদের স্বজন হোক পিতা-মাতা, স্বামী অথবা নিজের সন্তানদের অধিক ভালোবাসার সাথে স্বাচ্ছন্দে রাখতে পারেন। এবং পুরুষরা প্রাকৃতিকভাবে শারীরিক দিক থেকে অধিক শক্তিশালী, রক্ষক, উপার্জনকারী, তার শরণাগত থাকা সকলকে রক্ষা করা। প্রভুপাদ যখন আমেরিকায় গিয়েছেন তখন তিনি দেখছিলেন যে নারীরা পুরুষদের সাথে সমান অধিকার নিয়ে বেশি সচেতন, তারাও চাকরি করছে। তখন প্রভুপাদ সেইভাবেই প্রচার করেছেন তিনি কখনই তাদের বাধা দেননি চাকরি বা অন্যান্য বিষয়ে। তিনি তাদের চারটি বিধিনিষেধ দিয়েছিলেন। যা আমরা সকলেই জানি। এরমধ্যে একটি প্রধান হচ্ছে অবৈধ সঙ্গ বর্জন করা। এবার মূল বিষয়ে আসছি, শ্রীল প্রভুপাদ চেয়েছিলেন এমন একটি সংস্থা হবে যেখানে নারী পুরুষ উভয়ই সমানভাবে কৃষ্ণভাবনামৃতের আশ্রয় গ্রহণ করবে এবং জগতের কল্যাণের স্বার্থে সেই বৈদিক সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার করবে। কিন্তু এখনকার বর্তমান সমাজে কিছু ছেলেমেয়েরা এই প্রচার ও প্রসারের নাম দিয়ে অবাধে মেলামেশা করছে। অনেকে এটাকে কৃষ্ণভাবনাময় সম্পর্ক নামক আখ্যা দিয়ে থাকেন যা তথাকথিত বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড অথবা বেস্টফ্রেন্ড হিসেবেও পরিচিত। যা কখনোই প্রভুপাদের দৃষ্টিকোণ ছিল না। শ্রীল প্রভুপাদ তার ১৭ নভেম্বর, ১৯৭১, দিল্লিতে একটি প্রবচনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন: – বিবাহ করা অপরিহার্য। আমাদের সংস্থার বিষয়ে বিবেচনা করা হলে, আমরা আমাদের সংস্থায় কাউকে বন্ধু, গার্লফ্রেন্ড বা বয়ফ্রেন্ড হিসেবে থাকার স্বীকৃতি দেই না। না। তাদের অবশ্যই বিবাহিত হতে হবে এবং এই ছেলে-মেয়েরা, বিবাহিত হওয়ার পর, তারা সুন্দরভাবে কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করছে। আমার সমস্ত শিষ্য যারা বিবাহিত, তারা সন্ন্যাসীর চেয়ে বেশি প্রচারকার্য করছে। অর্থাৎ এই কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘে দুজন সম্পর্ক বিহীন পুরুষ নারী কখনোই অবাধে মেলামেশা করতে পারবে না। তাদের অবশ্যই কোনো বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। এটাই আমাদের বৈদিক সংস্কৃতি। কিন্তু আমরা যদি পাশ্চাত্য সংস্কৃতি অনুসরণ করি এবং এই কৃষ্ণভাবনামৃতের নাম দিয়ে অবৈধ সঙ্গ করি তাহলে তা হচ্ছে প্রতারণার স্বরূপ। শ্রীল প্রভুপাদ প্রায়শই বৈদিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে পার্থক্য বর্ণনা করেছেন। প্রভুপাদ তখনকার সময় উল্লেখ করে বলছিলেন- “বৈদিক সংস্কৃতি এতই কঠোর ছিল যে তুমি তার (নারীর) দিকে তাকাতেও পারবে না, তার সাথে কথা বলার বা কিছু প্রস্তাব করার বিষয়ে প্রশ্নই আসে না।” এতেই বোঝা যায় পুরুষরা তাদের সাথে কথা বলা তো দূরের কথা তাদের দিকে তাকাতে পারতোনা। তাহলে কৃষ্ণভাবনামৃতের এই প্রচার এত সহজ করে দেওয়ার পরেও কেনো এই অবৈধ সঙ্গে লিপ্ত হচ্ছি তাও নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য। শ্রীল প্রভুপাদ আরো উল্লেখ করেছেন যে, পতিব্রতা পত্নী হচ্ছেন তিনি, যাঁর বিবাহের পূর্বে কোন পুরুষের সঙ্গে কোন সম্পর্ক ছিল না। স্ত্রীদের যদি যৌবনে পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশা করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়, তা হলে তার সতীত্ব বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়। সাধারণত তাদের সতীত্ব থাকে না। আগুনের সামনে মাখন আনলে তা গলবেই। স্ত্রী হচ্ছে আগুনের মতো এবং পুরুষ মাখনের মতো। ~শ্রীমদ্ভাগবত ৪.২৬.১৬ ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য। সাধারণত বিবাহিতা স্ত্রী ব্যতীত অন্য কারও সঙ্গে পুরুষের যৌনসঙ্গে লিপ্ত হওয়া উচিত নয় এবং শাস্ত্র বিরুদ্ধ। বৈদিক বিধান অনুসারে, অপরের স্ত্রীকে মাতৃবৎ দর্শন করা উচিত, এবং মাতা, ভগিনী ও কন্যার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। কেউ যদি পরস্ত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তা হলে তা মায়ের সঙ্গে যৌনসঙ্গে লিপ্ত হওয়ার মতো বলে বিবেচনা করা হয়। সেই আচরণ অত্যন্ত পাপময়। স্ত্রীলোকের ক্ষেত্রেও সেই নিয়ম বলবৎ রয়েছে, কোন স্ত্রী যদি তার পতি ব্যতীত অন্য কোন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়, তা হলে সেই সম্পর্ক পিতা অথবা পুত্রের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার মতো। ~শ্রীমদ্ভাগবত ৫.২৬.২০ ভক্তিবেদান্ত তাৎপর্য। শ্রীল প্রভুপাদ স্পষ্ট বলে দিয়েছেন ইন্দ্রিয়তর্পণ করার জন্যে এসব অবাধে মেলামেশা করা চলবে না। যদি কোনো পুরুষ বা নারী এভাবে অবাধে মেলামেশা করে তবে আগুনের ন্যায় নারীদের সম্মুখে পুরুষের ন্যায় ঘি অবশ্যই গলবে। এবং একসময় তারা অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হবে। তখন একজন নারীর সতীত্ব বজায় রাখা কঠিন হবে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কি প্রভুপাদ নারীদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন? না একদমই না। প্রথমত এসব অবাধে মেলামেশা কখনোই স্বাধীনতা হতে পরে না। কিন্তু প্রভুপাদ প্রচারে কঠোর নিয়ম অনেকটাই শিথিল করেছেন। যেমন আমি প্রথম দিকেই বলেছি প্রভুপাদ যখন তিনি আমেরিকায় প্রচারে যান তখন তিনি মাতাজীদের চাকরি করায় বাধা দেননি। তিনি বলেছেন এর মধ্যেই তোমরা কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করবে, কিছু সীমানা বজায় রেখে। তিনি অনেকটাই শিথিল করেছিলেন। তখনকার সময়ে তিনি মাতাজীদের অনেক মন্দিরের অধ্যক্ষের পদ দিয়ে গিয়েছিলেন। Some words on this topic – একটি ঘটনায় দেখা যায় প্রচারকালে প্রভুপাদ বিভিন্ন ভক্তদের মাঝে কথোপকথনে তিনি একটি ভূ-গোলক রেখে সেই নকশা থেকে তাদের মাঝে প্রচারের জন্য দেশের বিভক্তি করেছিলেন, এবং বলছিলেন তুমি এই দেশে যাবে, তুমি ওই দেশে যাবে ওখানে গিয়ে প্রচার করবে। পেছনে কিছু মাতাজী শিষ্যরাও ছিলেন। তারা প্রভুপাদ কে জিজ্ঞাসা করছিলেন, প্রভুপাদ আমরা কি কিছু পাবো না। তখন প্রভুপাদ বলছেন- না না তোমরা এই দেশটা নাও প্রচারের জন্য। যেনো তিনি দেশ স্বরূপ প্রসাদ বিতরণ করছেন। এবং আমরা দেখতে পাই যে প্রভুপাদের শিষ্যগণ ঠিক কিভাবে বিভিন্ন দেশে নগরে গ্রামে প্রচার করেছিলেন। এখন পুরো বিশ্বে সেই প্রচার প্রসিদ্ধ। এমনকি প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যাদের নিজের পূত্রীস্বরূপ দেখতেন, তাই তাদের মধ্যে কোনো বিভাজন করেননি। আমি কিছুকাল পূর্বেই প্রভুপাদের একজন শিষ্যা শ্রীমতী মালতি মাতাজীর প্রভুপাদ স্মরণামৃত তে শুনছিলাম, তিনি কিছু ঘটনা উল্লেখ করছিলেন:- তৎকালীন মায়াপুর তখন মায়াপুরে ভক্তদের থাকার জায়গা অনেকটাই সংকীর্ণ ছিল মন্দির ছিল না বললেই চলে। তখন মালতি মাতাজী ভাবছিলেন “এমন স্থানে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।” তিনি ভাবছিলেন আমি প্রভুপাদের সাথে কথা বলে এখন থেকে অন্যস্থানে চলে যাবেন প্রচারে। একদিন প্রভুপাদ ও তাঁর গুরু ভ্রাতারা প্রসাদ আস্বাদন করছিলেন। মালতি মাতাজী তাদের সকলকে পরিবেশন করছিলেন।যখন মাতাজী প্রসাদ নিয়ে যাচ্ছেন তখন হটাৎ প্রভুপাদ তার দিকে আঙুল দিয়ে তাঁর গুরুভ্রাতাদের দেখাচ্ছিলেন যে “এই দেখো ও আমার মেয়ে, তোমরা জানো সে আমাকে কতটা ভালোবাসে সে আমার জন্য নিজের জীবন দিতে পারবে এবং আমি ওর জন্য নিজের গলা কাটাতেও প্রস্তুত।” তখন মালতি মাতাজী হটাৎ আলাদা স্থানে গিয়ে কান্না শুরু করলেন- “প্রভুপাদ আমার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত আর আমি এটা কি চিন্তা করছিলাম।” তখন তিনি ঠিক করলেন যা কিছুই হোক তিনি প্রভুপাদকে ছেড়ে এই মায়াপুর কে ছেড়ে কোথাও যাবেন না। এবং প্রভুপাদ পুরুষের কথাও উল্লেখ্য করছেন যে, শ্রীমদ্ভাগবতে উল্লেখ রয়েছে যদি কোনো পুরুষ কোনো নারীর দিকে কুদৃষ্টিতে তাকায় তাহলে তা ধর্ষনের সমতুল্য। প্রভুপাদ আরো বলেছেন, যদি কোনো পুরুষ চারটি বিধিনিষেধ