কেন প্রভু রামচন্দ্র অগ্নিপরীক্ষার সময় মাতা সীতাকে বাঁধা দেন নি? রামায়ণে কি অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ রয়েছে?

কেন প্রভু রামচন্দ্র অগ্নিপরীক্ষার সময় মাতা সীতাকে বাঁধা দেন নি? রামায়ণে কি অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ রয়েছে? বাল্মীকি রামায়ণে অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ রয়েছে। সাধারণ মানুষ যেনো কখনোই মাতা সীতাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে এজন্যই প্রভু শ্রীরাম চন্দ্র বাঁধা দেন নি, সেই কথাও রামায়ণে উল্লেখ রয়েছে। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীরাম চন্দ্র বললেন- অনন্যহৃদয়াং সীতাং অহমপ্যবগচ্ছামি মৈথিলীং মচ্চিত্তপরিরক্ষিণীম্। জনকাত্মজাম্।। ইমামপি বিশালাক্ষীং রক্ষিতাং স্বেন তেজসা। রাবণো নাতিবর্তেন বেলামিব মহোদধিঃ ।। প্রত্যয়ার্থং তু লোকানাং ত্রয়াণাং সত্যসংশ্রয়ঃ। উপেক্ষে চাপি বৈদেহীং প্রবিশন্তীং হুতাশনম্।। [ বাল্মিকী রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড ১১৮।১৫-১৭] অনুবাদ:- আমি (শ্রীরাম) ভালোভাবে অবগত আছি যে সীতার হৃদয় সর্বদা আমাতেই নিবদ্ধ এবং তিনি সদা আমার মনোবৃত্তির অনুসারিণী। আয়তলোচনা সীতা স্বকীয় তেজোদীপ্তিতে স্বয়ং সুরক্ষিতা। অতএব সমুদ্রের ঊর্মিমালা যেমন বেলাভূমিকে অতিক্রম করতে পারে না, সেইরূপ রাক্ষসরাজ রাবণও সীতার মর্যাদা লঙ্ঘন করতে অসমর্থ। কেবল সত্যাশ্রয়ী আমি ত্রিলোকবাসীর বিশ্বাসের জন্ম অগ্নিতে প্রবেশকারিণী সীতাকে নিবৃত্ত করিতে চেষ্টা করি নি। এছাড়াও বেদব্যাসের মহাভারতের বনপর্বেও মাতা সীতার অগ্নিপরীক্ষার বর্ণনা আছে। গোস্বামী তুলসীদাস সহ যত প্রকার লেখক রাম লীলা বর্ণনা করেছেন সর্বত্র মাতা সীতার অগ্নিপরীক্ষার উল্লেখ আছে। এতএব মাতা সীতার অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশের কোন অবকাশ নেই। শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু বেদব্যাসের বাক্য হতে প্রমাণ করেছেন, রাবণ ছায়াসীতাকে অপহরণ করেছিলো, মূল সীতা অগ্নিদেবের কাছে ছিলো। তাই মূল সীতাকে অগ্নিদেবের কাছ থেকে নিতে তিনি এরূপ অগ্নিপরীক্ষার লীলা করিয়েছেন। তথ্য সহায়তায়: শ্রীপাদ বিজয় দাস প্রভু নিবেদক: ° স্বধর্মম্ : প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
রজঃস্বলা অথবা পিরিয়ড অবস্থায় কি একাদশী ব্রত পালন করা যাবে?

রজঃস্বলা অথবা পিরিয়ড অবস্থায় কি একাদশী ব্রত পালন করা যাবে? রজঃস্বলা অবস্থায় একাদশী ব্রত পালন সম্পর্কে শ্রীহরিভক্তিবিলাসে বলা হয়েছে, শৃঙ্গি-ঋষিপ্রোক্তে চ- একাদশ্যাং ন ভুঞ্জীত নারী দৃষ্টে রজস্যপি ৷৷ ১৬ ৷৷ [ শ্রীহরিভক্তিবিলাস ১২।১৬ ] অনুবাদ: শৃঙ্গি ঋষি কথিত প্রমাণেও- নারী রজঃস্বলা অবস্থাতেও একাদশীতে ভোজন করিবে না। অর্থাৎ রজঃস্বলা অবস্থাতেও মাতাজীরা একাদশী ব্রত পালন করবেন। যে কোনো অবস্থাতেই আমাদের সবার একাদশী ব্রত পালন করা উচিত। এই ব্রত পালনে ভগবান শ্রীহরির অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন। ।। হরে কৃষ্ণ ।। নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
গর্ভপাত বা এবরশন কি অপরাধ?

গর্ভপাত বা এবরশন কি অপরাধ? এ সম্পর্কে সনাতন ধর্মে কি বলা হয়েছে ? গর্ভপাত বা গর্ভের বাচ্চা নষ্ট করা ভয়ানক অপরাধ, এ সম্পর্কে গরুড় পুরাণে, উত্তরখণ্ডের ৫ম অধ্যায়ে ৪নং শ্লোকে বলা হয়েছে, “গর্ভপাতী চ পুলিন্দো রোগবান্ ভবেন্” অর্থাৎ যে ব্যক্তি গর্ভপাত তথা গর্ভের বাচ্চা-নষ্ট করে ঐ পাপী পরবর্তী জন্মে নিম্নযোনীতে জন্মগ্রহণ করে বিভিন্ন রোগে নিমজ্জিত থাকে। এ বিভৎস হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে পরাশর স্মৃতিতে বলা হয়েছে: যৎ পাপং ব্রহ্মহত্যায়া দ্বিগুণং গর্ভপাতনে। প্রায়শ্চিত্তং ন তস্যাস্তি তস্যস্ত্যাগো বিধিয়তে।। – [ পরাশর স্মৃতি ৪।২০ ] অনুবাদ: ব্রহ্মহত্যায় যে পাপ হয়, গর্ভপাতে তার দ্বিগুণ পাপ হয়। এ পাপের কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই। যে গর্ভপাত করাবে তাকে অবশ্যই সমাজ থেকে ত্যাগ করতে হবে। তাই গর্ভের বাচ্চা নষ্ট করার মতো মহাপাপ কখনোই করা উচিত নয়। ।। হরে কৃষ্ণ ।। নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
ধর্ম কি? সনাতন ধর্ম বলতে কি বোঝায়?

ধর্ম কি? সনাতন ধর্ম বলতে কি বোঝায়? ধর্ম: অনেকে ধর্ম বলতে বিশ্বাস বলে থাকেন কিন্তু সনাতন শাস্ত্র অনুসারে ধর্ম শব্দের অর্থ কখনো বিশ্বাস নয়। কারণ বিশ্বাস নিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই যা পরিবর্তিত হয় তা কখনো ধর্ম হতে পারে না। ধর্ম শব্দটি একটি তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ, যার উৎপত্তি √ধৃ ধাতু থেকে, ধৃ ধাতুর অর্থ ধারণ করা অথবা বহন করা। অর্থাৎ যাকে ধারণ বা বহন করা হয় সেটিই হল ধর্ম। এ জগতে প্রাণহীন স্থাবর এবং প্রাণযুক্ত অস্থাবর যা কিছু আমরা চোখে দেখছি সবকিছুরই ধর্ম রয়েছে। ধর্ম ব্যতীত বস্তু বা প্রাণীর কোন অস্তিত্ব থাকতে পারে না। যেমন, জলের ধর্ম হল তরলতা, জল তার তরলতা শক্তিকে বহন করছে। জল থেকে যদি তার তরলতা শক্তিকে বিভক্ত করা হয় তাহলে জলের কোন অস্তিত্ব থাকে না। ঠিক সেরুপ অগ্নি বা আগুন। আগুনের ধর্ম হল তাপ, আগুন তার তাপশক্তিকে বহন করছে। আগুন থেকে যদি তার তাপশক্তিকে বিভক্ত করা হয় তাহলে আগুনের কোন অস্তিত্ব থাকে না, তেমনই ঠিক এ জগতের সবকিছু। সুতরাং ধর্ম হল কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর গুণ বা ক্ষমতা, যা ঐ ব্যক্তি বা বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। ঠিক সেরুপ সনাতন শাস্ত্র অনুসারে ধর্ম শব্দের অর্থ হল পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি জীবের ( মনুষ্য এবং দেবতাকূল) সেবাভাব, যা তার থেকে আলাদা করা যায় না। শ্রীমদ্ভাগবত ৬/৩/১৯ নং শ্লোকে বর্ণিত রয়েছে, “ধর্ম তু সাক্ষাদ্ভগবৎপ্রনীতং, অর্থাৎ ধর্ম সাক্ষাৎ পরমেশ্বর ভগবান দ্বারা প্রনীত বা নির্ধারিত আইন”। সুতরাং ধর্ম শব্দের অর্থ হল সনাতন শাস্ত্র অনুসারে পরমেশ্বরের দেয়া কিছু নির্দেশ বা আদেশ, যা মনুষ্য এবং দেবতাগণ যথাযথ ভাবে পালন করে পরমাত্মা ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবায় নিয়ত যুক্ত থাকতে পারেন। সনাতন ধর্ম: সনাতন শব্দের অর্থ হ’ল চিরন্তন বা শ্বাশ্বত, আবার চিরন্তন বা শ্বাশত শব্দের অর্থ হল যা পূর্বে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। সুতরাং সনাতন ধর্মের অর্থ হল এই জগৎ সৃষ্টির সূচনা থেকে বর্তমান কাল-অব্দি এবং ভবিষ্যতেও মনুষ্য এবং দেবতাগণের উপর সনাতন শাস্ত্রে উল্লেখিত পরমেশ্বর ভগবানের দেয়া এমন কিছু নির্দেশ যা যথাযথ ভাবে পালন করে পরমাত্মা ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবায় সর্বদা যুক্ত থাকতে পারে। অনেক শাস্ত্রজ্ঞানহীন পাষণ্ডী অল্প বিস্তর সনাতন শাস্ত্র পাঠ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করছে যে, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যে সনাতন ধর্ম পালন করেন, সেই সনাতন ধর্মের কথা তাদের শাস্ত্রে নাকি লেখা নেই। অথচ রামায়ণ,অযোধ্যাকাণ্ড ৩০/৩৮ নং শ্লোকে বর্ণিত রয়েছে “তথা বর্তিতুমিচ্ছামি স হি ধর্ম সনাতন।” মনুস্মৃতি ৭/৯৮ নং শ্লোকে বর্ণিত রয়েছে ,”এষোহনুপষ্কৃত প্রোক্তো যোগঃ ধর্ম সনাতন।” এবং শ্রীমদ্ভাগবত ৩/১৬/১৮ নং শ্লোকে বর্ণিত রয়েছে, “ত্বত্তঃ সনাতনো ধর্মো রক্ষ্যতে তনুভিস্তব।” ।।হরে কৃষ্ণ।। সংকলন: শ্রীমান সদগুণ মাধব দাস [ বি:দ্র: স্বধর্মম্-এর অনুমোদন ব্যাতীত এই লেখার কোনো অংশ পুনরুৎপাদন, ব্যবহার, কপি পেস্ট নিষিদ্ধ। স্বধর্মম্-এর সৌজন্যে শেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত ] নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
মনকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?

মনকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? মন সম্পর্কে অর্জুন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে বললেন – হে কৃষ্ণ ! মন অত্যন্ত চঞ্চল, শরীর ও ইন্দ্রিয় আদির বিক্ষেপ উৎপাদক, দুর্দমনীয় এবং অত্যন্ত বলবান, তাই তাকে নিগ্রহ করা বায়ুকে বশীভূত করার থেকেও অধিকতর কঠিন বলে আমি মনে করি।– [গীতা ৬।৩৪ ] . পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মন কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এ সম্পর্কে বললেন- হে মহাবাহো ! মন যে দুর্দমনীয় ও চঞ্চল তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু হে কৌন্তেয় ! ক্রমশ অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা মনকে বশীভূত করা যায়।-[ গীতা ৬।৩৫ ] অর্থাৎ প্রতিদিন মালাতে নিয়মিত নির্দিষ্ট সংখ্যক হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপের অভ্যাস এবং শাস্ত্রীয় অনুশাসন মেনে চলার তথা চার নিয়ম (সত্যম্, শৌচম্, দয়া ও তপ) পালনের বৈরাগ্যের দ্বারা মন কে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। দয়া= আমিষাহার বর্জন না করলে দয়া নষ্ট হয়। তপ= সকল প্রকার নেশা বর্জন না করলে তপস্যা করার গুণ নষ্ট হয়। শৌচম্= অবৈধ যৌনসঙ্গ বর্জন না করলে শুচিতা গুণ নষ্ট হয়। সত্যম্= দ্যূতক্রীড়া বা জুয়া খেলা বর্জন না করলে সত্য গুণ নষ্ট হয়। এই ৪ নিয়ম পালনের বৈরাগ্য এবং হরে মহামন্ত্র জপের অভ্যাস দ্বারা মন কে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
“জয় শ্রীরাম” কি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান?

“জয় শ্রীরাম” কি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান? না, এটি সকল সনাতনীদের সর্বজনীন স্লোগান। এ সম্পর্কে শ্রীমদবাল্মিকী রামায়ণে সুন্দরকাণ্ডের, ৪২ সর্গের ৩৩ শ্লোকে ভক্তশ্রেষ্ঠ হনুমান উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, “জয়ত্যতিবলো রামো অর্থাৎ, প্রভু শ্রীরামের জয় হোক”। রামায়ণে আরো উল্লেখ রয়েছে, প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালেও প্রজাদের মুখে কেবল শ্রীরামের জয়ধ্বনি শোনা যেতো- রামাে রামাে রাম ইতি প্রজানামভবৎ কথা। রামভূতং জগদভূদ্ রামে রাজ্যং প্রশাসতি।। [ শ্রীমদবাল্মিকী রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড, ১২৮।১০২] বঙ্গানুবাদ: রামরাজ্যে প্রজাবর্গের মুখে-মুখে কেবল রাম, রাম নাম এবং রামকথাই শোনা যেত। অখিল রাজ্য রামময় হয়েই থাকতো। . পদ্মপুরাণে এ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে – জয় রাঘব রামেতি জয় সূর্য কুলাঙ্গদঃ। জয় দাশরথে দেব জয়তাল্লোকনায়ক।। ইতি শূণ্বচ্ছুভাং বাচং পৌরানাং হর্ষিতাঙ্গিনাম্। রামদর্শনসচ্জাত পুলকোদ্ধেদশোভিনাম্।। [ পদ্মপুরাণ, পাতালখণ্ড, ২।৬৭,৬৮ ] বঙ্গানুবাদ: সকলেই সমস্বরে “জয় শ্রীরাঘব”, “জয় শ্রীরাম”, “জয় সূর্য বংশভূষণের জয়”, “জয় দশরথ নন্দন রাঘবের জয়”, “জয় লোকনায়ক রামচন্দ্রের জয়” ইত্যাদি প্রকারে রামচন্দ্রের জয় ঘোষণা করিতে লাগিল। অতএব “জয় শ্রীরাম” সনাতনীদের সর্বজনীন স্লোগান, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ।। হরে কৃষ্ণ ।। নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
শ্রীরামচন্দ্র কি স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন?

প্রভু শ্রীরামচন্দ্র কি স্বৈরাচারী শাসক ছিলেন? না। রামায়ণে এ সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে, প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের শাসন চলাকালীন একদা একসময় রাজ্যের প্রজারা কেমন আছেন বর্ণনা করতে, শ্রীভরত করজোড়ে প্রভু শ্রীরামচন্দ্রকে বললেন- জীর্ণানামপি সত্ত্বানাং মৃত্যুর্নায়াতি রাঘব। অরোগপ্রসবা নার্যো বওুষ্মস্তো হি মানব।।১৯।। হর্ষশ্চাভ্যধিকো রাজঞ্জনস্য পরবাসিনঃ। কালে বর্ষতি পর্জন্যঃ পাতয়ান্নমৃতং পরঃ।।২০।। বাতাশ্চাপি প্রবাস্ত্যেতে স্পর্শযুক্তাঃ সুখাঃ শিবাঃ। ঈদৃশো নশ্চিরং রাজা ভবেদিতি নরেশ্বরঃ।।২১।। কথয়ন্তি পরে রাজন্ পৌরজানপদস্তেথা। [ শ্রীমদবাল্মীকি রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড ৪১।১৯-২২] বঙ্গানুবাদ: হে রাঘব, নারীগণ বিনা কষ্টেই প্রসব করছেন। সকল মানুষকেই হৃষ্টপুষ্ট দেখা যাচ্ছে। হে রাজন্ ! পুরবাসীদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে রয়েছে। মেঘ ঠিক সময়মতো অমৃত সমান জলবর্ষণ করছে। বায়ু এমনভাবে বইছে যে, তার স্পর্শ শীতল ও সুখদায়ক মনে হচ্ছে। রাজন্ ! নগর ও জনপদের লোকে বলা-বলি করছে যে, পুরীতে চিরকাল ধরে এমনই প্রভাবশালী রাজা যেনো থাকে। . শ্রীমদ্ভাগবতে প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্ব সম্পর্কে উল্লেখ রয়েছে- নাধিব্যাধিজরাগ্লানিদুঃখশোকভয়ক্লমাঃ। মৃত্যুশ্চানিচ্ছতাং নাসীদ্ রামে রাজন্যধোক্ষজে।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ৯।১০।৫৩ ] বঙ্গানুবাদ: ভগবান শ্রীরামচন্দ্র যখন এই পৃথিবীতে রাজত্ব করেছিলেন, তখন (প্রজাদের) সমস্ত দৈনিক এবং মানসিক ক্লেশ, ব্যাধি, জড়া, সন্তাপ, দুঃখ, শোক, ভয় ও ক্লান্তি সম্পূর্ণরুপে অনুপস্থিত ছিল। এমনকি ইচ্ছা না করলে মৃত্যুও কারো কাছে উপস্থিত হতো না। . রামায়ণে যুদ্ধকাণ্ডে এ সম্পর্কে আরো উল্লেখ রয়েছে- ন পর্যদেবন্ বিধবা ন চ ব্যালকৃতং ভয়ম্। জনন ব্যাধিজং ভয়ং চাসীদ্ রামে রাজ্যং প্রশাসতি৷৷ নির্দস্যুরভবল্লোকো নানর্থং কশ্চিদস্পৃশৎ। নচস্ম বৃদ্ধা বালানাং প্রেতকার্যাণি কুর্বতে।। সর্বং মুদিতমেবাসীৎ সর্বো ধর্মপরোহভবৎ। রামমেবানুপশ্যন্তো নাভ্যহিংসন্ পরস্পরম্।। [ শ্রীমদবাল্মীকি রামায়ণ, যুদ্ধকাণ্ড ১২৮।৯৮-১০০] বঙ্গানুবাদ: প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালে কোনদিন বিধবাদের বিরহ-বিলাপ শোনা যায়নি। সর্পাদি শ্বাপদের ভয় অথবা রোগভয় কখনও প্রাদুর্ভূত হয়নি। সমগ্র রাজ্যের কোথাও চোর-ডাকাতের নাম পর্যন্ত শোনা যেত না। রাজ্যে কেউ অনর্থকারী কার্যে লিপ্ত হোত না কিংবা বৃদ্ধগণের কদাপি নবীনদের জন্য অন্ত্যেষ্টি সৎকার করার প্রয়োজন পড়ত না। সকলে সদা আনন্দে থাকত এবং ধর্মাচরণ করত। প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের শাসনে একে অন্যকে হিংসা করত না। অর্থাৎ প্রভু শ্রীরামচন্দ্রের রাজত্বকালে প্রজাদের সুখের কোনো অভাব ছিলো না। প্রজারাও চাচ্ছিলেন পুরীতে চিরকাল ধরে এমনই প্রভাবশালী রাজা যেনো থাকে। ।। হরে কৃষ্ণ ।। [ বি:দ্র: স্বধর্মম্-এর অনুমোদন ব্যাতীত এই লেখার কোনো অংশ পুনরুৎপাদন, ব্যবহার, কপি পেস্ট নিষিদ্ধ। স্বধর্মম্-এর সৌজন্যে শেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত ] নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
আমার মা একাদশী ব্রত পালন করতে চাচ্ছে, আমার বাবা প্রথম একাদশী না ধরিয়ে দিলে, একাদশী ব্রত কি পালন করা যাবে না?

আমার মা একাদশী ব্রত পালন করতে চাচ্ছে, আমার বাবা প্রথম একাদশী না ধরিয়ে দিলে, একাদশী ব্রত কি পালন করা যাবে না? শ্রীমদ্ভাগবত (৫।৫।১৮)-এ বলা হয়েছে, যিনি তাঁর আশ্রিত জনকে সমুপস্থিত মৃত্যুরূপ সংসার মার্গ থেকে উদ্ধার করতে না পারেন, তাঁর গুরু, পিতা, পতি, জননী অথবা পূজ্য দেবতা হওয়া উচিত নয়। তাই প্রত্যেক স্ত্রীর উচিত তার স্বামীকে এবং প্রত্যেক স্বামীর উচিত তার স্ত্রীকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে জীবন যাপন করতে অনুপ্রাণিত করা। তা না হলে সেই স্ত্রীর স্ত্রী হওয়া উচিত নয়, সেই স্বামীর স্বামী হওয়া উচিত নয়। . পদ্মপুরাণে উল্লেখ রয়েছে – দুর্ভাগা যা করোত্যেনাং সা স্ত্রী সৌভাগ্যমাপ্নুয়াৎ। লোকানাঞ্চৈব সর্ব্বোষাং ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী।। [ পদ্মপুরাণ, উত্তরখণ্ড, ৪৮।৪ ] বঙ্গানুবাদ: কোন দুর্ভাগা স্ত্রী যদি একাদশী ব্রত আচরণ করেন, তিনি সৌভাগ্য লাভ করেন। এই একাদশী ব্রত সর্বলোকের ভুক্তিমুক্তিপ্রদায়িনী, সর্ব্বপাপহারিণী ও গর্ভবাসনিবারিণী। . পদ্মপুরাণে আরো বলা হয়েছে- যো ন পূজয়তে দেবং রঘুনাথং রমাপতিম্। স তেন তাড্যতে দণ্ডৈর্যমস্যতি ভয়াবহৈঃ ।। অষ্টমানদ্বৎসরাদূর্দ্ধমশীতির্ব্বৎসরো ভবেৎ। তাবদেকাদশী সর্বৈৰ্ম্মানুষৈঃ কারিতামুন। ॥ [ পদ্মপুরাণ, পাতালখণ্ড, ১৯। ৬১-৬২ ] বঙ্গানুবাদ: যে ব্যক্তি রমাপতি দেব রঘুনাথকে পূজা না করে, ভগবান রামচন্দ্রই তাহাকে অতি ভীষণ যমদণ্ডে তাড়িত করেন। ৮ম বর্ষের পর যতদিন পর্যন্ত ৮০ বর্ষ পূর্ণ না হয় ততকাল যে সকল মানবেরই একাদশী ব্রত কর্ত্তব্য তাহা শ্রীরামচন্দ্রই বিধান কারিয়াছেন। অতএব, মনুষ্যমাত্র ৮ থেকে ৮০ বছর পর্যন্ত অবশ্যই একাদশী পালনীয়। ।। হরে কৃষ্ণ ।। [ বি:দ্র: স্বধর্মম্-এর অনুমোদন ব্যাতীত এই গবেষণামূলক লেখার কোনো অংশ পুনরুৎপাদন, ব্যবহার, কপি পেস্ট নিষিদ্ধ। স্বধর্মম্-এর সৌজন্যে শেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত ] নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
সদ্গুরুদেব কি আমিষ-আহারীদের দীক্ষা দেন?

সদ্গুরুদেব কি আমিষ-আহারীদের দীক্ষা দেন? এ সম্পর্কে স্কন্দ পুরাণে উল্লেখ রয়েছে – এবমাদিগুণৈর্ধূক্তং শিষ্যং নৈব পরিগ্রহেৎ। গৃহ্ণীয়াদ্যদি তদ্দোষঃ প্রায়ো গুরুম্ পস্পৃশেৎ।। অমাত্যদেষো রাজানং জায়াদোষঃ পতিং যথা। তথা শিষ্যকৃতো দোষো গুরুং প্রাপ্নোত্যসংশয়ম্।। তন্মাচ্ছিষ্যৎ গুরু-নিত্যং পরীক্ষ্যৈব পরিগ্রহেৎ। [ স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখণ্ড, মার্গশীর্ষ্যমাস মাহাত্ম্য ১৬। ১৬-১৮ ] বঙ্গানুবাদ: এই সকল গুণ (দোষ) যুক্ত মানবকে শিষ্য বলিয়া গ্রহণ করিবে না; আর এই সকল দোষের অনেকগুলি যদি গুরুকে স্পর্শ করে, তবে তাদৃশ গুরুকেও গুরু বলিয়া গ্রহণ করা কর্তব্য নহে। দেখ, যেমন অমাত্যদোষ নৃপকে এবং পত্নীদোষ পতিকে আশ্রয় করে, তদ্রূপ শিষ্যকৃত দোষও গুরুকে আশ্রয় করিয়া থাকে, সন্দেহ নাই; অতএব গুরু শিষ্যকে নিত্য পরীক্ষা করিয়া গ্রহণ করিবেন। বিশ্লেষণ: শ্রীমদ্ভাগবতে (৫/২৬/১৩)-তে উল্লেখ রয়েছে-, “যে সমস্ত নিষ্ঠুর মানুষ তাদের দেহ ধারণের জন্য এবং জিহ্বার তৃপ্তি সাধনের জন্য নিরীহ পশু-পক্ষীকে হত্যা করে রন্ধন করে, মৃত্যুর পর যমদূতেরা কুন্তীপাক নরকে ফুটন্ত তেলে তাদের পাক করে।” এই রকম পশু-পক্ষী হত্যাকারী শিষ্যকে গুরুদেব কখনো দীক্ষা দিবেন না। যদি গুরুদেব এমন শিষ্যকে দীক্ষা দেন তাহলে রাজার প্রজারা যদি অধার্মিক হয়, যেভাবে রাজাকে নরকে যেতে হয়। স্ত্রী যদি অধার্মিক হয়, চরিত্রহীন হয় সেই দোষে যেভাবে স্বামী কে নরকে যেতে হয়। ঠিক সেই রকম যথার্থ গুরু এবং যথার্থ শিষ্য না হয়, গুরুর কারণে শিষ্য নরকে যাবে এবং শিষ্যের কারণে গুরুকে নরকগামী হতে হবে। তাই যিনি সদ্গুরুদেব তিনি কখনোই আমিষ আহারী ব্যক্তিকে দীক্ষা দিবেন না, দীক্ষার আগে তিনি শিষ্যকে পরিক্ষা করে দেখবেন তিনি আমিষাশী, নেশা এবং অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত কিনা। যদি কোনো গুরুদেব এমন পাপীকে দীক্ষা দেন, বুঝতে হবে তিনি সদ্গুরুদেব নন। এমন গুরুর থেকে দীক্ষা নিলে অবশ্যই সেই গুরু সহ শিষ্য নরকে নিমজ্জিত হতে হবে। অতএব সদ্গুরুদেব কখনো আমিষাশীকে দীক্ষা দিবেন না। ।।হরে কৃষ্ণ।। . [ বি:দ্র: স্বধর্মম্-এর অনুমোদন ব্যাতীত এই গবেষণামূলক লেখার কোনো অংশ পুনরুৎপাদন, ব্যবহার, কপি পেস্ট নিষিদ্ধ। স্বধর্মম্-এর সৌজন্যে শেয়ার করার জন্য উন্মুক্ত ] নিবেদক- ° স্বধর্মম্: প্রশ্ন করুন | উত্তর পাবেন °
গুরুদেব কে? সদ্গুরুদেব চেনার উপায় কি? গুরুদেব কি পরিত্যাগ করা যায়?

গুরুদেব কে? যিনি অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলো প্রদান করে আমাদের চক্ষু উন্মোচিত করেন তিনিই গুরুদেব। গুরুদেব পরমতত্ত্ব পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধি। গুরুদেব ভগবানের মতোই পূজনীয় কিন্তু তিনি ভগবান নন। গুরুদেব নির্বাচন প্রত্যেক মনুষ্য জীবের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। মনুষ্য জীবন অত্যান্ত দূর্লভ। জীবাত্মা অনেক ভাগ্যের ফলে মানুষ্য শরীর প্রাপ্ত হয়। এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে – নৃদেহমাদ্যং সুলভং সুদুর্লভং প্লবং সুকল্পং গুরুকর্ণধারম্। ময়ানুকূলেন নভস্বতেরিতং পুমান্ ভবান্ধিং ন তরেৎ স আত্মহা।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ১১।২০।১৭ ] বঙ্গানুবাদ: জীবনের সর্ব কল্যাণপ্রদ অত্যন্ত দুর্লভ মনুষ্য দেহ, প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে আপনা থেকেই লাভ হয়ে থাকে। এই মনুষ্যদেহকে অত্যন্ত সুষ্ঠুরূপে নির্মিত একখানি নৌকার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে শ্রীগুরুদেব রয়েছেন কাণ্ডারীরূপে এবং পরমেশ্বর ভগবানের উপদেশাবলীরূপ বায়ু তাকে চলতে সহায়তা করছে, এই সমস্ত সুবিধা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি তার মনুষ্য জীবনকে ভবসমুদ্র থেকে উত্তীর্ণ হতে উপযোগ না করে, তাকে অবশ্যই আত্মঘাতী বলে মনে করতে হবে। অর্থাৎ এই দূর্লভ মনুষ্য দেহ নৌকা স্বরুপ আর গুরুদেব সেই নৌকার কাণ্ডারী। জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যে সফল হতে হলে, প্রত্যেক মনুষ্য জীবের অবশ্যই সদ্গুরুদেবের শরণাপন্ন হতে হবে। তাই সদ্গুরুদেব নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। . সদ্গুরুদেবের লক্ষণ কি? সদ্গুরুদেবের লক্ষণ সমন্ধে অথর্ববেদীয় মুণ্ডক উপনিষদে বলা হয়েছে- তদ্বিজ্ঞানার্থং স গুরুম্ এবাভিগচ্ছেৎ। সমিত পাণিঃ শ্রোত্রিয়ম্ ব্রহ্মনিষ্ঠম্।। [ মুণ্ডক উপনিষদ ১।২।১২ ] বঙ্গানুবাদ: গুরুদেব হবেন বৈদিক জ্ঞান সম্পন্ন এবং ব্রহ্মনিষ্ঠম্ অর্থাৎ পরম-পুরুষোত্তম ভগবানের সেবায় নিষ্ঠাবান, পরম সত্যের প্রতি সুদৃঢ় ভক্তিযুক্ত। বিশ্লেষণ: শ্রীকৃষ্ণই পরমব্রহ্ম যে কথা অর্জুন গীতায় (১০/১২) তে বলেছেন,“পরং ব্রহ্ম অর্থাৎ তুমিই পরমব্রহ্ম” এবং শ্রীমদ্ভাগবতে (১/২/১১) তে বলা হয়েছে, “ব্রহ্মেতি পরমাত্মেতি ভগবানিতি শব্দতে, অর্থাৎ সেই পরমতত্ত্ব শ্রীকৃষ্ণকেই মানুষ ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবান বলে থাকে”। তাই এই মন্ত্রে ব্রহ্মনিষ্ঠম্ বলতে যিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় অনুরক্ত তাকেই বুঝতে হবে। . এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে আরো বলা হয়েছে- তস্মাদ্ গুরুং প্রপদ্যেত জিজ্ঞাসুঃ শ্রেয় উত্তমম্ । শাব্দে পরে চ নিষ্ণাতং ব্রহ্মণ্যুপশমাশ্রয়ম্ ।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ১১।৩।২১ ] বঙ্গানুবাদ: যথার্থ সুখশান্তি এবং কল্যাণ আহরণে পরম আগ্রহী যেকোনো ব্যক্তিকে সদগুরুর আশ্রয় গ্রহণ এবং দীক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে তাঁর কাছে আত্মনিবেদন করতেই হবে। সদগুরুর যোগ্যতা হলো এই যে, গভীরভাবে অনুধ্যানের মাধ্যমে তিনি শাস্ত্রাদির সিদ্ধান্ত উপলব্ধি করেছেন এবং অন্য সকলকেও সেসব সিদ্ধান্ত সম্পর্কে দৃঢ়বিশ্বাসী করে তুলতে সক্ষম। এ ধরনের মহাপুরুষ, যিনি পরমেশ্বর ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করেছেন এবং সকল জাগতিক বিচার-বিবেচনা বর্জন করেছেন, তাকেই যথার্থ পারমার্থিক সদগুরুরূপে বিবেচনা করা উচিত। . এ সম্পর্কে পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে – ষটকর্ম নিপুণ বিপ্র মন্ত্র তন্ত্র বিশারদঃ। অবৈষ্ণবঃ গুরু ন স্যাৎ বৈষ্ণবঃ শ্বপচঃ গুরু।। বঙ্গানুবাদ: কোন ব্রাহ্মণ যদি ব্রাহ্মণের ছয়টি কর্মে নিপুন হয় এবং মন্ত্রতন্ত্রে বিশারদও হয়, কিন্তু সে যদি কৃষ্ণভক্ত না হয়, তাহলে সে গুরু হতে পারে না। পক্ষান্তরে চন্ডাল কুলে উদ্ভুত ব্যক্তিও যদি শুদ্ধ কৃষ্ণ ভক্ত হয় তাহলে সেই গুরু হতে পারে। . সদ্গুরু-কে এ সম্পর্কে পদ্মপুরাণে প্রভু সদাশিব বলেছেন- বিমৎসরঃ কৃষ্ণে ভক্তোহনন্য প্রয়োজনঃ। অনন্যসাধনঃ শ্রীমান্ ক্রোধলোভবিবর্জিতঃ।। শ্রীকৃষ্ণরসতত্ত্বজ্ঞঃ কৃষ্ণমন্ত্রবিদাংবরঃ। কৃষ্ণমন্তাশ্রয়ো নিত্যং মন্ত্রতক্তঃ সদা শুচিঃ॥ সদ্ধৰ্ম্মশাসকো নিত্যং সদাচারনিয়োজকঃ। সম্প্রদায়ী কৃপাপূর্ণো বিরাগী গুরুরুচ্যতে ॥ [ পদ্মপুরাণ, পাতালখণ্ড, ৫১।৬-৮ ] বঙ্গানুবাদ: যিনি শান্ত, মাৎসর্য্য-বিহীন, ও কৃষ্ণভক্ত, কৃষ্ণোপাসনা ভিন্ন যাঁহার অন্য প্রয়োজন নাই, কৃষ্ণের অনুগ্রহ ভিন্ন যাঁহার দিন অন্য প্রয়োজন নাই অর্থাৎ কৃষ্ণের অনুগ্রহকেই যিনি সংসার-মুক্তির একমাত্র উপায় স্থির করিয়াছেন, যাঁহাতে ক্রোধ বা লোভের লেশমাত্র নাই, যিনি শ্রীকৃষ্ণরসতত্ত্বজ্ঞ এবং কৃষ্ণমন্ত্রজ্ঞদিগের অগ্রগণ্য, যিনি কৃষ্ণমন্ত্র আশ্রয় করিয়া সর্বদা সেই মন্ত্রে ভক্তিমান্ হইয়া পবিত্রভাবে কালযাপন করেন, সদ্ধর্ম্মের উপদেশ প্রদান করেন, সর্বদা সদাচারে নিযুক্ত থাকেন, যিনি তা এইরূপে বৈষ্ণবসম্প্রদায়ভুক্ত দয়ালু ও সংসার-বিরাগী, তিনিই গুরুপদবাচ্য। . সেই একই সিদ্ধান্ত শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতে উল্লেখ রয়েছে- কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শূদ্র কেনে নয় । যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা, সেই ‘গুরু’ হয় ।। [ চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ৮।১২৮ ] বঙ্গানুবাদ: যিনি কৃষ্ণ-তত্ত্ববেত্তা তিনিই গুরু, তা তিনি ব্রাহ্মণ হোন, কিংবা সন্ন্যাসীই হোন অথবা শূদ্রই হোন, তাতে কিছুই যায় আসে না। . শ্রীল রূপগোস্বামী উপদেশামৃতে এভাবে বিশ্লেষণ করেছেন – বাচোবেগং মনসঃ ক্রোধবেগং জিহ্বাবেগমুদরোপস্থবেগম্। এতান বেগান যো বিষহেত ধীর সর্বামপীমাং পৃথিবীং সশিষ্যাৎ।। বঙ্গানুবাদ: যে ব্যক্তি বাক্যের বেগ, ক্রোধের বেগ, জিহ্বার বেগ, মনের বেগ, উদর এবং উপস্থের বেগ, এই ছয়টি বেগ দমন করতে সমর্থ হন তিনি পৃথিবী শাসন করতে পারেন। অর্থাৎ তিনিই গোস্বামী বা গুরুপদবাচ্য। অর্থাৎ সদ্গুরুদের অবশ্যই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা হবেন এবং সদগুরুদেবের প্রধান লক্ষণ তিনি অবশ্যই কৃষ্ণ ভক্ত হবেন। . সদ্গুরুদেব কি আমিষ-আহারীদের দীক্ষা দেন? এ সম্পর্কে স্কন্দ পুরাণে বলা হয়েছে- এবমাদিগুণৈর্ধূক্তং শিষ্যং নৈব পরিগ্রহেৎ। গৃহ্ণীয়াদ্যদি তদ্দোষঃ প্রায়ো গুরুম্ পস্পৃশেৎ।। অমাত্যদেষো রাজানং জায়াদোষঃ পতিং যথা। তথা শিষ্যকৃতো দোষো গুরুং প্রাপ্নোত্যসংশয়ম্।। তন্মাচ্ছিষ্যৎ গুরু-নিত্যং পরীক্ষ্যৈব পরিগ্রহেৎ। [ স্কন্দপুরাণ, বিষ্ণুখণ্ড, মার্গশীর্ষ্যমাস মাহাত্ম্য ১৬। ১৬-১৮ ] বঙ্গানুবাদ: এই সকল গুণ (দোষ) যুক্ত মানবকে শিষ্য বলিয়া গ্রহণ করিবে না; আর এই সকল দোষের অনেকগুলি যদি গুরুকে স্পর্শ করে, তবে তাদৃশ গুরুকেও গুরু বলিয়া গ্রহণ করা কর্তব্য নহে। দেখ, যেমন অমাত্যদোষ নৃপকে এবং পত্নীদোষ পতিকে আশ্রয় করে, তদ্রূপ শিষ্যকৃত দোষও গুরুকে আশ্রয় করিয়া থাকে, সন্দেহ নাই; অতএব গুরু শিষ্যকে নিত্য পরীক্ষা করিয়া গ্রহণ করিবেন। বিশ্লেষণ: শ্রীমদ্ভাগবতে (৫/২৬/১৩)-তে উল্লেখ রয়েছে-, “যে সমস্ত নিষ্ঠুর মানুষ তাদের দেহ ধারণের জন্য এবং জিহ্বার তৃপ্তি সাধনের জন্য নিরীহ পশু-পক্ষীকে হত্যা করে রন্ধন করে, মৃত্যুর পর যমদূতেরা কুন্তীপাক নরকে ফুটন্ত তেলে তাদের পাক করে।” এই রকম পশু-পক্ষী হত্যাকারীকে গুরুদেব কখনো দীক্ষা দিবেন না। যদি গুরুদেব এমন শিষ্যকে দীক্ষা দেন তাহলে রাজার প্রজারা যদি অধার্মিক হয়, যেভাবে রাজাকে নরকে যেতে হয়। স্ত্রী যদি অধার্মিক হয়, চরিত্রহীন হয় সেই দোষে যেভাবে স্বামী কে নরকে যেতে হয়। ঠিক সেই রকম যথার্থ গুরু এবং যথার্থ শিষ্য না হয়, গুরুর কারণে শিষ্য নরকে যাবে এবং শিষ্যের কারণে গুরুকে নরকগামী হতে হবে। তাই যিনি সদ্গুরুদেব তিনি কখনোই আমিষ আহারী ব্যক্তিকে দীক্ষা দিবেন না, দীক্ষার আগে তিনি শিষ্যকে পরিক্ষা করে দেখবেন তিনি আমিষাশী, নেশা এবং অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত কিনা। যদি কোনো গুরুদেব এমন পাপীকে দীক্ষা দেন, বুঝতে হবে তিনি সদ্গুরুদেব নন। এমন গুরুর থেকে দীক্ষা নিলে অবশ্যই সেই গুরু সহ শিষ্য নরকে নিমজ্জিত হতে হবে। . অসদ্গুরু কি ত্যাগ করা যায়? এ সম্পর্কে মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে- গুরোরপ্যবলিপ্তস্য কার্যাকার্যমজানতঃ। উৎপথপ্রতিপন্নস্য পরিত্যাগো বিধীয়তে ॥ [ মহাভারত, উদ্যোগপর্ব, ১৬৭।২৫ ] বঙ্গানুবাদ: কার্য ও অকার্যে অনভিজ্ঞ কৃষ্ণভক্তিবিরুদ্ধগামী গর্বিত আত্মশ্লাঘী গুরুকে পরিত্যাগ করাই বিধি। যদি গুরুদেব ইন্দ্রিয় তর্পণের প্রতি আসক্ত হয় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে ভক্তিযুক্ত ভগবৎসেবার পথ পরিত্যাগ করে পতনমুখী পথের দিকে ধাবিত হয়, তাহলে তাকে ত্যাগ করা উচিত। [ অর্থাৎ অসদ্গুরুকে অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। এই একই সিদ্ধান্ত স্কন্দপুরাণ, কূর্মপুরাণ, নারদ পঞ্চরাত্র শাস্ত্রেও উল্লেখ রয়েছে ] . এ সম্পর্কে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা রয়েছে – গুরুর্ন স স্যাৎ স্বজনো ন স স্যাৎ পিতা ন স স্যাজ্জননী ন সা স্যাৎ। দৈবং ন তৎস্যান্ন পতিশ্চ স স্যা-ন্ন মোচয়েদ্ যঃস মুপেতমৃত্যুম্।। [ শ্রীমদ্ভাগবত ৫।৫।১৮ ] বঙ্গানুবাদ: যিনি তাঁর আশ্রিত জনকে সমুপস্থিত মৃত্যুরূপ সংসার মার্গ থেকে উদ্ধার করতে না পারেন, তাঁর