জগতে আজকাল বহু দেহাত্মবুদ্ধি মূঢ় লোক নিজেকে বৈষ্ণব ঘোষণা করে বৈষ্ণবদের বৈষ্ণবত্ব, তাঁদের প্রচারক ও গুরু হওয়ার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করে। তারা প্রতিষ্ঠাশার লোভে পরনিন্দা, পরচর্চা নিয়েই ব্যস্ত অথচ স্বঘোষিত শাস্ত্রবিদ। কিন্তু বেদশাস্ত্র এইরকম ব্যক্তিদের নয় বরং কাদের বৈষ্ণব বলে পরিচয় করা হয়েছে তা জগদ্গুরু সিংহপুরুষ শ্রীশ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদ তাঁর “ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব” গ্রন্থে স্বযত্নে লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন—
“বৈষ্ণবতা দীনজনের একমাত্র সম্পত্তি। অহঙ্কার, প্রভুত্ব প্রভৃতি অবৈষ্ণবেরই প্রয়াসের বস্তুমাত্র, তাহাতে বৈষ্ণবের লোভ নাই। বৈষ্ণবের সম্পত্তি হরি। জড়াসক্তি-প্রাচুর্য্যে মত্ত এবং ব্রাহ্মণাদির সুলভ সম্মানে, পাণ্ডিত্যে ও ক্ষত্রিয়-বৈশ্যের সুলভধনাদিতে স্ফীত হইয়া নিষ্কিঞ্চন পরমহংস বৈষ্ণবের প্রতি অনাদরক্রমে কুকর্মফলে অবৈষ্ণবতা-লাভ ঘটে। দীনহীন কাঙ্গাল জড়ভোগে উদাসীন হরিসেবা-পর হরিজনগণ জড়বস্তু-সকলের অধিকারী হইবার বাসনা না করায়, ব্রাহ্মণাদি-জন্ম, ঐশ্বর্য্য, বেদাদি শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য, কন্দর্পতুল্য-রূপের অভিলাষকে অকর্মণ্য জানিয়া ভোগপর বেদপাঠনৈপুণ্যরূপ ব্রাহ্মণত্বাদি কৰ্ম্ম-বাসনা হইতে মুক্ত হইয়া হরিকথা কীর্ত্তন করিয়া থাকেন। বলা বাহুল্য, শ্রুতিপারদর্শিতা-ক্রমে ব্রাহ্মণের সম্মান, অতুল ধন-জন-রাজ্যলাভ-ফলে ক্ষত্রিয়ের ঐশ্বর্য্য এবং কৃষিবাণিজ্যফলে বৈশ্যের ধনের ও রূপের সমৃদ্ধি বৈষ্ণবতার কারণ নহে; ঐগুলি সেবোন্মুখতার অভাবে অবৈষ্ণবতার বর্দ্ধক জড়ভোগপর দামসমূহ-মাত্র বৈষ্ণবগণ তাদৃশ ক্ষুদ্র অধিকার-সমুহের জন্য ব্যস্ত না হওয়াতেই তৃণাদপি সুনীচ ও তদপেক্ষা উন্নতশির তরু অপেক্ষা সহিষ্ণু, স্বয়ং অমানী ও অপরে মানদ হইয়া হরিভক্তি লাভকরিয়াছেন। অধিক কি, আধিকারিক দেবসমূহ প্রাকৃত কৰ্ম্ম-রাজ্যে সর্ব্বোচ্চশৃঙ্গে অধিষ্ঠিত হইয়াও কৰ্ম্মসমাপ্তিতে ভগবদ্ভক্তি-প্রভাবেই বৈষ্ণবপদবী লাভ করিয়া থাকেন।”
অতএব যারা নিজেদের বৈষ্ণব বলে মনে করে, জড়জগতে সীমাবদ্ধ বর্ণাশ্রম-ধর্মের সাথে চিজ্জগতের বৈষ্ণবতার তুলনা করে, তারা নিতান্তই অল্পজ্ঞ। শাস্ত্রজ্ঞান ও শাস্ত্রের উপলব্ধি একইসাথে নাও ঘটতে পারে।
শ্রীল প্রভুপাদ ভক্তিসিদ্ধান্ত উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন—
“জগতাং গুরবো ভক্তা
ভক্তানাং গুরবো বয়ম্।
সর্ব্বত্র গুরবো ভক্তা
বয়ঞ্চ গুরবো যথা ॥
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিলেন, বৈষ্ণবই জগতের গুরু;’ আমি বৈষ্ণবের গুরু। আমি যে-প্রকার সকলের গুরু, ভক্ত-গণও তদ্রূপ সর্বজনের গুরু।
শ্রীমদ্বৈষ্ণবগণের সহিত জগতে কোন পূজ্যতম বস্তুর সাদৃশ্য নাই। বৈষ্ণব তদপেক্ষা অর্থাৎ সর্ব্বাপেক্ষা উচ্চতম আদর্শ, ইহাই শাস্ত্রসমূহের চরম সিদ্ধান্ত।”
সাধু-বৈষ্ণবের কৃপাতেই শ্রীহরির কৃপা বিদ্যমান, তাই সাধুকৃপাতে অতি অল্পবয়সেই কারো কারো মধ্যে শাস্ত্রের দৃঢ় উপলব্ধি হয়, অথচ তৈলসজ্জিত শ্মশ্রু শুভ্রবর্ণ ধারণ করলেও কারো কারো নানা শাস্ত্র অধ্যয়নের পরেও মর্মার্থ উপলব্ধি হয় না। তাই তারা ভক্তদের নিন্দা, জাতিদ্বেষ নিয়েই নিরত থাকে। এমনকি সমস্ত শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত প্রদর্শিত হলেও তা রূপরঘুনাথের দর্শনের বিরোধী বলে প্রচার করার অপচেষ্টা করে। অথচ রূপরঘুনাথাদি ষড়্গোস্বামীবর্গের অভিন্ন সিদ্ধান্ত এই, বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি করা যাবে না। “ব্রাহ্মণ ও বৈষ্ণব” গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে —
অর্চৌ বিষ্ণৌ শিলাধীগুরুষু নরমতিবৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি-বিষ্ণোর্যা বৈষ্ণবানাং কলিমলমথনে পাদতীর্থেহম্বুবুদ্ধিঃ।
শ্রীবিষ্ণোর্নান্নি মন্ত্রে সকলকলুষহে শব্দসামান্যবুদ্ধি-বিষ্ণৌ সর্বেশ্বরেশে তদিতরসমধীর্ষস্য বা নারকী সঃ ॥
নিত্যপূজ্য বিষ্ণুবিগ্রহে শিলাবুদ্ধি, বৈষ্ণব-গুরুতে মরণশীল মানব-বুদ্ধি, বৈষ্ণবে জাতিবুদ্ধি অর্থাৎ জাতিবিচার, বিষ্ণু-বৈষ্ণবের পাদোদকে জলবুদ্ধি, সকল কল্মষবিনাশী বিষ্ণুনাম-মন্ত্রে শব্দ-সামান্য-বুদ্ধি এবং সর্বেশ্বর বিষ্ণুকে অপর দেবতার সহ সম-বুদ্ধি-এই ছয়প্রকার বিচারে ভক্ত ও অভক্তের তারতম্য বৈজ্ঞানিক বা দার্শনিকভাবে সুব্যক্ত আছে।
পদ্মপুরাণের এই শ্লোকটি শ্রীভক্তিরসামৃতসিন্ধু সহ বহু গোস্বামীগ্রন্থে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু, “নিজ সৌভাগ্যোদয় না হইলে বস্তু দর্শন করিয়াও দর্শনফল-লাভে অনেক অন্যাভিলাষী, কর্মী ও জ্ঞানী স্বভাবতঃই বঞ্চিত। তাঁহাদের নিজ-নিজ বিধি-নিষেধাদির পণ্যদ্রব্যভারে তাঁহারা এরূপ ভারাক্রান্ত যে, মস্তক উত্তোলন-পূর্বক গুণাতীতবস্তু-চতুষ্টয় দর্শনের সৌভাগ্যে তাঁহারা বঞ্চিত। সেই শোচ্যজীবগণ নিজ সঙ্কীর্ণতায় আবদ্ধ থাকিয়া ভক্তিপথে অগ্রসর হইতে পারেন না। তাঁহারা জগতে ভক্তি বা ভক্ত নিতান্ত বিরল জানিয়া তল্লাভের যত্ন-পর্য্যন্ত ত্যাগ-পূর্বক নিজের অধমতাকেই বহুমানন করেন এবং ভক্তের চরণে অপরাধ করিয়া নিজের অবনতির পথ পরিষ্কার করেন মাত্র।”
বৈষ্ণবের আচারে উত্তম-কনিষ্ঠাদি তারতম্য থাকতে পারে। কিন্তু অপসম্প্রদায় বহির্ভূত তথা সৎসম্প্রদায়ে দীক্ষিত ব্যক্তি যে সংস্থারই অনুগামী হোক, তিনি বৈষ্ণব, তাতে সংশয় নেই। তাই হরিভক্তিবিলাসে’র মধ্যে এই শ্লোকটি গোস্বামীগণের দ্বারা উদ্ধৃত হয়েছে,
গৃহীত-বিষ্ণুদীক্ষাকো বিষ্ণু-পূজাপরো নরঃ।
বৈষ্ণবোহভিহিতোহভিজ্ঞৈরিতরোহম্মাদবৈষ্ণবঃ ॥
“শ্রীবিষ্ণুমন্ত্রে দীক্ষিত ও শ্রীবিষ্ণু-পূজাপরায়ণ ব্যক্তি অভিজ্ঞগণ কর্তৃক ‘বৈষ্ণব’ বলিয়া কথিত হন, তদ্ব্যতীত অপরে ‘অবৈষ্ণব’।”
অতএব বৈষ্ণবভক্তদের প্রতি দেহাত্মবুদ্ধি স্থাপন করা অবশ্যই অপরাধজনক। বৈষ্ণবেরা তো মহৎ ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেও, মহারূপবান হয়েও, পরমবিদ্বান হয়েও কখনো এর গর্ব করেন না। কেননা তাঁরা জানেন, ভক্তদের কেবল কৃষ্ণের ইচ্ছাক্রমেই বিভিন্নভাবে বিভিন্নস্থানে জন্ম হয়। কলিযুগে মহাপ্রভুর পার্ষদগণ পাণ্ডববর্জিত গঙ্গাবর্জিত স্থানে এবং নিম্নকুলে আবির্ভূত হয়ে জগদুদ্ধার করেছেন, আবার পবিত্র স্থানে মহৎকুলেও এসেছেন। এর ফলে সেই কুল ও দেশেরই উদ্ধার হয়েছে, কেননা ভাগবতের সিদ্ধান্ত অনুসারে পবিত্র স্থানের মাহাত্ম্য স্থান নয়, বরং তীর্থী বৈষ্ণবগণের ফলেই লাভ হয়। কলিযুগে মহাপ্রভুকে সহায়তা করতে বহু বহু ভক্ত সময়ে সময়ে এই জগতে আবির্ভূত হচ্ছেন। তাই যারা মহাপ্রভুর সময়কালের দৃষ্টান্তসমূহকেও দৈব বলা যায় না, বরং সর্ব সময়কালের ভক্তদেরও দৃষ্টান্তরূপে গ্রহণ করা উচিত। ভক্ত দেহ, স্থান, কাল, পাত্রের অতীত। তাই তাদের প্রতি জাতিদ্বেষ নিতান্তই অন্যায়। শ্রী সিদ্ধান্ত সরস্বতী প্রভুপাদ তাই প্রমাণ দেখিয়েছেন, যথা—
♦“স্কন্দপুরাণে— হে নৃপোত্তম, যে ভাগবত-বৈষ্ণবকে উপহাস করে, তাহার অর্থ, ধৰ্ম্ম, যশ ও পুত্রসকল নিধন প্রাপ্ত হয়। যে মূঢ়গণ মহাত্মা বৈষ্ণবগণের নিন্দা করে, মহারৌরব-সংজ্ঞক নরকে পতিত হয়। তাহারা পিতৃ-পুরুষ-সহ বৈষ্ণবগণকে যে ব্যক্তি হনন করে, নিন্দা করে, বিদ্বেষ করে, অভিবাদন করে না, ক্রোধ করে এবং দেখিলে আনন্দিত হয় না, এই ছয় ব্যবহারই তাহার পতনের কারণ।
♦অমৃতসারোদ্ধারে— বৈষ্ণবগণকে পীড়া দিলে সজ্জাতি-জন্ম-প্রভৃতি যাহা কিছু সৎকর্মার্জিত পুণ্যফল থাকে, তৎসমস্তই নষ্ট হইয়া যায়।
♦দ্বারকামাহাত্ম্যে— যে পাপিষ্ঠগণ মাহাত্মা-বৈষ্ণবগণের নিন্দা করে, তাহারা যমশাসন-প্রভাবে সুতীব্র করপত্রদ্বারা ফালিত হয়। শত শত জন্মে বিষ্ণুপূজা করিয়া থাকিলেও বৈষ্ণবের অপমানকারী দুর্বৃত্তের প্রতি বিশ্বাত্মা শ্রীহরি প্রসন্ন হন না।
♦স্কান্দে— হে মহীপাল, বৈষ্ণবকে অগ্রে সম্মানপূর্ব্বক পরে যে ব্যক্তি অবজ্ঞা করে, সে স্ববংশে বিনষ্ট হয়।
♦ব্রহ্মবৈবর্ত্তে কৃষ্ণজন্মখণ্ডে— যাহারা হৃষীকেশ বা পুণ্যাশ্রয় তাঁহার ভক্ত-বৈষ্ণবগণের নিন্দা করে, তাহাদের শতজন্মার্জিত পুণ্য নিশ্চয় বিনষ্ট হয়। সেই পাপিগণ কুম্ভীপাক-নামক মহাঘোর নরকে কীটপুঞ্জ-দ্বারা ভক্ষিত হইয়া যাবচ্চন্দ্র-দিবাকর পচ্যমান হইয়া থাকে। বৈষ্ণব-নিন্দককে দর্শন করিলে দ্রষ্টার সমুদয় পুণ্য নিশ্চয় নষ্ট হয়। তাদৃশ অবৈষ্ণবকে দর্শন করিয়া গঙ্গাস্নান-পূর্বক সূর্য্য দর্শন করিলে বিদ্বজ্জন শুদ্ধিলাভ করেন।
♦শ্রীরামানুজ বলেন, ভগবানের পূজাপেক্ষা বৈষ্ণবের পূজা উত্তম, বিষ্ণুর অপমান অপেক্ষা বৈষ্ণবের অপমান গুরুতর অপরাধ, কৃষ্ণপাদোদকাপেক্ষা ভক্তের পাদোদক অধিকতর পবিত্র। বৈষ্ণবের পূজাপেক্ষা আর অন্য পুরুষার্থ নাই। বৈষ্ণববিদ্বেষ অপেক্ষা গুরুতর অপরাধ আর কিছুই নাই; উহাতে নিজের বিনাশ হয়।
♦শ্রীচৈতন্যভাগবতে (ম ৫।১৪৫, ১০।১০২)—
যত পাপ হয় প্রজা-জনেরে হিংসিলে।
তার শতগুণ হয় বৈষ্ণবে নিন্দিলে॥
যে পাপিষ্ঠ বৈষ্ণবের জাতিবৃদ্ধি করে।
জন্ম জন্ম অধম-যোনিতে ডুবি’ মরে ॥”
অতএব আজ শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী গোস্বামী ঠাকুর প্রভুপাদের মহিমান্বিত আবির্ভাব মহোৎসবের আয়োজনে আমরা সকল বৈষ্ণবমতানুসারী ব্যক্তিদের অনুরোধ করব, বিষ্ণুনামে দীক্ষিত হরিপরায়ণ ভক্তদের নিন্দা, দ্বেষ, জাতিবুদ্ধি ত্যাগপূর্বক মহাপ্রভুর সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে হরিভজনে প্রবৃত্ত হোন। এই জগতে আমরা ক্ষণিকের অতিথি। ভক্তনিন্দায় তাই কালক্ষেপণ না করে হরিভজন করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। ইহাই শ্রী সিদ্ধান্ত সরস্বতীর উপদেশ।
হরে কৃষ্ণ
© স্বধর্মম্ ™