ইসকনে নারীদেরকে কি পুরুষদের তুলনায় কম বুদ্ধিমান মনে করা হয়?~পর্ব-২য়

20250329 003145 Svadharmam

শ্রীল প্রভুপাদের শিক্ষায় নারী ও বুদ্ধিমত্তার ব্যাখ্যা শ্রীল প্রভুপাদ বিভিন্ন সময়ে নারী ও তাদের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য সঠিকভাবে বুঝতে হলে আমাদের বিষয়টি পর্যায়ক্রমে বিশ্লেষণ করতে হবে। এখানে আমরা তার দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নলিখিত পাঁচটি ধাপে ব্যাখ্যা করবো: আত্মিক সমতা বনাম ভৌতিক পার্থক্য “কম বুদ্ধিমান” কথাটির প্রকৃত অর্থ বৈদিক সামাজিক ভূমিকা ও দায়িত্ব ভক্তিতে বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা আধুনিক সমাজ ও ইসকনে এর প্রয়োগ শিষ্যাদের প্রতি শ্রীল প্রভুপাদের মনোভাব ———————————————————————————————————————————————— ১. আত্মিক সমতা বনাম ভৌতিক পার্থক্য ক. আত্মিক স্তরে সমতা • বৈদিক শিক্ষায় বলা হয়েছে যে আত্মা (ātmā) নির্জাতীয় – অর্থাৎ, পুরুষ বা নারী হিসাবে কেউ জন্ম নেয় না, বরং আত্মা সবার এক। • শ্রীল প্রভুপাদ সবসময় জোর দিতেন যে কৃষ্ণভাবনামৃত অর্জনে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার আছে। • ইতিহাসে অনেক মহান নারী ভক্ত ছিলেন, যেমন কুন্তী দেবী, দ্রৌপদী, ও জাহ্নবা দেবী, যারা তাদের আধ্যাত্মিক জ্ঞানের জন্য প্রসিদ্ধ। শ্রীল প্রভুপাদের উক্তি: “আত্মিকভাবে, সবাই সমান। একজন নারী নিকৃষ্ট নয়; তিনিও একজন আত্মা। কিন্তু শারীরিকভাবে, তার প্রকৃতি ভিন্ন, যেমন একটি শিশুর বুদ্ধি একজন প্রাপ্তবয়স্কের তুলনায় ভিন্ন হয়।” (প্রবচন, লস এঞ্জেলস, ১৯৭৪) খ. ভৌতিক স্তরে পার্থক্য • আত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে নারী-পুরুষ সমান হলেও, শারীরিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে নারী ও পুরুষের ভিন্ন প্রকৃতি আছে। • শ্রীল প্রভুপাদ কখনো কখনো বলতেন যে নারীরা তুলনামূলকভাবে কম বুদ্ধিমান, তবে এটি তাদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত নয়, বরং সাধারণ যুক্তিভিত্তিক চিন্তাভাবনা ও বাস্তবজীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে। ———————————————————————————————————————————————— ২. “কম বুদ্ধিমান” কথাটির প্রকৃত অর্থ ক. বৈদিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুদ্ধিমত্তা বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী বুদ্ধিমত্তাকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়: ১. ভৌতিক বুদ্ধিমত্তা (Buddhi) – যুক্তি, বিশ্লেষণ, ও বিচক্ষণতা। ২. আধ্যাত্মিক বুদ্ধিমত্তা (Bhakti Buddhi) – কৃষ্ণ ও আত্মার সম্পর্ক বোঝার ক্ষমতা। • শ্রীল প্রভুপাদ যখন বলতেন “নারীরা কম বুদ্ধিমান”, তখন তিনি ভৌতিক বুদ্ধির প্রসঙ্গেই বলতেন। • তিনি মনুসংহিতা (Manu-saṁhitā) থেকে উদ্ধৃতি দিতেন, যেখানে বলা হয়েছে যে নারীরা সাধারণত আবেগপ্রবণ হয়, ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সহজেই প্রভাবিত হতে পারে। খ. আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান অনুযায়ী • আধুনিক গবেষণাও দেখায় যে নারীরা আবেগপ্রবণ বুদ্ধিমত্তায় (emotional intelligence) বেশি পারদর্শী, আর পুরুষরা বিশ্লেষণধর্মী চিন্তাভাবনায় (logical intelligence) বেশি পারদর্শী। • বৈদিক যুগে এই পার্থক্যের কারণে নারী ও পুরুষের আলাদা সামাজিক ভূমিকা ছিল, কিন্তু এটি কোনোভাবেই নারীর হীনতা প্রকাশ করে না। উদাহরণ: • একজন মা তার সন্তানের প্রতি বিশেষ আবেগপ্রবণ হন, কিন্তু একজন বাবা সাধারণত কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কারণ তিনি তুলনামূলকভাবে বিচার-বিবেচনা বেশি করেন। ———————————————————————————————————————————————— ৩. বৈদিক সামাজিক ভূমিকা ও দায়িত্ব ক. বৈদিক সমাজে নারী ও পুরুষের ভূমিকা • প্রাচীন বৈদিক সমাজে, নারী ও পুরুষের স্পষ্ট আলাদা দায়িত্ব ছিল: • পুরুষ: দর্শন, নেতৃত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতেন। • নারী: পরিবার, সন্তান পালন ও ভক্তি কার্যকলাপে মনোনিবেশ করতেন। • “নারীদের কম বুদ্ধিমান” বলা হত এই অর্থে যে তারা বেশি আবেগপ্রবণ, তাই বৈদিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে তাদের পিতা, স্বামী বা পুত্রের আশ্রয়ে থাকা উচিত – এটি তাদের নিরাপত্তার জন্য, অপমান করার জন্য নয়। খ. ইসকনে শ্রীল প্রভুপাদের বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি • যদিও তিনি কখনো কখনো বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে কথা বলেছেন, কিন্তু ইসকনে তিনি নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছেন। • নারীরা ইসকনে: • প্রচার ও মন্দির পরিচালনা করেন • কীর্তন ও বক্তৃতা দেন • শাস্ত্র অনুবাদ ও প্রকাশনা করেন উদাহরণ: • আজ ইসকনের অনেক নারী গুরু, আচার্য ও প্রশাসক হিসেবে কাজ করছেন, যা ঐতিহ্যগত বৈদিক সমাজে দেখা যেত না। ———————————————————————————————————————————————— ৪. ভক্তিতে বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা • ভগবদ্গীতা (১০.১০) অনুসারে, কৃষ্ণ বলেন যে যারা তাঁর ভক্ত, তাদের প্রকৃত বুদ্ধি দেন। • শ্রীল প্রভুপাদ জোর দিয়েছিলেন যে সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা হলো কৃষ্ণের প্রতি আত্মসমর্পণ করা। • একজন কৃষ্ণভক্ত নারী প্রকৃতপক্ষে লক্ষ লক্ষ সাধারণ পুরুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। উক্তি: “একজন নারী যদি কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করে, তবে সে লক্ষ লক্ষ সাধারণ পুরুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান।” (প্রবচন, মায়াপুর, ১৯৭৭) ———————————————————————————————————————————————— ৫. আধুনিক সমাজ ও ইসকনে এর প্রয়োগ ক. কাল, স্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বয় • শ্রীল প্রভুপাদ সবসময় পরিস্থিতি অনুযায়ী তার শিক্ষা ব্যাখ্যা করেছেন। • তিনি স্বীকার করেছেন যে আধুনিক সমাজে নারীরা শিক্ষিত ও যোগ্য, তাই তাদের আধ্যাত্মিক বিকাশের সুযোগ থাকা উচিত। খ. লিঙ্গের চেয়ে ভক্তির গুরুত্ব • শ্রীল প্রভুপাদ লিঙ্গভিত্তিক পার্থক্যের চেয়ে একজনের ভক্তির গুরুত্ব বেশি দিয়েছেন। • ইসকনে, নারী ও পুরুষ উভয়েই ভক্তি, শিক্ষা ও প্রচারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পেয়েছেন। উদাহরণ: • ইসকনের নারী সাধ্বীরা আজ অনেক ক্ষেত্রে প্রবক্তা ও আচার্য রূপে প্রতিষ্ঠিত। ———————————————————————————————————————————————— ৬. শিষ্যাদের প্রতি শ্রীল প্রভুপাদের মনোভাব 1. পিতৃসুলভ ভালোবাসা ও যত্ন – শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর মহিলা শিষ্যাদের প্রতি গভীর স্নেহ, যত্ন ও সুরক্ষা প্রদান করতেন, যা এক পিতার ভালোবাসাকেও অতিক্রম করত। 2. সম্মান ও উৎসাহ – বৈদিক নীতিগুলি মেনে চললেও, তিনি কখনোই মহিলাদের নিম্নতর মনে করতেন না। বরং, তিনি তাঁদের ভক্তিমূলক সেবায় উৎসাহ দিতেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করতেন। 3. ব্যক্তিগত যত্ন – তিনি তাঁদের সুস্থতার খোঁজখবর রাখতেন, স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দিকনির্দেশনা ও উৎসাহ প্রদান করতেন। 4. বৈষ্ণবী হিসেবে স্বীকৃতি – তিনি বলেছিলেন যে কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করা মহিলারা সাধারণ নন; তাঁদের বৈষ্ণবী হিসেবে যথাযথ সম্মান দেওয়া উচিত। 5. আধ্যাত্মিক উন্নতি – তাঁর সকল ব্যবহারের লক্ষ্য ছিল তাঁদের কৃষ্ণের নিকটবর্তী করা, যেখানে তিনি সদয়তা, সুরক্ষা ও প্রকৃত আধ্যাত্মিক যত্ন প্রদান করতেন। ———————————————————————————————————————————————— চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত: কিভাবে প্রভুপাদের বক্তব্য বুঝতে হবে? ১. আত্মিকভাবে নারী ও পুরুষ সমান – উভয়েরই কৃষ্ণচেতনা অর্জনের সমান সুযোগ আছে। ২. ভৌতিক স্তরে কিছু পার্থক্য আছে – নারীরা আবেগপ্রবণ, পুরুষরা বিশ্লেষণধর্মী। ৩. ভক্তিই সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা – কৃষ্ণকে আত্মসমর্পণ করাই প্রকৃত জ্ঞান। ৪. ইসকনে নারী ক্ষমতায়িত হয়েছে – বৈদিক সমাজের তুলনায় ইসকনে নারীরা অনেক সুযোগ পেয়েছেন। ———————————————————————————————————————————————— শেষ কথা: নারীদের কম বুদ্ধিমান বলার পরিবর্তে, শ্রীল প্রভুপাদ জোর দিয়েছেন যে সত্যিকারের বুদ্ধিমত্তা কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করা। যে নারী বা পুরুষ কৃষ্ণের প্রতি আত্মসমর্পণ করেছেন, তিনিই প্রকৃত জ্ঞানী। ১ম পর্বঃ https://svadharmam.com/why-srimad-bhagavatam-says-that-women-and-sudras-do-not-have-the-ability-to-understand-vedas/ ©শ্রী দেবর্ষি শ্রীবাস দাস

শ্রাদ্ধে মাছ-মাংস নিবেদন নিষিদ্ধ

20250328 001517 Svadharmam

ন দদ্যাদামিষং শ্রাদ্ধে ন চাদ্যাদ ধর্মতত্ত্ববিৎ । মুন্যন্নৈঃ স্যাৎ পরা প্রীতির্যথা ন পশুহিংসয়া ॥ নৈতাদৃশঃ পরো ধর্মো নৃণাং সদ্ধর্মমিচ্ছতাম্ । ন্যাসো দণ্ডস্য ভূতেষু মনোবাক্কায়জস্য যঃ ॥ [শ্রীমদ্ভাগবতম ৭/১৫/৭-৮] ~ ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে কখনও মাছ, মাংস, ডিম ইত্যাদি আমিষ নিবেদন করবেন না, এবং তিনি যদি ক্ষত্রিয়ও হন, তা হলেও স্বয়ং আমিষ আহার করবেন না। যখন ঘি দিয়ে তৈরি উপযুক্ত খাদ্য সাধুদের নিবেদন করা হয়, তখন পিতৃপুরুষ এবং ভগবান অত্যন্ত প্রসন্ন হন। যজ্ঞের নামে পশুহিংসা করা হলে তাঁরা কখনও প্রসন্ন হন না। যাঁরা শ্রেষ্ঠ ধর্মের মাধ্যমে উন্নতি সাধন করতে চান, তাঁদের অন্য সমস্ত জীবদের প্রতি কায়, মন, এবং বাক্যের দ্বারা হিংসা না করতে উপদেশ দেওয়া হয়েছে। তার থেকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম আর নেই। অন্যতম প্রধান স্মৃতিশাস্ত্র ‘কাত্যায়ন স্মৃতিতে’ নিরামিষ দিয়ে অর্থাৎ বিনা আমিষে পিতৃ শ্রাদ্ধ করার নির্দেশ আছে! মহাভারতের অনুশাসন ও আশ্বমেধিক পর্বেও উল্লেখ আছে, পিতৃপুরুষগণ অন্ন দ্বারাই সন্তুষ্ট হন। পদ্মপুরাণের পাতালখন্ডের ৭২ নং অধ্যায়ে উল্লেখ আছে, রামচন্দ্র কর্তৃক মাতা কৌশল্যার শ্রাদ্ধে নিরামিষ দ্রব্যই নিবেদন করা হয়েছিলো, আমিষ নয়। শ্রাদ্ধে জীবহিংসা যেহেতু নরকবাসের কারণ, তাই কলিকালে পিতৃশ্রাদ্ধে মাংস নিবেদন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে শাস্ত্রসমূহ- (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-কৃষ্ণজন্ম খন্ড ১১৫/১০৯)বলা হয়েছে- “এই কলিযুগে অশ্বমেধ যজ্ঞ, গোমেধ যজ্ঞ,সন্ন্যাস আশ্রম(একদন্ডী সন্ন্যাস), শ্রাদ্ধনুষ্ঠানে মাংস নিবেদন ও দেবরের দ্বারা সন্তান প্রাপ্তি সম্পূর্ণ রূপে নিষিদ্ধ”।

বর্ণসঙ্কর ব্যক্তি কি দীক্ষাগুরু হতে পারেন?~পর্ব-৫

20250317 193852 Svadharmam

‘বৈষ্ণবগণ দ্বিজোত্তম’ শাস্ত্রবাক্য জেনেও সমাজে কিছু ধর্মব্যবসায়ী প্রায়ই দাবী তুলেন, ‘শূদ্র কিংবা শূদ্রাধম, বর্ণহীন, অন্ত্যজ, বর্ণসঙ্কর, অসৎকূলজাতগণ বৈষ্ণব হলেও দীক্ষাগুরু হতে পারে না!!’  এরূপ ভাগবতম সিদ্ধান্ত বিরুদ্ধ মত যারা প্রসন করেন, তারা নিশ্চিতরূপে নরকের কীট। আজ আমরা মহামুনি মতঙ্গ ঋষির দৃষ্টান্ত দেখবো, যিনি বর্ণসঙ্কর হয়েও বৈষ্ণব ধর্ম পালনের মাধ্যমে ব্রহ্মর্ষি হয়েছিলেন এবং অন্যতম বৈষ্ণব দীক্ষাগুরুরূপে জগতবাসীদের করুণা করেছেন। মতঙ্গ মুনি শূদ্র নাপিতের ঔরসে কামোন্মত্তা ব্রাহ্মণীর গর্ভে জন্ম, অতএব জাতিতে চণ্ডাল ছিলেন। তার জন্ম সম্পর্কে মহাভারতে বলেছে- “ব্রাহ্মণ্যাং বৃষলেন ত্বং মত্তায়াং নাপিতেন হ জাতত্ত্বমসি চাণ্ডালো ’(মহাভারত, অনুশাসন পর্ব, ২৮।১৭) মতঙ্গ মুনি প্রথম জীবনে ইন্দ্রের তপস্যা করেছিলেন, কিন্তু তাতে অভিষ্ট লাভ না করতে পেরে বিষ্ণুভক্তিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এবং মহামুনিতে পরিণত হয়েছিলেন। ‘মুনিশার্দ্দুলো মতঙ্গো বিষ্ণুতৎপরঃ’’( স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখন্ড, বেঙ্কটাচলমাহাত্ম্যম, ৩৯।২) মতঙ্গ মুনি ভক্তশ্রেষ্ঠ হনুমানেরও কূলগুরু ছিলেন। স্কন্দপুরাণে (বিষ্ণুখন্ডের বেঙ্কটাচলমাহাত্ম্যের ৩৯ অধ্যায়ে) উল্লেখ আছে, পুত্রলাভ না হওয়ায় বানররাজ কেশরী এবং মাতা অঞ্জনা খুব দুঃখিত ছিলেন। মতঙ্গ মুনি দেবী অঞ্জনাকে তখন মুখ্যপ্রাণ বায়ুর তপস্যায় প্রেরণ করেছিলেন এবং কেশরী-অঞ্জনা বায়ুদেবের তপস্যায় সিদ্ধ হয়ে তিনি মুখ্যপ্রাণকে পুত্র হনুমানরূপে লাভ করেছিলেন। রামায়ণের কিষ্কিন্ধাকাণ্ডের ৭৩-৭৪ সর্গে মতঙ্গ মুনি ও তার শিষ্যগণের উল্লেখ আছে। মতঙ্গমুনির নিষ্ঠাবান শিষ্যগণ গুরুভক্তি দ্বারা এতই তজস্বী হয়েছিলেন যে গুরুদেবের জন্য বন্য ফলমূল সংগ্রহকালে তাদের শরীর থেকে যে ঘাম মাটিতে পড়তো, সে ঘাম থেকে সুগন্ধি পুষ্পবৃক্ষের জন্ম হতো। সে সমস্ত পুষ্পবৃক্ষের পুষ্প কখনো মলিন হত না। মতঙ্গ মুনি ও তার শিষ্যগণ ভক্তিযোগ পূর্ণ করে মন্ত্রোচ্চারণপূর্বক নিজেদের মন্ত্রপূত দেহকে অগ্নিতে আহুতি দিয়ে ভগবানের নিত্যধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। নিত্যধামে গমনকালে তিনি তার শিষ্যা তপস্বীনি শবরীকে আশীর্বাদ করেছিলেন একদিন তিনি সাক্ষাৎ ভগবান রামচন্দ্রের দর্শন পাবেন। শ্রীরামচন্দ্র মাতা সীতার অন্বেষণকালে মতঙ্গবনে মতঙ্গমুনির আশ্রমে এসেছিলেন এবং  শবরীর নিকট নিত্যধামগত মতঙ্গমুনির সমাধিস্থল, পূজাবেদী, পরিধেয় বস্ত্র দর্শন করে ভগবান রামচন্দ্র আনন্দিত হয়েছিলেন। শবর কূলে জন্মালেও গুরুদেব মতঙ্গ মুনির সেবার প্রভাবে তপস্বিনী শবরী  সাক্ষাৎ ভগবান শ্রীরামচন্দ্রকে লাভ করেন। ভগবান রাম ভক্ত শবরীর উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করে ভক্তের মানবৃদ্ধি করেন। সাক্ষাৎ ভগবান রামকে সম্মুখে রেখে দর্শন করতে করতে যোগাগ্নিতে জড়দেহকে আহুতি দিয়ে শবরী মাতা দিব্যদেহ ধারণ করে অক্ষয়ধামে গমন করেন। ধন্য গুরু মতঙ্গ!  ধন্য শিষ্যা শবরী! মতঙ্গ মুনি বর্ণসঙ্কর হয়েও পতিতপাবন দীক্ষাগুরুর এক আদর্শ দৃষ্টান্ত। অতএব যারা বৈষ্ণবকে জাতভেদ দৃষ্টিতে দর্শন করেন তাদের সুমতি হোক, শূদ্রপুত্র মতঙ্গ মুনির কৃপা তাদের উপর বর্ষিত হোক।   ©ব্রজসখা দাস

শূদ্রকুলে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি কি দীক্ষাগুরু হতে পারেন?~পর্ব-৪

4 Svadharmam

জগতে আজকাল বহু দেহাত্মবুদ্ধি মূঢ় লোক নিজেকে বৈষ্ণব ঘোষণা করে বৈষ্ণবদের বৈষ্ণবত্ব, তাঁদের প্রচারক ও গুরু হওয়ার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করে। তারা প্রতিষ্ঠাশার লোভে পরনিন্দা, পরচর্চা নিয়েই ব্যস্ত অথচ স্বঘোষিত শাস্ত্রবিদ। কিন্তু বেদশাস্ত্র এইরকম ব্যক্তিদের নয় বরং কাদের বৈষ্ণব বলে পরিচয় করা হয়েছে তা জগদ্গুরু সিংহপুরুষ শ্রীশ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদ তাঁর “ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব” গ্রন্থে স্বযত্নে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন— “বৈষ্ণবতা দীনজনের একমাত্র সম্পত্তি। অহঙ্কার, প্রভুত্ব প্রভৃতি অবৈষ্ণবেরই প্রয়াসের বস্তুমাত্র, তাহাতে বৈষ্ণবের লোভ নাই। বৈষ্ণবের সম্পত্তি হরি। জড়াসক্তি-প্রাচুর্য্যে মত্ত এবং ব্রাহ্মণাদির সুলভ সম্মানে, পাণ্ডিত্যে ও ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের সুলভধনাদিতে স্ফীত হইয়া নিষ্কিঞ্চন পরমহংস বৈষ্ণবের প্রতি অনাদরক্রমে কুকর্মফলে অবৈষ্ণবতা-লাভ ঘটে। দীনহীন কাঙ্গাল জড়ভোগে উদাসীন হরিসেবা-পর হরিজনগণ জড়বস্তু-সকলের অধিকারী হইবার বাসনা না করায়, ব্রাহ্মণাদি-জন্ম, ঐশ্বর্য্য, বেদাদি শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য, কন্দর্পতুল্য-রূপের অভিলাষকে অকর্মণ্য জানিয়া ভোগপর বেদপাঠনৈপুণ্যরূপ ব্রাহ্মণত্বাদি কৰ্ম্ম-বাসনা হইতে মুক্ত হইয়া হরিকথা কীর্ত্তন করিয়া থাকেন। বলা বাহুল্য, শ্রুতিপারদর্শিতা-ক্রমে ব্রাহ্মণের সম্মান, অতুল ধন-জন-রাজ্যলাভ-ফলে ক্ষত্রিয়ের ঐশ্বর্য্য এবং কৃষিবাণিজ্যফলে বৈশ্যের ধনের ও রূপের সমৃদ্ধি বৈষ্ণবতার কারণ নহে; ঐগুলি সেবোন্মুখতার অভাবে অবৈষ্ণবতার বর্দ্ধক জড়ভোগপর দামসমূহ-মাত্র বৈষ্ণবগণ তাদৃশ ক্ষুদ্র অধিকার-সমুহের জন্য ব্যস্ত না হওয়াতেই তৃণাদপি সুনীচ ও তদপেক্ষা উন্নতশির তরু অপেক্ষা সহিষ্ণু, স্বয়ং অমানী ও অপরে মানদ হইয়া হরিভক্তি লাভকরিয়াছেন। অধিক কি, আধিকারিক দেবসমূহ প্রাকৃত কৰ্ম্ম-রাজ্যে সর্ব্বোচ্চশৃঙ্গে অধিষ্ঠিত হইয়াও কৰ্ম্মসমাপ্তিতে ভগবদ্ভক্তি-প্রভাবেই বৈষ্ণবপদবী লাভ করিয়া থাকেন।” অতএব যারা নিজেদের বৈষ্ণব বলে মনে করে, জড়জগতে সীমাবদ্ধ বর্ণাশ্রম-ধর্মের সাথে চিজ্জগতের বৈষ্ণবতার তুলনা করে, তারা নিতান্তই অল্পজ্ঞ। শাস্ত্রজ্ঞান ও শাস্ত্রের উপলব্ধি একইসাথে নাও ঘটতে পারে। শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিসিদ্ধান্ত উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন— “জগতাং গুরবো ভক্তা ভক্তানাং গুরবো বয়ম্। সর্ব্বত্র গুরবো ভক্তা বয়ঞ্চ গুরবো যথা ॥ শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিলেন, বৈষ্ণবই জগতের গুরু;’ আমি বৈষ্ণবের গুরু। আমি যে-প্রকার সকলের গুরু, ভক্ত-গণও তদ্রূপ সর্বজনের গুরু। শ্রীমদ্বৈষ্ণবগণের সহিত জগতে কোন পূজ্যতম বস্তুর সাদৃশ্য নাই। বৈষ্ণব তদপেক্ষা অর্থাৎ সর্ব্বাপেক্ষা উচ্চতম আদর্শ, ইহাই শাস্ত্রসমূহের চরম সিদ্ধান্ত।” সাধু-বৈষ্ণবের কৃপাতেই শ্রীহরির কৃপা বিদ্যমান, তাই সাধুকৃপাতে অতি অল্পবয়সেই কারো কারো মধ্যে শাস্ত্রের দৃঢ় উপলব্ধি হয়, অথচ তৈলসজ্জিত শ্মশ্রু শুভ্রবর্ণ ধারণ করলেও কারো কারো নানা শাস্ত্র অধ্যয়নের পরেও মর্মার্থ উপলব্ধি হয় না। তাই তারা ভক্তদের নিন্দা, জাতিদ্বেষ নিয়েই নিরত থাকে। এমনকি সমস্ত শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত প্রদর্শিত হলেও তা রূপরঘুনাথের দর্শনের বিরোধী বলে প্রচার করার অপচেষ্টা করে। অথচ রূপরঘুনাথাদি ষড়্‌গোস্বামীবর্গের অভিন্ন সিদ্ধান্ত এই, বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি করা যাবে না। “ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব” গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে — অর্চৌ বিষ্ণৌ শিলাধীগুরুষু নরমতিবৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি-বিষ্ণোর্যা বৈষ্ণবানাং কলিমলমথনে পাদতীর্থেহম্বুবুদ্ধিঃ। শ্রীবিষ্ণোর্নান্নি মন্ত্রে সকলকলুষহে শব্দসামান্যবুদ্ধি-বিষ্ণৌ সর্বেশ্বরেশে তদিতরসমধীর্ষস্য বা নারকী সঃ ॥ নিত্যপূজ্য বিষ্ণুবিগ্রহে শিলাবুদ্ধি, বৈষ্ণব-গুরুতে মরণশীল মানব-বুদ্ধি, বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি অর্থাৎ জাতিবিচার, বিষ্ণু-বৈষ্ণবের পাদোদকে জলবুদ্ধি, সকল কল্মষবিনাশী বিষ্ণুনাম-মন্ত্রে শব্দ-সামান্য-বুদ্ধি এবং সর্বেশ্বর বিষ্ণুকে অপর দেবতার সহ সম-বুদ্ধি-এই ছয়প্রকার বিচারে ভক্ত ও অভক্তের তারতম্য বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিকভাবে সুব্যক্ত আছে। পদ্মপুরাণের এই শ্লোকটি শ্রীভক্তিরসামৃতসিন্ধু সহ বহু গোস্বামীগ্রন্থে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু, “নিজ সৌভাগ্যোদয় না হইলে বস্তু দর্শন করিয়াও দর্শনফল-লাভে অনেক অন্যাভিলাষী, কর্মী ও জ্ঞানী স্বভাবতঃই বঞ্চিত। তাঁহাদের নিজ-নিজ বিধি-নিষেধাদির পণ্যদ্রব্যভারে তাঁহারা এরূপ ভারাক্রান্ত যে, মস্তক উত্তোলন-পূর্বক গুণাতীতবস্তু-চতুষ্টয় দর্শনের সৌভাগ্যে তাঁহারা বঞ্চিত। সেই শোচ্যজীবগণ নিজ সঙ্কীর্ণতায় আবদ্ধ থাকিয়া ভক্তিপথে অগ্রসর হইতে পারেন না। তাঁহারা জগতে ভক্তি বা ভক্ত নিতান্ত বিরল জানিয়া তল্লাভের যত্ন-পর্য্যন্ত ত্যাগ-পূর্বক নিজের অধমতাকেই বহুমানন করেন এবং ভক্তের চরণে অপরাধ করিয়া নিজের অবনতির পথ পরিষ্কার করেন মাত্র।” বৈষ্ণবের আচারে উত্তম-কনিষ্ঠাদি তারতম্য থাকতে পারে। কিন্তু অপসম্প্রদায় বহির্ভূত তথা সৎসম্প্রদায়ে দীক্ষিত ব্যক্তি যে সংস্থারই অনুগামী হোক, তিনি বৈষ্ণব, তাতে সংশয় নেই। তাই হরিভক্তিবিলাসে’র মধ্যে এই শ্লোকটি গোস্বামীগণের দ্বারা উদ্ধৃত হয়েছে, গৃহীত-বিষ্ণুদীক্ষাকো বিষ্ণু-পূজাপরো নরঃ। বৈষ্ণবোহভিহিতোহভিজ্ঞৈরিতরোহম্মাদবৈষ্ণবঃ ॥ “শ্রীবিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত ও শ্রীবিষ্ণু-পূজাপরায়ণ ব্যক্তি অভিজ্ঞগণ কর্তৃক ‘বৈষ্ণব’ বলিয়া কথিত হন, তদ্ব্যতীত অপরে ‘অবৈষ্ণব’।” অতএব বৈষ্ণবভক্তদের প্রতি দেহাত্মবুদ্ধি স্থাপন করা অবশ্যই অপরাধজনক। বৈষ্ণবেরা তো মহৎ ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেও, মহারূপবান হয়েও, পরমবিদ্বান হয়েও কখনো এর গর্ব করেন না। কেননা তাঁরা জানেন, ভক্তদের কেবল কৃষ্ণের ইচ্ছাক্রমেই বিভিন্নভাবে বিভিন্নস্থানে জন্ম হয়। কলিযুগে মহাপ্রভুর পার্ষদগণ পাণ্ডববর্জিত গঙ্গাবর্জিত স্থানে এবং নিম্নকুলে আবির্ভূত হয়ে জগদুদ্ধার করেছেন, আবার পবিত্র স্থানে মহৎকুলেও এসেছেন। এর ফলে সেই কুল ও দেশেরই উদ্ধার হয়েছে, কেননা ভাগবতের সিদ্ধান্ত অনুসারে পবিত্র স্থানের মাহাত্ম্য স্থান নয়, বরং তীর্থী বৈষ্ণবগণের ফলেই লাভ হয়। কলিযুগে মহাপ্রভুকে সহায়তা করতে বহু বহু ভক্ত সময়ে সময়ে এই জগতে আবির্ভূত হচ্ছেন। তাই যারা মহাপ্রভুর সময়কালের দৃষ্টান্তসমূহকেও দৈব বলা যায় না, বরং সর্ব সময়কালের ভক্তদেরও দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণ করা উচিত। ভক্ত দেহ, স্থান, কাল, পাত্রের অতীত। তাই তাদের প্রতি জাতিদ্বেষ নিতান্তই অন্যায়। শ্রী সিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ তাই প্রমাণ দেখিয়েছেন, যথা— ♦“স্কন্দপুরাণে— হে নৃপোত্তম, যে ভাগবত-বৈষ্ণবকে উপহাস করে, তাহার অর্থ, ধৰ্ম্ম, যশ ও পুত্রসকল নিধন প্রাপ্ত হয়। যে মূঢ়গণ মহাত্মা বৈষ্ণবগণের নিন্দা করে, মহারৌরব-সংজ্ঞক নরকে পতিত হয়। তাহারা পিতৃ-পুরুষ-সহ বৈষ্ণবগণকে যে ব্যক্তি হনন করে, নিন্দা করে, বিদ্বেষ করে, অভিবাদন করে না, ক্রোধ করে এবং দেখিলে আনন্দিত হয় না, এই ছয় ব্যবহারই তাহার পতনের কারণ। ♦অমৃতসারোদ্ধারে— বৈষ্ণবগণকে পীড়া দিলে সজ্জাতি-জন্ম-প্রভৃতি যাহা কিছু সৎকর্মার্জিত পুণ্যফল থাকে, তৎসমস্তই নষ্ট হইয়া যায়। ♦দ্বারকামাহাত্ম্যে— যে পাপিষ্ঠগণ মাহাত্মা-বৈষ্ণবগণের নিন্দা করে, তাহারা যমশাসন-প্রভাবে সুতীব্র করপত্রদ্বারা ফালিত হয়। শত শত জন্মে বিষ্ণুপূজা করিয়া থাকিলেও বৈষ্ণবের অপমানকারী দুর্বৃত্তের প্রতি বিশ্বাত্মা শ্রীহরি প্রসন্ন হন না। ♦স্কান্দে— হে মহীপাল, বৈষ্ণবকে অগ্রে সম্মানপূর্ব্বক পরে যে ব্যক্তি অবজ্ঞা করে, সে স্ববংশে বিনষ্ট হয়। ♦ব্রহ্মবৈবর্ত্তে কৃষ্ণজন্মখণ্ডে— যাহারা হৃষীকেশ বা পুণ্যাশ্রয় তাঁহার ভক্ত-বৈষ্ণবগণের নিন্দা করে, তাহাদের শতজন্মার্জিত পুণ্য নিশ্চয় বিনষ্ট হয়। সেই পাপিগণ কুম্ভীপাক-নামক মহাঘোর নরকে কীটপুঞ্জ-দ্বারা ভক্ষিত হইয়া যাবচ্চন্দ্র-দিবাকর পচ্যমান হইয়া থাকে। বৈষ্ণব-নিন্দককে দর্শন করিলে দ্রষ্টার সমুদয় পুণ্য নিশ্চয় নষ্ট হয়। তাদৃশ অবৈষ্ণবকে দর্শন করিয়া গঙ্গাস্নান-পূর্বক সূর্য্য দর্শন করিলে বিদ্বজ্জন শুদ্ধিলাভ করেন। ♦শ্রীরামানুজ বলেন, ভগবানের পূজাপেক্ষা বৈষ্ণবের পূজা উত্তম, বিষ্ণুর অপমান অপেক্ষা বৈষ্ণবের অপমান গুরুতর অপরাধ, কৃষ্ণপাদোদকাপেক্ষা ভক্তের পাদোদক অধিকতর পবিত্র। বৈষ্ণবের পূজাপেক্ষা আর অন্য পুরুষার্থ নাই। বৈষ্ণববিদ্বেষ অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ আর কিছুই নাই; উহাতে নিজের বিনাশ হয়। ♦শ্রীচৈতন্যভাগবতে (ম ৫।১৪৫, ১০।১০২)— যত পাপ হয় প্রজা-জনেরে হিংসিলে। তার শতগুণ হয় বৈষ্ণবে নিন্দিলে॥ যে পাপিষ্ঠ বৈষ্ণবের জাতিবৃদ্ধি করে। জন্ম জন্ম অধম-যোনিতে ডুবি’ মরে ॥” অতএব আজ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদের মহিমান্বিত আবির্ভাব মহোৎসবের আয়োজনে আমরা সকল বৈষ্ণবমতানুসারী ব্যক্তিদের অনুরোধ করব, বিষ্ণুনামে দীক্ষিত হরিপরায়ণ ভক্তদের নিন্দা, দ্বেষ, জাতিবুদ্ধি ত্যাগপূর্বক মহাপ্রভুর সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে হরিভজনে প্রবৃত্ত হোন। এই জগতে আমরা ক্ষণিকের অতিথি। ভক্তনিন্দায় তাই কালক্ষেপণ না করে হরিভজন করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইহাই শ্রী সিদ্ধান্ত সরস্বতীর উপদেশ। হরে কৃষ্ণ © স্বধর্মম্ ™

শূদ্রকুলে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি কি দীক্ষাগুরু হতে পারেন?~পর্ব-৩

3 Svadharmam

প্রায়শ দেখা যায়, জাতিব্রাহ্মণ ও ধর্মব্যবসায়ী দাম্ভিক ব্যক্তিগণ বৈষ্ণবের বর্ণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার স্পর্ধা করেন এবং ধর্মানুগ ভক্তগণকে পথভ্রষ্ট করার চেষ্টা করেন। এরূপ ভাগবতদ্বেষীদের বিভ্রান্তিকর প্রচার নিরসনে এ লেখনি— বৈষ্ণবের বর্ণ কি? শ্রীমন্মধ্বাচার্য বর্ণকে দুইভাবে ব্যাখা করেছেন, যথা— ১) ঔপাধ্যায়িক বর্ণ (জন্ম দ্বারা জাতি) ২) পারমার্থিক বর্ণ (গুণ-কর্ম ভিত্তিক বর্ণ) ঔপাধ্যায়িক বর্ণ: দৈহিক জন্ম দ্বারা জাতিত্ব নির্ধারিত হয়। এর মধ্যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র চারটি জাতি। এদের মধ্যে যদি এক জাতির সাথে অপর জাতির দৈহিক মিলন ঘটে তবে তাকে বর্ণসঙ্কর বলে। বর্ণসঙ্কর অনুলোম ও প্রতিলোম দুই প্রকার। ঔরসদাতা হলেন পিতা, গর্ভধারিণী হলেন মাতা। চণ্ডাল,পুলিন্দ, পুক্কস, খস, যবন, সৌন্ধ, কাম্বোজ, শবর, ক্ষর প্রভৃতি বর্ণসঙ্করের উদাহরণ। পারমার্থিক বর্ণ (গুণ-কর্মানুসারে বর্ণ): যস্য যল্লক্ষণং প্রোক্তং পুংসো বর্ণাভিব্যঞ্জকম্। যদন্যত্রাপি দৃশ্যেত তৎ তেনৈব বিনির্দিশেৎ ৷ [শ্রীমদ্ভাগবতম ৭।১১। ৩৫] অনুবাদ: যদি কেউ ভাগবত বর্ণনা অনুসারে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্রের লক্ষণগুলি প্রদর্শন করেন, তা হলে তাঁকে ভিন্ন বর্ণের বলে মনে হলেও এই লক্ষণ অনুসারে তাঁর বর্ণ নির্দিষ্ট হবে। ব্যক্তি সদ্গুরু চয়ন করে তাঁর নিকট আশ্রিত হন। আশ্রিত ব্যক্তির গুণ পর্যবেক্ষণ করে গুরু তাকে মন্ত্রদান করেন। তখন গুরু হন পিতা, মাতা হলেন গায়ত্রীমন্ত্র। শিষ্য ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে গুরুগৃহে অবস্থান করেন এবং গুরু গুণবিচার করে তাদের বিদ্যাদান করেন। গুণ-কর্মানুসারে সে বর্ণপ্রাপ্ত হয়। বিশ্বামিত্রাদি মুনিগণ পারমার্থিক বর্ণ পরিচয়েই ত্রিলোক বিখ্যাত। ———————————————————————————————————————————————— বৈষ্ণবের বর্ণ: বৈষ্ণবের গুণ-কর্মানুসারে বর্ণ হয় না। বৈষ্ণব গুণাতীত, কর্মবন্ধনহীন। তার সাথে ঘটন-অঘটন সবই শ্রীহরির ইচ্ছাধীন, মায়াধীন নন। বৈষ্ণব দীক্ষা দ্বারা শ্রীহরির বংশে ব্যক্তির যে জন্ম হয়, তা দ্বারা তার দ্বিজত্ব সিদ্ধ হয়। বৈষ্ণব দীক্ষা প্রাপ্ত ব্যক্তির ঔপাধ্যায়িক বর্ণের পরিবর্তে পারমার্থিক বর্ণ লাভ করেন। দেহগত গোত্রপরিচয় পরিবর্তিত হয়ে তাঁর গোত্র হয় ‘অচ্যুত গোত্র’ (ভাগবত ৪।২১।১২)। তাঁর বর্ণ হয় ‘বৈষ্ণব’ বর্ণ বা ‘হংস বর্ণ’৷ ———————————————————————————————————————————————— বৈষ্ণবের গোত্র— সর্বত্রাস্খলিতাদেশঃ সপ্তদ্বীপৈকদণ্ডধূক। অন্যত্র ব্রাহ্মণকুলাদন্যত্রাচ্যুতগোত্রতঃ ॥ শ্রীমদ্ভাগবত ৪.২১.১২ অনুবাদ: মহারাজ পৃথু ছিলেন সপ্তদ্বীপ-সমন্বিত পৃথিবীর একচ্ছত্র সম্রাট। তাঁর অপ্রতিহত আদেশ সাধু, ব্রাহ্মণ ও অচ্যূতগোত্রভূক্ত বৈষ্ণব ব্যতীত অন্য কেউ লঙ্ঘন করতে পারত না। || অতএব, বৈষ্ণবের পরিচয় হলো— পিতা: বৈষ্ণব দীক্ষাগুরু কূল: হরিবংশ গোত্র: অচ্যুত গোত্র বর্ণ: হংস বর্ণ / বৈষ্ণব বর্ণ ———————————————————————————————————————————————— যেকোন বর্ণের ব্যক্তি বৈষ্ণব হলে দ্বিজে পরিণত হন। প্রমাণ— বিষ্ণুভক্তাশ্চ যে কেচিৎ সর্ব্বে বর্ণা দ্বিজতয়ঃ। কথিতং মম গার্গ্যেণ গৌতমেন সুমন্তুনা॥ [ স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখন্ড, মার্গশীর্ষমাসমাহাত্ম্য, ১১।১৭, রাজা বীরবাহু উক্তি ] অনুবাদ: যে কোন বর্ণের ব্যক্তি যদি বিষ্ণুভক্ত হন, তবে তিনিই দ্বিজ। এই কথা- গার্গ্য, গৌতম ও সুমন্তু আমার নিকট বলেছেন। ———————————————————————————————————————————————— বৈষ্ণব বর্ণ যে ব্রাহ্মণাদি চার বর্ণের বাইরে, পৃথক বর্ণ তার প্রমাণ— ব্রহ্মক্ষত্রিয়বিটশূদ্রাশ্চতস্রো জাতয়ো যথা। স্বতন্ত্রজাতিরেকা চ বিশ্বেষু বৈষ্ণবাভিধা॥ [ ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, ব্রহ্মখণ্ড, ১১।৪৩ ] বঙ্গানুবাদঃ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র নামে যেরূপ চারটি জাতি আছে তদ্রূপ সমগ্র বিশ্বে ‘বৈষ্ণব’ নামক একটি স্বতন্ত্র জাতি আছে। ললাটাদ্বৈষ্ণবো জাতঃ ব্রাহ্মণো মুখদেশতঃ ৷ ক্ষত্রিয় বাহুমূলাচ্চ ঊরুদেশাচ্চ বৈশ্য বৈ ৷৷ জাতো বিষ্ণোঃ পদাচ্ছুদ্রঃ ভক্তিধর্ম্মবিবর্জিতঃ৷ তস্মাদ্বৈ বৈষ্ণবঃ খ্যাতঃ চতুর্ব্বর্ণেষু সত্তমঃ ৷৷ [ বৃহদ্বিষ্ণুযামল তন্ত্র ] অনুবাদ: শ্রী ভগবান্ বিষ্ণুর ললাট হইতে বৈষ্ণব, মুখ হইতে ব্রাহ্মণ,বাহু হইতে ক্ষত্রিয়,ঊরুদেশ হইতে বৈশ্য ,পদদেশ হইতে ভক্তিধর্ম্মবিবর্জিত শূদ্রের উৎপত্তি হইয়াছে ৷ ইহার মধ্যে যিনি বৈষ্ণব বলিয়া খ্যাত, তিনি চতুর্বর্ণ হইতেও সর্বশ্রেষ্ঠ সর্বোত্তম ৷ ———————————————————————————————————————————————— বৈষ্ণব ব্রাহ্মণাদি চার বর্ণের থেকেও শ্রেষ্ঠ। প্রমাণ- ‘সৰ্ব্বেষাষ্ণৈব বর্ণানাং বৈষ্ণবঃ শ্রেষ্ঠ উচ্যতে।’ [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখন্ড, ৬৮।৪ ] বঙ্গানুবাদঃ সৰ্ব্ব বর্ণ মধ্যে বৈষ্ণবই শ্ৰেষ্ঠ বলিয়া কথিত। তস্মাদ্বৈ বৈষ্ণবঃ খ্যাতঃ চতুর্ব্বর্ণেষু সত্তমঃ ৷৷ [ বৃহদ্বিষ্ণুযামল তন্ত্র ] অনুবাদ : যিনি বৈষ্ণব বলিয়া খ্যাত, তিনি চতুর্বর্ণ হইতে সর্বোত্তম ৷ ব্রাহ্মণাঃ ক্ষত্রিয়া বৈশ্যাঃ শূদ্রা অন্যেহন্ত্যজাস্তথা। হরিভক্তিপ্রপন্না যে তে কৃতার্থা ন সংশয়ঃ।।২ হরেরভক্তো বিপ্রোঽপি বিজ্ঞেয়ঃ শ্বপচাধিক। হরের্ভক্তঃ শ্বপাকোঽপি বিজ্ঞেয়ো ব্রাহ্মণাধিকঃ স কথং ব্রাহ্মণো যস্তু হরিভক্তিবিবর্জিত। স কথং শ্বপচো যস্তু হরিভক্তিপরায়ণঃ ॥৩ অব্যাজেন যদা বিষ্ণুঃ শ্বপাকেনাপি পুজ্যতে।। তদা পশ্যেত্তমপ্যেষশ্চতুর্ব্বেদিদ্বিজাধিকম্। ৪ [ পদ্মপুরাণ, ক্রিয়াযোগসারঃ, ৫।২-৪, ব্যাস উক্তি] বঙ্গানুবাদঃ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র বা অন্য অন্ত্যজ জাতি-যাহারাই হরিভক্তিপ্রপন্ন, তাহারাই নিশ্চিত ধন্য। হরিভক্তিহীন ব্রাহ্মণও চন্ডাল অপেক্ষা অধম বলিয়া বিজ্ঞেয়। আর হরিভক্ত চন্ডালও ব্রাহ্মণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলিয়া জানিবে। যিনি হরি ভক্তিহীন, তিনি কিরূপে ব্রাহ্মণ হইবেন? আর যে হরিভক্তিপরায়ণ, সে কিরূপে চন্ডাল হইবে? যে মুহূর্তে চন্ডালও অকপট ভাবে বিষ্ণুপূজা করে, তখন বিষ্ণু তাহাকে চতুর্ব্বেদী ব্রাহ্মণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ হিসেবে অবলোকল করেন। বিপ্রাদ দ্বিষড়গুণযুতাদরবিন্দনাভ- পাদারবিন্দবিমুখাৎ শ্বপচং বরিষ্ঠম্ মন্যে তদর্পিতমনোবচনেহিতার্থ- প্রাণং পুনাতি স কুলং ন তু ভূরিমানঃ ॥ [ শ্রীমদ্ভাগবতম ৯।৯।১০ ] বঙ্গানুবাদঃ ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম-বিমুখ অভক্ত-ব্রাহ্মণ বারোটি ব্রাহ্মণোচিত গুণে ভূষিত হলেও তার অপেক্ষা যাঁর মন, বাক্য, কর্ম, ধন এবং প্রাণ ভগবান শ্রীহরিতে অর্পিত, সেই চণ্ডালও শ্রেষ্ঠ। এই প্রকার চন্ডালভক্ত-ও সেই রকম ব্রাহ্মণ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ, কারণ ভগবদভক্ত তাঁর কুল পবিত্র করতে পারে, কিন্তু সেই অতি গর্বান্বিত ব্রাহ্মণ নিজেকেও পবিত্র করতে পারে না, নিজের ব্রাহ্মণকূল উদ্ধার তো দূরের কথা। (উল্লেখ্য: এ শ্লোকটি মহাভারতের ‘সনৎসুজাত উপপর্বে’-ও বর্ণিত) ———————————————————————————————————————————————— বর্ণসঙ্কর বৈষ্ণব কি দীক্ষাগুরু হতে পারে? প্রামাণিক শাস্ত্র হতে বহু বহু দীক্ষাগুরুর দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই, যারা জন্ম দ্বারা বর্ণসঙ্কর হলেও পরবর্তীতে বিষ্ণুভক্তির অনুশীলন করে মহান বৈষ্ণবাচার্য্যে পরিণত হয়েছেন এবং দীক্ষাগুরু হয়ে বৈষ্ণবধর্মের প্রচার করেছেন। আসুন, আমরা ৩টি শাস্ত্র দৃষ্টান্ত দেখি! ১) শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস: মহর্ষি বেদব্যাসের পিতা পরাশর মুনি ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং মাতা সত্যবতী ছিলেন ক্ষত্রিয় উত্থানপাদের ঔরস ও মৎস্যগর্ভে জাত। তিনি ব্রহ্ম-মধ্ব-গৌড়ীয় সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান দীক্ষাগুরু। ২) মহামুনি মতঙ্গ: শূদ্র নাপিতের ঔরসে কামোন্মত্তা ব্রাহ্মণীর গর্ভে জন্ম, অতএব জাতিতে চণ্ডাল ছিলেন। ৩) ঋষিশৃঙ্গ মুনি: ঋষিশৃঙ্গ মুনি ছিলেন বিভাশুক মুনি ও ব্যাশা পুত্র। তথাপি তিনি ত্রিলোকে পূজ্য ছিলেন এবং রাজা দশরথের যজ্ঞদীক্ষাগুরু ছিলেন। পদ্মপুরাণেও অসৎকূলেজাত মহান বৈষ্ণব দীক্ষাগুরুগণের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়েছে- ব্রহ্মোবাচ। সচ্ছ্রোত্রিয়কুলে জাতো হ্যক্রিয়ো নৈব পূজিতঃ।। অসৎক্ষেত্রকুলে পূজ্যো ব্যাসবৈভাণ্ডকৌ যথা …. বেশ্যাপুত্রো বসিষ্ঠশ্চ অন্যে সিদ্ধা দ্বিজাদয়ঃ ॥ [ পদ্মপুরাণ, সৃষ্টিখন্ডম, ৪৬।২৭-২৮] অনুবাদ: ব্রহ্মা কহিলেন,- “শ্রোত্রিয় কুলজাত হয়েও যিনি অসৎ কর্মে লিপ্ত হন তিনি পূজ্য নহে, পরন্তু ব্যাসদেব ও ঋষ্যশৃঙ্গের ন্যায় অসৎকূলজ ব্যক্তিও সদাচার পরায়ণ হইলে পূজ্য হইয়া থাকেন…….বেশ্যাপুত্র বশিষ্ঠও সমাজে সমধিক সম্মান পান, এরকম আরও বহু বহু সিদ্ধ দ্বিজ আছে।” ———————————————————————————————————————————————— হয়গ্রীব পাঞ্চরাত্রে বলেছে, শৈব, সৌর, অনৈচ্ছিক, নগ্ন, বর্ণসঙ্কর, অপবিত্র, বৃদ্ধ, কুৎচ্ছিৎ অঙ্গ, মহাপাতকী চিহ্নযুক্ত ব্যক্তি গুরু হতে পারেন না। তাহলে সমাজে বর্ণসঙ্করগণ কিরূপে গুরু হচ্ছেন? উত্তরঃ হয়গ্রীব পাঞ্চরাত্রের উক্ত শ্লোকে যে সকল দোষ চিহ্নিত হয়েছে সেগুলো সকল অবৈষ্ণব ব্যক্তির ক্ষেত্রে বুঝতে হবে। যেমন, শুকদেব গোস্বামী ‘নগ্ন’ হয়েও, ব্যাসদেব-অষ্টবক্রমুনি ইত্যাদিগণ মুনি দেখতে সুদর্শন না হলেও, বিশ্বামিত্রের মতো ‘ব্রহ্মঘাতি’ ব্যক্তিও কিংবা বশিষ্ঠাদি মুনির মতো ‘বৃদ্ধ’ হয়েও দীক্ষাগুরু হওয়ার ভুরী ভুরী দৃষ্টান্ত আছে। অতএব, হয়গ্রীব পাঞ্চরাত্রের উক্ত বাক্যের দোষগুলো অবৈষ্ণবের জন্য বুঝতে হবে। ঠিক একই কারণে, হয়গ্রীব শাস্ত্রের উক্ত শ্লোকে বর্ণসঙ্কর দ্বারা অবৈষ্ণব বর্ণসঙ্করকে বুঝিয়েছে। যোনীগত বর্ণসঙ্করের জন্মদোষ থাকায় তিনি দীক্ষাদানে অযোগ্য। কিন্তু বর্ণসঙ্করী ব্যক্তি যদি বিষ্ণুভক্তিকে আশ্রয় করে নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব হন, তবে তার সমস্ত দোষ দূরীভূত হয়ে যায় এবং তিনি দীক্ষা দ্বারা বৈষ্ণবধর্মের প্রচার করে ত্রিজগতকে পবিত্র করেন। প্রমাণ- বৈষ্ণবেষু

শূদ্রকুলে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি কি দীক্ষাগুরু হতে পারেন?~পর্ব-২

2 Svadharmam

শ্রী নম্মালবর বা শঠকোপ আলবর শ্রী সম্প্রদায়ের ১২ জন মহান আচার্যের একজন, যাদের বাক্য ও উপদেশ এই সম্প্রদায়ে বেদের মতো মহান বলে মান্য করা হয়। শ্রী নম্মালবর শূদ্র সৎগোপ কুলে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তাঁর মহান বিষ্ণুভক্তির বলে ব্রাহ্মণকুলের গুরু হয়েছিলেন। নম্মালবর শূদ্রকূলে জন্মেও বৈষ্ণব সংস্কার ধারণ করতেন, ব্রাহ্মণের ন্যায় নবগুণে যজ্ঞোপবীত ধারণ করতেন। তিনি ৩০৫৯ খ্রিস্টপূর্বে অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্বধাম প্রত্যাবর্তনের মাত্র অর্ধশত বছর পরেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। এবং জন্ম থেকে তিনি কোনো কথা বলেননি এবং চোখ খোলেননি। তাই সকলে তাকে মূক ও অন্ধ বলে মনে করতেন। শিশুকালে নম্মালবর একদিন একটি তেঁতুল গাছের নিচে বসে কৃষ্ণভজন করছিলেন, তখন একদিন মধুরকবি নামক একজন কৃষ্ণভক্ত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত সর্ব তীর্থ ভ্রমণ করে গৃহে প্রত্যাবর্তনের পথে হঠাৎ বহু দূর থেকে আলোকচ্ছটা দেখতে পেয়ে সেখানে আগমন করেন। হঠাৎ অন্তর থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে মধুরকবি তাঁকে সাংখ্যযোগের ভিত্তিতে একটি ধাঁধা জিজ্ঞেস করেন, “মৃতদেহে যদি ক্ষুদ্র কিছু জন্য নেয় তা কি এই দেহে বাস করে ও আহার করে?” নম্মালবর তাঁকে এর উত্তর দিয়ে প্রথমবারের মতো কথা বলেন, “হ্যাঁ বাস করবে, আহারও করবে।” এরপর তিনি সেই ক্ষুদ্র বস্তুকে আত্মা, মৃতদেহকে জড় দেহ এবং বাস ও আহার করাকে কর্তা ও ভোক্তা জ্ঞান করা হিসেবে বিশ্লেষণ করে চরমে কৃষ্ণভক্তিই সার বলে স্থাপন করেন। একটি শিশুর মুখে সাংখ্যতত্ত্ব শ্রবণ করে মধুরকবি তাঁকে মহান পণ্ডিত ও মহান কৃষ্ণভক্ত বলে উপলব্ধি করতে পেরে তাঁর চরণাশ্রয় করলেন এবং তাঁর নিকট বৈষ্ণবমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করলেন। যদিও মধুরকবি বয়সে জ্যেষ্ঠ ছিলেন ও নম্মালবর শিশু ছিলেন, তবুও মধুরকবি বয়স ও বর্ণ বিচার না করেই বৈষ্ণবের চরণাশ্রয় করেন এবং নাম্মাবরের চরণাশ্রয়ে তপস্যা করে নিজেও আলোয়ার হয়েছেন। কিংবদন্তী এই, নম্মালবর মধুরকবি আলবরকে রামানুজ আচার্যের সম্বন্ধে ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। পরবর্তীকালে আরো বহু ব্যক্তি নম্মালবরের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি এমনই মহান ভক্ত ছিলেন যে, বলা হয়, তাঁর অনুসারীদের জন্যেই শ্রী নারায়ণ এই কলিযুগে প্রথম বৈকুণ্ঠের দ্বার উন্মোচন করেছিলেন । শঠকোপ যোগী বা নম্মালবর বৈশাখ মাসে শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে বিশাখা নক্ষত্রে আবির্ভূত হন। প্রতি বছর তাঁর আবির্ভাব নক্ষত্র মহা ধুমধামে শ্রী সম্প্রদায়ে পালিত হয় এবং নবসূত্র যজ্ঞোপবীত প্রভৃতি ব্রাহ্মণ্য উপাচারের দ্বারা সেবিত হন। কৃষ্ণ ভজনে নাহি জাতি-কুলাদি বিচার। সৎগোপকুলে জাত শ্রী নম্মালবর শঠকোপ যোগী সকলকে সৎবুদ্ধি দিন এবং শঠতা দূরীভূত করুন। হরে কৃষ্ণ। ~ মধুর গৌরকিশোর দাস © স্বধর্মম্ ™

শূদ্রকুলে জন্ম নেওয়া ব্যক্তি কি দীক্ষাগুরু হতে পারেন?~পর্ব-১

1 Svadharmam

সাম্প্রতিক সময়ে শূদ্রকুলে জন্মগ্রহণ করা ব্যক্তি দীক্ষাগুরু হতে পারে না, এমন বিষয় নিয়ে প্রচুর চর্চা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু শাস্ত্রে এর ভূরিভূরি দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে বৈষ্ণবগণ শূদ্র কুলে আবির্ভূত হয়েও ব্রাহ্মণের দীক্ষাগুরু হয়েছিলেন। পর্যায়ক্রমে আমরা তাদের বিষয়ে প্রকাশ করব। গৌড়ীয় পরম্পরায় শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয় একজন বিখ্যাত আচার্য যিনি শূদ্র কায়স্থকুলে আবির্ভূত হলেও কৃষ্ণভক্তির প্রভাবে ব্রাহ্মণত্ব অর্জন করে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একজন মহান দীক্ষাগুরুতে পরিণত হয়েছিলেন। নরোত্তম দাস ঠাকুর বহু স্মার্ত ব্রাহ্মণকে শিষ্যরূপে গ্রহণ করেছিলেন। ঠাকুর মহাশয়ের দীক্ষা ও শিক্ষা লাভ, প্রচার ও বিগ্রহসেবা: শ্রী নরোত্তম দাস বৃন্দাবনে মহাপ্রভুর পার্ষদ শ্রীল লোকনাথ গোস্বামীর নিকট দীক্ষা ও শ্রীল জীব গোস্বামীর নিকট শিক্ষা লাভ করে গৌড়ীয় শাস্ত্রে পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি ‘ঠাকুর মহাশয়’ উপাধি লাভ করেন। এরপর গুরুবর্গের নির্দেশে তিনি কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য পুনরায় পূর্ববঙ্গে ফিরে আসেন। ঠাকুর মহাশয় তাঁর আবির্ভাব স্থান খেতুরী অঞ্চলে ছয়টি মন্দির স্থাপন করেছিলেন। এই উপলক্ষে তৎকালীন সময়ের সমস্ত বৈষ্ণব খেতু্রীগ্রামে নিয়ন্ত্রিত হয়েছিলেন। সেখানে গৌর পূর্ণিমায় এত বিশাল মহোৎসব হয়েছিল যে তা এখনও ইতিহাসে বিখ্যাত এবং শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর প্রধান পার্ষদগণ তখন প্রকট না থাকলেও আকাশপথে আবির্ভূত হয়ে সেই উৎসবে ঠাকুর মহাশয়ের কীর্তনে নৃত্য করেছিলেন যা উপস্থিত বহু ভক্ত দর্শন করেছিলেন। যদিও ঠাকুর মহাশয় বাহ্যত শূদ্রকুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর গুরুদেবের আদেশে এভাবে শ্রীবিষ্ণুপ্রিয়া-গৌরাঙ্গ, শ্রীবল্লবীকান্ত, শ্রীরাধারমণ, শ্রীব্রজমোহন, শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধাকান্ত — এই ছয় বিগ্রহ স্থাপন করেছিলেন এবং এভাবে বৈষ্ণবদীক্ষায় দীক্ষিত ব্যক্তি যেকোনো কুলে জন্মগ্রহণ করেও বিগ্রহসেবার অধিকারী হয় এই শাস্ত্রীয় বাক্যের উপযুক্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। শূদ্রগৃহে জন্ম নিয়ে ব্রাহ্মণ সন্তানদের দীক্ষা দেওয়ায় তিনি জাতি ব্রাহ্মণদের প্রবল বিরোধের সম্মুখীন হন। কিন্তু খেতুরী মহোৎসবে শ্রী নিত্যানন্দ প্রভুর পুত্র শ্রীবীরচন্দ্র প্রভু স্বয়ং বহু শাস্ত্র প্রমাণাদি সহযোগে বলেন কৃষ্ণ দীক্ষা গ্রহণ করলে দ্বিজত্ব প্রাপ্তি হয় এবং নরোত্তম দাস ঠাকুর যদিও শূদ্র কুলোদ্ভব কিন্তু বীরচন্দ্র প্রভু তাকে ব্রাহ্মণ বলে ঘোষণা করেন ও তার বক্ষে জ্যোতির্ময় যজ্ঞোপবীত সকলকে দর্শন করান। শ্রীপ্রেমবিলাসে (১৯ বিলাসে) উল্লেখ আছে— এই নরোত্তম কায়স্থ কুলোদ্ভব হয়। শূদ্র বলি কেহ কেহ অবজ্ঞা করয়॥ কৃষ্ণভক্ত জন হয় ব্রাহ্মণ হৈতে বড়। যিঁহো শাস্ত্র জানে তিঁহো মানে করি দৃঢ়॥ কৃষ্ণ দীক্ষায় দ্বিজত্ব লাভ শাস্ত্রের বচন। ইথে অবিশ্বাস যায় নরক ভবন॥ কুষ্ঠরোগী ব্রাহ্মণকে কৃপা: শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুর নাম প্রচার এবং দীক্ষামন্ত্র দান করে গুরুরূপে সেবা করছিলেন, যা স্বভাবতই বহু লোকের মনঃপুত হয়নি। এখনকার দিনেও এরকম ব্যক্তি রয়েছে, অতএব সেই সময়ের আর কি কথা। একদিন এক কুষ্ঠরোগী ব্রাহ্মণ নরোত্তম দাস ঠাকুরের ভজনতলীতে আগমন করে হাত জোড় করে বিনীতভাবে বলতে লাগলেন, “ঠাকুর, আমি এক অহংকারী ব্রাহ্মণ, আমি আপনার সমালোচনা ও বিদ্রূপ করেছি এবং এই অপরাধের ফলে এইরকম যন্ত্রণাদায়ক রোগ লাভ হয়েছে‌ আমি যতই ঔষধ গ্রহণ করি না কেন, এই রোগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হচ্ছে। তাই আমি মনোকষ্টে পদ্মায় আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সেই রাতে আমার আরাধ্যা ভগবতী দেবী স্বপ্নে আমাকে রোগের কারণ অবগত করে আপনার নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করতে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু আমি মহাপাপী, ক্ষমার অযোগ্য। আপনি আমাকে উদ্ধার করুন।” ব্রাহ্মণের এই আর্তনাদ দেখে ঠাকুরের হৃদয় বিগলিত হয়ে গেল। ঠাকুর মহাশয় তাকে ভূমি থেকে তুলে হরে কৃষ্ণ কীর্তন করতে করতে আলিঙ্গন করলেন। তখন সেই ব্রাহ্মণও কৃষ্ণপ্রেম লাভ করে কীর্তন করতে করতে হাত তুলে নৃত্য করতে লাগলেন। যখন ব্রাহ্মণের বাহ্যজ্ঞান ফিরে এলো, তিনি দেখলেন তার দেহ সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে। তখন সেই ব্রাহ্মণ ঠাকুর মহাশয়ের নিকট কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন এবং অহংকারশূন্য হয়ে কৃষ্ণভক্তি করতে লাগলেন। সেই অঞ্চলের লোকজন এই ঘটনা শুনতে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং সকলেই নরোত্তম দাস ঠাকুরের মহিমা উপলব্ধি করতে পারলেন। তাঁরা বলতে লাগলেন— কেহ কার প্রতি কহে, হও সাবধান। শ্রীনরোত্তমেরে না করিহ শূদ্রজ্ঞান॥ কেহ কহে মত্ত হৈয়া বিপ্র অহংকারে। নরোত্তম হেন রত্ন নারি চিনিবারে ॥ (নরোত্তম বিলাস, নবম বিলাস) হরিরাম, রামকৃষ্ণ ও শিবানন্দ উদ্ধার: শ্রীল নরোত্তম ঠাকুর মহাশয়ের কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের ফলে কালক্রমে এই অঞ্চলের বহু লোক নিতাই-গৌরের প্রেমভক্তি গ্রহণ করতে লাগল। ঠাকুর মহাশয় তাদের দীক্ষা দিয়ে উদ্ধার করলেন। বহু ব্রাহ্মণসন্তানও ঠাকুর মহাশয়ের নিকট দীক্ষা নিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে হরিরাম আচার্য, রামকৃষ্ণ আচার্য, গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তী বিখ্যাত‌। এছাড়াও জগন্নাথ আচার্য, শিবানন্দ আচার্য, রূপ নারায়ণ প্রভৃতি পণ্ডিতগণও অগ্রগণ্য। হরিরাম ও রামকৃষ্ণ ঠাকুর আশ্রয়ে কৃষ্ণভক্তি ও শাস্ত্রশিক্ষা করতে থাকলে তাদের পিতা শিবানন্দ আচার্য অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি তাদের ভর্ৎসনা করতে লাগলেন, “ব্রাহ্মণ হয়ে কায়স্থের পায়ে ধরতে তোদের লজ্জা করল না? আর সে কোথাকার কোন বৈষ্ণব, যে কিনা ব্রাহ্মণকে শিষ্য করার দুঃসাহস করেছে?” তখন দুই ভাই পিতাকে বললেন, “পিতা, আপনি দয়া করে শান্ত হোন, আপনি পণ্ডিতগণসহ শাস্ত্রবিচার আয়োজন করুন, আমরা শাস্ত্রের বিচারে এর উত্তর দেবো। সেই বিচারে যদি আপনার মত শ্রেষ্ঠ হয়, তাহলে আমরা প্রায়শ্চিত্তও করব।” শিবানন্দ তখন আরো দুইজন পণ্ডিতকে আমন্ত্রণ করে শাস্ত্রবিচার আয়োজন করেন এবং পরাজিত হন। তখন তিনি মিথিলা থেকে এক বিখ্যাত পণ্ডিত মুরারি মহাশয়কে আমন্ত্রণ করেন, কিন্তু শ্রীগুরুদেবের আশির্বাদে হরিরাম ও রামকৃষ্ণ তাঁকেও ভাগবতের সিদ্ধান্ত দ্বারা পরাজিত করেন। মুরারি মহাশয় তখন লজ্জায় স্থান ত্যাগ করেন। সেদিন রাতে শিবানন্দ আচার্যের পূজিতা দুর্গাদেবী তাকে স্বপ্নে বললেন, “যারা শ্রীহরির প্রিয় ভক্ত, তাঁরাই আমার প্রিয়। তুই যদি রক্ষা পেতে চাস, তাহলে শ্রী নরোত্তমের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা কর।” পরদিন পরিবারের বাকি সকলকে নিয়ে শিবানন্দ আচার্য শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুরের চরণাশ্রয় গ্রহণ করলেন। গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তী ও মণিপুরী বৈষ্ণব হরিরাম ও রামকৃষ্ণের প্রচারের ফলে গঙ্গানারায়ণ চক্রবর্তী ঠাকুর মহাশয়ের চরণাশ্রয় করেন এবং অল্পসময়ে ভক্তিশাস্ত্রে মহাপণ্ডিত হন। তিনি পরবর্তী সময়ে মণিপুরী সম্প্রদায়ে কৃষ্ণভক্তি প্রচার করেছিলেন, যার ফলে আজও সেখানে কৃষ্ণভক্তির প্রবাহ দেখা যায়। রূপ নারায়ণ ও রাজা নরসিংহ ক্রমে ক্রমে নরোত্তম দাস ঠাকুরের ব্রাহ্মণ শিষ্য সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। অনেক প্রধান ব্রাহ্মণ নরোত্তম দাস ঠাকুরের প্রেমভক্তির বন্যায় নিজেকে ভাসিয়ে দিলেন। এতে স্মার্ত ব্রাহ্মণ সমাজ ঠাকুর মহাশয়ের প্রতি কুপিত হতে লাগলেন। কারণ ঠাকুর মহাশয়ের শিষ্য সংখ্যা এতোই বেড়েছে যে, তাকে আর একঘরে করে দিলেও কোনো লাভ হবে না। শ্রীনরোত্তম দাস ঠাকুর মহাশয়ের মহিমা দেখে স্মার্ত ব্রাহ্মণ সমাজ ঈর্ষায় দগ্ধ হতে লাগল। তাই সকলেই রাজা নরসিংহের কাছে গিয়ে নালিশ করল, “মহারাজ, আপনি যদি ব্রাহ্মণ সমাজকে না বাঁচান, তবে তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। রাজা কৃষ্ণানন্দ দত্তের পুত্র নরোত্তম শুদ্র হয়ে ব্রাহ্মণদের শিষ্য করছে এবং জাদু-মন্ত্র দিয়ে সকলকে মুগ্ধ করছে।” রাজা নরসিংহ বললেন, “আমি আপনাদের রক্ষা করব। আমায় কী করতে হবে বলুন?” ব্রাহ্মণগণ বললেন, “মহাদিগবিজয়ী পণ্ডিত শ্রীরূপনারায়ণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা খেতুরিতে গিয়ে নরোত্তমকে পরাস্ত করব। এ কাজে আপনি আমাদের সাহায্য করুন।” রাজা নরসিংহ বললেন, “আমিও আপনাদের সাথে যাবো।” রাজা তার সভাসদ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতগণ ও সভাপণ্ডিত রূপনারায়ণ সহ বিষয়টি আলোচনা করলেন এবং স্থির করলেন সবাইকে নিয়ে খেতুরি অভিমুখে যাত্রা করবেন। স্মার্ত ব্রাহ্মণগণ দিগ্বিজয়ী রূপনারায়ণকে সঙ্গে নিয়ে খেতুরি গ্রামের দিকে যাত্রা করলেন। একজন লোক এসে তা শ্রীনরোত্তম ও শ্রীরামচন্দ্র কবিরাজ আদি সকল ভক্তকে জানালেন। এদিকে এ

ঈশ্বর পুরুষ নাকি নারী?

বেদের বর্ণনায় ঈশ্বর হল সাকার। তার সুন্দর রুপ বিদ্যমান। “দিবো বা বিষ্ণো উত বা পৃথিব্যা মহো বা বিষ্ণু উরোরন্তরিক্ষাৎ।উভো হি হস্তা বসুনা পূনস্বা প্রযচ্ছ দক্ষিণাদোত সব্যাদ্বিষ্ণবে দ্বা।।” –শুক্ল যজুর্বেদ ৫।১৯ অনুবাদ:- “হে ঈশ্বর ( বিষ্ণু),আপনি দ্যুলোক হইতে কি ভূলোক হইতে কিংবা অনন্ত প্রসারী অন্তরিক্ষলোক হইতে পরমধন লইয়া উভয় হস্তকে পূর্ণ করুন। আর দক্ষিণ ও বাম হস্ত দ্বারা অবাধে অবিচারে সেই পরমধন প্রদান করুন,আপনাকে প্রাপ্তির নিমিত্তে উপাসনা করি।” উপরোক্ত শুক্ল যজুর্বেদের মন্ত্রের মতোই সমগ্র বেদে অসংখ্যবার পরমেশ্বর ভগবানের সাকার রুপের বর্ণনা করা হয়েছে। এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে সে ঈশ্বর কি পুরুষ নাকি নারী? উত্তর হল মহাভারত – শান্তিপর্ব – ২১৮/৯০, এবং গীতা১৩/১৮ নং শ্লোক অনুযায়ী  ঈশ্বর কখনো পুরুষ বা নারী কোনটি নয়, তিনি হলেন জ্ঞানস্বরুপ।বেদ শব্দের অর্থ হল জ্ঞান। বেদ শাস্ত্রে  ঈশ্বর হলেন সাকার।আর বেদ শাস্ত্র অনুসারে সে ঈশ্বর হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণু। এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করা হয়েছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাস্ত্রে।গীতা শাস্ত্র অনুসারে সে ঈশ্বর কখনো পুরুষ বা স্ত্রী কিছুই নয়।তিনি হলেন পরম পুরুষ অথাৎ পুরুষোত্তম। ভগবদগীতা ১৩/২০ শ্লোক অনুসারে পুরুষ শব্দে জীবকে নির্দেশ করা হয়েছে। তাই ঈশ্বর সমস্ত জীবের ( পুরুষের) নিয়ন্ত্রক।তাই গীতা ১৩/২৩ শ্লোক এবং গীতা ১৫/১৮ শ্লোকে ঈশ্বরকে পরম পুরুষ বা পুরুষোত্তম রুপে বর্ননা করা হয়েছে।সেই ঈশ্বরের নামটি হল শ্রীকৃষ্ণ( গীতা ১৫/১৮)।  “উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ। পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেহস্মিন্ পুরুষঃ পরঃ।।”             – গীতা ১৩/২৩ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুবাদঃ এই শরীরে আর একজন পরম পুরুষ রয়েছেন,যিনি হচ্ছেন উপদ্রষ্টা, অনুমন্তা, ভর্তা, ভোক্তা, মহেশ্বর এবং তাকে পরমাত্মাও বলা হয়।       “যো মামেবমসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম্। স সর্ববিদ্ ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত।।” -গীতা ১৫/১৮ঃভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুবাদঃ হে ভারত! যিনি নিঃসন্দেহে আমাকে পুরুষোত্তম বলে জানেন, তিনি সর্বজ্ঞ এবং তিনি সর্বতোভাবে আমাকে ভজনা করেন। “অহং সর্ব্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্ব্বং প্রবর্ত্ততে। ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ।। গীতা ১০/৮ঃভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুবাদ- আমি সমস্ত জগতের সৃষ্টির কারণ। আমার থেকে সমস্ত জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। জ্ঞানীরা এরুপ জেনে আমার ভজনা করেন।   হরে কৃষ্ণ।প্রনাম

শ্রীকৃষ্ণের কি মৃত্যু হয়েছিল, নাকি তিনি স্বশরীরে বৈকুন্ঠে গমন করেছিলেন ?

IMG 20250305 WA0005 Svadharmam

আমাদের সমাজে কিছু শাস্ত্রজ্ঞানহীন ভগবৎ-বিদ্বেষী ব্যক্তি আছে, যারা শ্রীকৃষ্ণকে তাদের মতোই সাধারণ মানুষ মনে করে। অথচ মহাভারত শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলা হয়েছে, স্বয়ং চতুর্ভুজ বিষ্ণু বলা হয়েছে। অনুগ্রহার্থং লোকানাং বিষ্ণুলোক নমস্কৃতঃ। বসুদেবাত্তু দেবক্যাং প্রাদুর্ভূতো মহাযশাঃ।। ( মহাভারত, আদিপর্ব, ৫৮/১৩৮ ) অনুবাদ: ত্রিজগতের পূজনীয় মহাযশস্বী স্বয়ং বিষ্ণু লোকের প্রতি অনুগ্রহ করিবার জন্য বসুদেব-দেবকীতে আবির্ভূত হইয়া ছিলেন। কিন্তু তার পরেও এ সমস্ত অজ্ঞানী মানুষেরা তাদের আসুরিক মতকে প্রচার করতে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করতেছে, যা অশাস্ত্রীয়, ঘৃন্য এবং আসুরিক। অথচ মহাভারত শাস্ত্রের মৌষলপর্ব পাঠ করে আমরা সহজে জানতে পারি, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে তার অন্তর্ধানের সময় নির্ধারন করেছিলেন। তখন তিনি একটি বৃক্ষের উপর চতুর্ভূজ বিষ্ণুরুপে অবস্থান করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণ স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গে এবং পরে বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেন। অসুরেরা যেহেতু মহাভারত শাস্ত্র উক্ত শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণুরুপে মানে না, পরমেশ্বর ভগবানরুপে মানে না, তাই তারা মহাভারত শাস্ত্রের এসমস্ত জ্ঞান সাধারন মানুষের মাঝে প্রচার না করে এর বিপরীতে অশাস্ত্রীয় ভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্ধান লীলা নিয়ে অপপ্রচার করছে। নিম্নে মহাভারতের মৌষল পর্ব অবলম্বনে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা রহস্যের সত্য ইতিহাস পরিবেশিত হল…. ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা: বৃষ্ণিবংশ বা যদুবংশ ধ্বংস হওয়ার পর- ততো গত্বা কেশবস্তুং দদর্শ রামং বনে স্থিতমেকং বিবিক্তে ॥১২৷৷ অথাপশ্যযোগযুক্তস্য তস্য নাগং মুখানিঃসরন্তং মহান্তম্। শ্বেতং যযৌ সততঃ প্রেক্ষ্যমাণে। মহার্ণবে যেন মহানুভাবঃ ॥১৩৷৷ সহস্রশীর্ষঃ পর্ব্বতাভোগবর্ষ্ম। রক্তাননঃ স্বাং তনুং তাং বিমুচ্য। সম্যক্ চ তং সাগরঃ প্রত্যগৃহ্লান্নাগা দিব্যাঃ সরিতশ্চৈব পুণ্যাঃ ॥১৪৷ ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১২-১৪ ) অনুবাদঃতাহার পর কৃষ্ণ যাইয়া নির্জন বনস্থিত একাকী বলরামকে দেখিলেন। ১২।। আরও দেখিলেন যে, যোগপ্রবৃত্ত বলরামের মুখ হইতে একটা শ্বেতবর্ণ বিশাল নাগ নির্গত হইতেছে। সেই নাগ নির্গত হইয়া মহাসমুদ্রে প্রবেশ করিল। যেহেতু, সে মহাপ্রভাবশালী ছিল। ১৩।।সহস্র মস্তক পর্ব্বতের ন্যায় বিশাল দেহ ও রক্তমুখ সেই নাগ নিজ বলরাম- দেহ পরিত্যাগ করিয়া সাগরজলে প্রবেশ করিলেন। তখন সাগরও আদরের সহিত তাঁহাকে গ্রহণ করিল এবং দিব্য নাগসমূহ ও পুণ্য নদীসকলও তাঁহাকে গ্রহণ করিল।” ১৪।। ভগবান বলরামের এরুপ অন্তর্ধানের পর:- ততো গতে ভ্রাতরি বাসুদেবো জানন্ সর্বা গতয়ো দিব্যদৃষ্টিঃ ॥১৭৷ বনে শূন্যে বিচরংশ্চিন্তয়ানো ভূমৌ চাথ সংবিবেশাগ্র্যতেজাঃ। সর্বং তেন প্রাক্ তদা চিন্ত্যমাসীদ্গান্ধাৰ্য্যা যদ্বাক্যমুক্তঃ স পূর্ব্বম ॥১৮৷৷ ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১৭-১৮) অনুবাদঃ”এইভাবে ভ্রাতা বলরাম মর্ত্যলোক হইতে প্রস্থান করিলে দিব্যজ্ঞানশালী কৃষ্ণ সকলেরই সমস্ত অবস্থা জানিতে পারিয়া চিন্তাকুল চিত্তে শূন্য বনে বিচরণ করিতে করিতে ভূতলে শয়ন করিলেন এবং পূর্ব্বে গান্ধারী যে বাক্য বলিয়াছিলেন, মহাতেজা কৃষ্ণ তখন সেই সমস্তই চিন্তা করিতে লাগিলেন।”১৭-১৮৷৷ দুর্বাসসা পায়সোচ্ছিষ্টলিপ্তে যচ্চাপ্যুক্তং তচ্চ সম্মার কৃষ্ণঃ। সঞ্চিন্তয়ন্নন্ধকবৃষ্ণিনাশং কুরুক্ষয়ঞ্চৈব মহানুভাবঃ ॥১৯৷৷ যেনে ততঃ সংক্রমণস্য কালং ততশ্চকারেন্দ্রিযসংনিরোধম্। যথা চ লোকত্রয়পালনার্থং দুর্বাসবাক্যপ্রতিপালনায় ॥২০॥ দেবোহপি সন্দেহবিমোক্ষহেতোনির্ণীত মৈচ্ছৎ সকলার্থতত্ত্ববিৎ। স সংনিরুদ্ধেন্দ্রিয়বাঙ্মনাস্ত শিশ্যে মহাযোগমুপেত্য কৃষ্ণঃ ॥২১৷ জরোহথ তং দেশমুপাজগাম লুব্ধস্তদানীং মৃগলিপ্স রুগ্রঃ। স কেশবং যোগযুক্তং শযানং মৃগাশঙ্কী লুব্ধকঃ সাযকেন ॥২২॥ জরোহবিধাৎ পাদতলে ত্বরাবাংস্তং চাভিতস্তজ্জিবৃক্ষুর্জগাম। অথাপশ্যৎ পুরুষং যোগযুক্তং পীতাম্বরং লুব্ধকোহনেকবাহুম্ ॥২৩৷৷              (মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১৯-২৩) মহানুভাব কৃষ্ণ যদুবংশ ধ্বংস ও কুরুবংশ বিনাশ ভাবিতে থাকিয়া দুর্ব্বাসার উচ্ছিষ্ট পায়স দ্বারা ভূমি লিপ্ত করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন, দুর্ব্বাসার সেই বাক্য স্মরণ করিলেন।১৯।।তাহার পর কৃষ্ণ সেই সময়টাই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করিলেন। পরে তিনি ত্রিভুবন পালন করিবার জন্য এবং দুর্ব্বাসার বাক্য রক্ষা করিবার নিমিত্ত ইন্দ্রিয়গণকে নিরুদ্ধ করিলেন।২০॥ সকলার্থতত্ত্বজ্ঞ কৃষ্ণও সন্দেহ দূর করিবার জন্য নিশ্চিত বিষয় কামনা করিলেন। তখন কৃষ্ণ মহাযোগ অবলম্বন করিয়া ইন্দ্রিয়, বাক্য ও মনকে নিরুদ্ধ রাখিয়া ভূতলে শয়ন করিলেন।২১॥তাহার পর উগ্রমূর্ত্তি ও হরিণলিপ্সু জরানামক এক ব্যাধ সেই সময়ে সেই স্থানে আগমন করিল এবং মৃগ মনে করিয়া বাণদ্বারা যোগযুক্ত অবস্থায় শায়িত কৃষ্ণের পদতলে বিদ্ধ করিল, পরে ত্বরান্বিত হইয়া সেই বিদ্ধ মৃগকে গ্রহণ করিতে ইচ্ছা কবিয়া তাহার নিকট গমন করিল। তদনন্তর সে দেখিল-অনেক বাহু, পীতাম্বরপরিধায়ী ও যোগযুক্ত একটা পুরুষ শায়িত রহিয়াছেন।২২-২৩॥ বিশ্লেষণঃ উপরোক্ত  বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন দর্শন করলেন বলরাম সমুদ্রে লীন হলেন তখন তিনি সেই সময়টিকেই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করেছিলেন। অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই জড় জগত ত্যাগ করার সময়  নিজেই  নির্ধারণ করেছিলেন। সুতারাং যারা শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবানরুপে স্বীকার করতে চায় না, তাদের কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা, শ্রীকৃষ্ণ যদি পরমেশ্বর ভগবান না হন, তাহলে তিনি কিভাবে জড় জগত ত্যাগের সময় নিজেই নির্ধারণ করতে পারেন? এরপর দেখা যাক, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলার পরবর্তী অংশ। মহাত্মানং ত্বপরাদ্ধং স তস্য পাদৌ জরো জগৃহে শঙ্কিতাত্মা।আশ্বাসিতঃ পুণ্যফলেন ভক্ত্যা তথানুতাপাৎ কৰ্ম্মণো জন্মনশ্চ।।২৪।। (মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২৪) অনুবাদঃ”সেই জরা নামক ব্যাধ নিজেকে অপরাধী মনে করিয়া উদ্বিগ্ন চিত্ত হইয়া শ্রীকৃষ্ণের চরণযুগল ধারণ করিল। তখন তাহার পুণ্য, ভক্তি এবং নিজের দুষ্কর্ম ও জন্ম বিষয়ে অনুতাপ করায় কৃষ্ণ তাহাকে আশ্বস্ত করিলেন।”  বিশ্লেষণঃ উপরোক্ত  শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলার এ অংশে আমরা বুঝতে পারি যে, জরা নামক ব্যাধ শ্রীকৃষ্ণকে মৃগ বা হরিণ মনে করে বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন এবং ব্যাধ যখন তীরবিদ্ধ মৃগকে নিতে আসলেন তখন তিনি দেখলেন সেখানে কোন মৃগ নেই বরং সেখানে অসংখ্য হস্তধারী স্বয়ং বিষ্ণু শায়িত আছেন। এখান থেকে স্পষ্ট প্রমানিত হয় যে, শ্রীকৃষ্ণ কখনো কোন সাধারন মানুষ নন, তিনি হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু। সুতারাং অসুরেরা যে প্রচার করছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ জরা নামক ব্যাধের তীরে মারা গেছেন, প্রকৃতপক্ষে তা হল মিথ্যা প্রচার, কারণ শ্রীবিষ্ণু, যিনি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান, তার কখনো মৃত্যু হতে পারে না।এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে নিম্নে আলোচনা করা হয়েছে। যাহোক ব্যাধ অনেকবাহু শ্রীবিষ্ণুকে ( শ্রীকৃষ্ণ) দর্শন করা মাত্রই নিজের কর্মকে দূষ্কর্ম ও জন্ম বিষয়ে অনুতাপ করলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। এরপর দৃষ্টা তথা দেবমন্তবীর্য্যং দেবৈঃ স্বর্গং প্রাপিতস্ত্যক্তদেহ।গণৈমুনীণাং পূজিতস্তত্র কৃষ্ণো গচ্ছন্নদ্ধং ব্যাপ্য লোকান স লক্ষ্যা।। ২৫।।দিব্যং প্রাপ্তয় বাসবোহথাশ্বণৌ চ রুদ্রাদিত্যা বসবশ্চাথ বিশ্বে।প্রত্যু্যদৃযষুমুর্নয়শ্চাপি সিদ্ধা গন্ধর্বমুখ্যাশ্চ সহাপ্সরোভব।।২৬।। ততো রাজন! ভগবানুগ্রতেজা নারায়নঃ প্রভবশ্চাব্যয়শ্চ।যোগাচার্য্যো রোদসী ব্যাপ্য লক্ষ্যা স্থাং প্রাপ স্বং মহাত্মহপ্রমেয়ম।।২৭।। ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২৫-২৭ ) অনুবাদ: দেবগণ অনন্তবীর্য নারায়ণকে (শ্রীকৃষ্ণ) দর্শন করিয়া ব্যাধের দেহকে রাখিয়া ব্যাধকে স্বর্গে লইয়া গিয়াছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ আপন কান্তিদ্বারা জগৎ ব্যাপ্ত করে উর্দ্ধদিকে গমন করিতে লাগিলেন তখন মুনিগণ শ্রীকৃষ্ণের পূজা করিতে লাগিলেন।২৫।। শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গে উপস্থিত হইলে ইন্দ্র,অশ্বিনীকুমারদ্বয়,একাদশ রুদ্র,দ্বাদশ আদিত্য,অষ্টবসু, বিশ্বদেবগণ,সিগ্ধ মুনিগণ এবং অপ্সরাদের সাথে গন্ধর্বশ্রেষ্টগণ তাহার (কৃষ্ণের) প্রত্যুদ্গমন (আরাধনা) করিয়াছিলেন।২৬।। তাহার পর ভীষণতেজা, জগতের উৎপাদক, অবিনশ্বর, যোগ শিক্ষক, মহাত্মা ভগবান নারায়ন ( শ্রীকৃষ্ণ) আপন কান্তিদ্বারা স্বর্গ,মর্ত্ত্য ব্যাপ্ত করিয়া সাধারণের অর্জ্ঞেয় স্বকীয় বৈকুণ্ঠধাম গমন করিয়াছিলেন।২৭।। বিশ্লেষণ: উপরোক্ত মহাভারতের আলোচনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনেকবাহু ধারন করে স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গ এরপর তার স্বীয় চিন্ময় বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেছিলেন। এ সম্পর্কে ভাগবতেও একই তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে.. লোকাভিরামাং স্বতনুং ধারানাধ্যানমঙ্গলম। যোগধারনয়াগ্নেয়্যাদগ্ধা ধামাবিশ্য স্বকর্ম।। ( শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১১/৩১/০৬ ) অনুবাদ: “সর্বজগতের সর্বাকর্ষক বিশ্রামস্থল, এবং সর্বপ্রকারের ধ্যান ও মননের বিষয়,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার দিব্য শরীরে আগ্নেয় নামক অলৌকিক ধ্যানের প্রয়োগে দগ্ধ না করিয়া তার স্বীয় ধামে গমন করিয়াছিলেন।” পরিশেষে উপরোক্ত মহাভারত এবং শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়,পরমেশ্বর ভগবানরুপে শ্রীকৃষ্ণের কখনো মৃত্যু হয়

সনাতন ধর্মে নারী সম্মান~সমাদৃত নাকি অবহেলিত?

431876215 2430762553754079 1116997689555610999 n Svadharmam

বিধর্মীদের প্রপাগাণ্ডার ফাঁদে না পড়ে নিজ বৈদিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে রাখুন। অনেকে বলে থাকেন আমাদের ধর্ম দিয়েছে নারীকে সর্বোচ্চ সম্মান ইত্যাদি, ইত্যাদি অথচ, ঐ সমাজ সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখি বাস্তবতা ভিন্ন। আজ ভিন্ন যবন-ম্লেচ্ছ-অনার্য সংস্কৃতি চর্চায় আমাদের বৈদিক সমাজের অধঃযাত্রায় হারিয়েছে নারীর মর্যাদা। তাই সকলের সচেতনতায় ফিরে আসুক সেই সনাতন ঐতিহ্য। বৈদিক সমাজে নারীর অবস্থান সমাদৃত নাকি অবহেলিত এটা বুঝতে গেলে আমার বেদাদি শাস্ত্রের বর্ণনার দিকে তাকিয়ে দেখি নারীর অধিকার সর্বগ্রগণ্য। ♦Ladies First এটা তো বৈদিক শিক্ষা, শুনে থাকবেন নামগুলো- প্রথমেই নারীশক্তি: লক্ষ্মীনারায়ণ, রাধামাধব, রাধাকৃষ্ণ, সীতারাম ইত্যাদি। একনজরে সংক্ষিপ্তভাবে বৈদিক শাস্ত্রের কিছু উদ্ধৃতি: “বাহনে বা যানে আরোহী ব্যক্তির পক্ষে বয়স্ক ব্যক্তি, ক্লান্ত ব্যক্তি, ভারবাহী ব্যক্তি, বর, রাজা, স্নাতক এবং স্ত্রীলোকদের পথ ছেড়ে দেয়া কর্তব্য।” (মনুসংহিতা ২/১৩৮) “একজন পিতা, ভাই, পতি বা দেবর তাদের কন্যা, বোন, স্ত্রী বা ভ্রাতৃবধুকে মৃদুবাক্য, ভদ্র ব্যবহার ও উপহারাদি দ্বারা খুশি ও সন্তুষ্ট রাখবেন। যারা যথার্থ কল্যাণ ও উন্নতি চান, তারা নিশ্চিত করবেন যে, তাদের পরিবারের নারীরা যাতে সর্বদা খুশী থাকেন এবং কখনো দুর্দশা ভোগ না করেন”। (মনুসংহিতা ৩/৫৫) “যে বংশে স্ত্রীলোকেরা বস্ত্রালঙ্কারাদির দ্বারা সমাদৃত হন, সেখানে দেবতারা প্রসন্ন থাকেন। আর যে বংশে স্ত্রীলোকদের সমাদর নেই সেখানে সমস্ত ক্রিয়া (প্রার্থনা, উপাসনাদি) নিষ্ফল।” (মনুসংহিতা ৩/৫৬) “যে বংশে ভগিনী ও গৃহস্থের স্ত্রী (নারীকূল) পুরুষদের কৃতকর্মের জন্য দুঃখিনী হয়, সেই বংশ অতি শীঘ্র ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। আর যে বংশে স্ত্রীলোকেরা সন্তুষ্ট থাকে, সেই বংশ নিশ্চিতভাবেই শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে”। (মনুসংহিতা ৩/৫৭) “যে বংশকে উদ্দেশ্য করে ভগিনী, পত্নী, পুত্রবধূ প্রভৃতি স্ত্রীলোকেরা অনাদৃত, অপমানিত বা বৈষম্যের শিকার হয়ে অভিশাপ দেন, সেই বংশ বিষপান করা ব্যক্তি ন্যায় ধন-পশু প্রভৃতির সাথে সর্বতোভাবে বিনাশপ্রাপ্ত হয়।” (মনুসংহিতা ৩/৫৮) “যারা ঐশ্বর্য কামনা করে, তারা স্ত্রীলোকদের সম্মান প্রদর্শন দ্বারা খুশী রাখবে এবং উত্তম অলংকার, পোশাক ও খাদ্যদ্বারা প্রীত রাখবে। স্ত্রীজাতিকে সর্বদা পবিত্র হিসেবে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করবে।” (মনুসংহিতা ৩/৫৯) “যে স্বামী তার স্ত্রীকে সন্তুষ্ট রাখে না, সে তার সমগ্র পরিবারের জন্য দুর্দশা বয়ে আনে। আর যদি স্ত্রী পরিবারের প্রতি সুখী থাকেন, তবে সমগ্র পরিবার শোভাময় হয়ে থাকে।” (মনুসংহিতা ৩/৬২) “নববিবাহিতা বধূ, কন্যা এবং গর্ভবতী মহিলাদের অতিথি ভোজনের পূর্বেই ভোজন প্রদান করতে হবে।” (মনুসংহিতা ৩/১১৪) “নারী অপহরণকারীদের মৃত্যুদণ্ড হবে।” (মনুসংহিতা ৮/৩২৩) “যদি কোন নারীকে সুরক্ষা দেবার জন্য পুত্র বা কোন পুরুষ পরিবারে না থাকে, অথবা যদি সে বিধবা হয়ে থাকে, যে অসুস্থ অথবা যার স্বামী বিদেশে গেছে, তাহলে রাজা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন। যদি তার সম্পত্তি তার কোন বন্ধু বা আত্মীয় হরণ করে, তাহলে রাজা দোষীদের কঠোর শাস্তি দেবেন এবং সম্পত্তি ঐ নারীকে ফেরত দেবেন।” (মনুসংহিতা ৮/২৮-২৯) “যদি কেউ মা, স্ত্রী বা কন্যার নামে মিথ্যা দোষারোপ করে তবে তাকে শাস্তি দিতে হবে।” (মনুসংহিতা ৮/২৭৫) “যারা নারীদের ধর্ষণ করে বা উত্যক্ত করে বা তাদের ব্যাভিচারে প্ররোচিত করে তাদের এমন শাস্তি দিতে হবে যাতে তা অন্যদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে এবং কেউ তা করতে আর সাহস না পায়।” (মনুসংহিতা ৮/৩৫২) “যদি কেউ কোন ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া মা, বাবা, স্ত্রী বা সন্তান ত্যাগ করে, তাকে কঠিন দণ্ড দিতে হবে।” (মনুসংহিতা ৮/৩৮৯) “যে স্ত্রী দুঃশীলতা হেতু নিজে আত্মরক্ষায় যত্নবতী না হয়, তাকে পুরুষগণ ঘরে আটকে রাখলেও সে ‘অরক্ষিতা’ থাকে। কিন্তু যারা সর্বদা আপনা- আপনি আত্মরক্ষায় তৎপর, তাদের কেউ রক্ষা না করলেও তারা ‘সুরক্ষিতা’ হয়ে থাকে। তাই স্ত্রীলোকদের আটকে রাখা নিষ্ফল। স্ত্রীজাতির নিরাপত্তা প্রধানত তাদের নিজস্ব সামর্থ্য ও মনোভাবের উপর নির্ভরশীল।” (মনুসংহিতা ৯/১২) “স্ত্রী লোকেরা সন্তানাদি প্রসব ও পালন করে থাকে। তারা নতুন প্রজন্ম বা উত্তরসুরির জন্ম দেয়। তারা গৃহের দীপ্তি বা প্রকাশস্বরূপ। তারা সৌভাগ্য ও আশীর্বাদ বয়ে আনে। তারাই গৃহের শ্রী।” (মনুসংহিতা ৯/২৬) “প্রজন্ম থেকে প্রজন্মোন্তরে স্ত্রীরাই সকল সুখের মূল। কারণ, সন্তান উৎপাদন, ধর্ম পালন, পরিবারের পরিচর্যা, দাম্পত্য শান্তি এসব কাজ নারীদের দ্বারাই নিষ্পন্ন হয়ে থাকে।” (মনুসংহিতা ৯/২৮) “নারী ও পুরুষ একে ভিন্ন অপরে অসম্পূর্ণ। এজন্য বেদে বলা হয়েছে ধর্মকর্ম পত্নীর সাথে মিলিতভাবে কর্তব্য”। (মনুসংহিতা ৯/৯৬) “পতি ও পত্নী মৃত্যু পর্যন্ত একসাথে থাকবেন। তারা অন্য কোন জীবনসঙ্গী গ্রহণ করবেন না বা ব্যাভিচার করবেন না। এই হলো নারী-পুরুষের পরম ধর্ম।” (মনুসংহিতা ৯/১০১) “যারা নারী, শিশু ও গুণবান পণ্ডিতদের হত্যা করে, তাদের কঠিনতম শাস্তি দিতে হবে।” (মনুসংহিতা ৯/২৩২) “আমার পূত্র শত্রুর নাশকারী এবং নিশ্চয়রূপে আমার কন্যা বিশিষ্টরূপে তেজস্বিনী।” (ঋগবেদ: ১০।১৫৯।৩) “যেমন যশ এই কন্যার মধ্যে এবং যেমন যশ সম্যকভৃত রথের মধ্যে, ঐরূপ যশ আমার প্রাপ্ত হোক।” (ঋগবেদ: ৯।৬৭।১০) “হে বধূ! শ্বশুরের প্রতি, পতির প্রতি, গৃহের প্রতি এবং এই সব প্রজাদের প্রতি সুখদায়িনী হও, ইহাদের পুষ্টির জন্য মঙ্গল দায়িনী হও। (অথর্ববেদ: ১৪।২।২৬) হে বধু! কল্যাণময়ী, গৃহের শোভাবর্দ্ধনকারী, পতি সেবা পরায়ণা, শ্বশুরের শক্তিদায়িনী, শাশুড়ি আনন্দ দায়িনী, গৃহকার্যে নিপুণা হও। (অথর্ববেদ: ১৪।২।২৭) “হে বধূ! যেমন বলবান সমুদ্র নদী সমূহের উপর সাম্রাজ্য স্থাপন করিয়াছে, তুমিও তেমন পতিগৃহে গিয়া সম্রাজ্ঞী হইয়া থাকো। (অথর্ববেদ: ১৪।১।৪০) সবাইকে নারী দিবসে কৃষ্ণপ্রীতি ও শুভকামনা, হরেকৃষ্ণ।