ঈশ্বর পুরুষ নাকি নারী?
বেদের বর্ণনায় ঈশ্বর হল সাকার। তার সুন্দর রুপ বিদ্যমান। “দিবো বা বিষ্ণো উত বা পৃথিব্যা মহো বা বিষ্ণু উরোরন্তরিক্ষাৎ।উভো হি হস্তা বসুনা পূনস্বা প্রযচ্ছ দক্ষিণাদোত সব্যাদ্বিষ্ণবে দ্বা।।” –শুক্ল যজুর্বেদ ৫।১৯ অনুবাদ:- “হে ঈশ্বর ( বিষ্ণু),আপনি দ্যুলোক হইতে কি ভূলোক হইতে কিংবা অনন্ত প্রসারী অন্তরিক্ষলোক হইতে পরমধন লইয়া উভয় হস্তকে পূর্ণ করুন। আর দক্ষিণ ও বাম হস্ত দ্বারা অবাধে অবিচারে সেই পরমধন প্রদান করুন,আপনাকে প্রাপ্তির নিমিত্তে উপাসনা করি।” উপরোক্ত শুক্ল যজুর্বেদের মন্ত্রের মতোই সমগ্র বেদে অসংখ্যবার পরমেশ্বর ভগবানের সাকার রুপের বর্ণনা করা হয়েছে। এখন কেউ প্রশ্ন করতে পারে সে ঈশ্বর কি পুরুষ নাকি নারী? উত্তর হল মহাভারত – শান্তিপর্ব – ২১৮/৯০, এবং গীতা১৩/১৮ নং শ্লোক অনুযায়ী ঈশ্বর কখনো পুরুষ বা নারী কোনটি নয়, তিনি হলেন জ্ঞানস্বরুপ।বেদ শব্দের অর্থ হল জ্ঞান। বেদ শাস্ত্রে ঈশ্বর হলেন সাকার।আর বেদ শাস্ত্র অনুসারে সে ঈশ্বর হলেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা শ্রীবিষ্ণু। এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করা হয়েছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাস্ত্রে।গীতা শাস্ত্র অনুসারে সে ঈশ্বর কখনো পুরুষ বা স্ত্রী কিছুই নয়।তিনি হলেন পরম পুরুষ অথাৎ পুরুষোত্তম। ভগবদগীতা ১৩/২০ শ্লোক অনুসারে পুরুষ শব্দে জীবকে নির্দেশ করা হয়েছে। তাই ঈশ্বর সমস্ত জীবের ( পুরুষের) নিয়ন্ত্রক।তাই গীতা ১৩/২৩ শ্লোক এবং গীতা ১৫/১৮ শ্লোকে ঈশ্বরকে পরম পুরুষ বা পুরুষোত্তম রুপে বর্ননা করা হয়েছে।সেই ঈশ্বরের নামটি হল শ্রীকৃষ্ণ( গীতা ১৫/১৮)। “উপদ্রষ্টানুমন্তা চ ভর্তা ভোক্তা মহেশ্বরঃ। পরমাত্মেতি চাপ্যুক্তো দেহেহস্মিন্ পুরুষঃ পরঃ।।” – গীতা ১৩/২৩ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুবাদঃ এই শরীরে আর একজন পরম পুরুষ রয়েছেন,যিনি হচ্ছেন উপদ্রষ্টা, অনুমন্তা, ভর্তা, ভোক্তা, মহেশ্বর এবং তাকে পরমাত্মাও বলা হয়। “যো মামেবমসংমূঢ়ো জানাতি পুরুষোত্তমম্। স সর্ববিদ্ ভজতি মাং সর্বভাবেন ভারত।।” -গীতা ১৫/১৮ঃভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুবাদঃ হে ভারত! যিনি নিঃসন্দেহে আমাকে পুরুষোত্তম বলে জানেন, তিনি সর্বজ্ঞ এবং তিনি সর্বতোভাবে আমাকে ভজনা করেন। “অহং সর্ব্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্ব্বং প্রবর্ত্ততে। ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতাঃ।। গীতা ১০/৮ঃভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনুবাদ- আমি সমস্ত জগতের সৃষ্টির কারণ। আমার থেকে সমস্ত জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। জ্ঞানীরা এরুপ জেনে আমার ভজনা করেন। হরে কৃষ্ণ।প্রনাম
শ্রীকৃষ্ণের কি মৃত্যু হয়েছিল, নাকি তিনি স্বশরীরে বৈকুন্ঠে গমন করেছিলেন ?

আমাদের সমাজে কিছু শাস্ত্রজ্ঞানহীন ভগবৎ-বিদ্বেষী ব্যক্তি আছে, যারা শ্রীকৃষ্ণকে তাদের মতোই সাধারণ মানুষ মনে করে। অথচ মহাভারত শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলা হয়েছে, স্বয়ং চতুর্ভুজ বিষ্ণু বলা হয়েছে। অনুগ্রহার্থং লোকানাং বিষ্ণুলোক নমস্কৃতঃ। বসুদেবাত্তু দেবক্যাং প্রাদুর্ভূতো মহাযশাঃ।। ( মহাভারত, আদিপর্ব, ৫৮/১৩৮ ) অনুবাদ: ত্রিজগতের পূজনীয় মহাযশস্বী স্বয়ং বিষ্ণু লোকের প্রতি অনুগ্রহ করিবার জন্য বসুদেব-দেবকীতে আবির্ভূত হইয়া ছিলেন। কিন্তু তার পরেও এ সমস্ত অজ্ঞানী মানুষেরা তাদের আসুরিক মতকে প্রচার করতে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করতেছে, যা অশাস্ত্রীয়, ঘৃন্য এবং আসুরিক। অথচ মহাভারত শাস্ত্রের মৌষলপর্ব পাঠ করে আমরা সহজে জানতে পারি, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে তার অন্তর্ধানের সময় নির্ধারন করেছিলেন। তখন তিনি একটি বৃক্ষের উপর চতুর্ভূজ বিষ্ণুরুপে অবস্থান করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছার প্রভাবে শ্রীকৃষ্ণ স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গে এবং পরে বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেন। অসুরেরা যেহেতু মহাভারত শাস্ত্র উক্ত শ্রীকৃষ্ণকে বিষ্ণুরুপে মানে না, পরমেশ্বর ভগবানরুপে মানে না, তাই তারা মহাভারত শাস্ত্রের এসমস্ত জ্ঞান সাধারন মানুষের মাঝে প্রচার না করে এর বিপরীতে অশাস্ত্রীয় ভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্ধান লীলা নিয়ে অপপ্রচার করছে। নিম্নে মহাভারতের মৌষল পর্ব অবলম্বনে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা রহস্যের সত্য ইতিহাস পরিবেশিত হল…. ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলা: বৃষ্ণিবংশ বা যদুবংশ ধ্বংস হওয়ার পর- ততো গত্বা কেশবস্তুং দদর্শ রামং বনে স্থিতমেকং বিবিক্তে ॥১২৷৷ অথাপশ্যযোগযুক্তস্য তস্য নাগং মুখানিঃসরন্তং মহান্তম্। শ্বেতং যযৌ সততঃ প্রেক্ষ্যমাণে। মহার্ণবে যেন মহানুভাবঃ ॥১৩৷৷ সহস্রশীর্ষঃ পর্ব্বতাভোগবর্ষ্ম। রক্তাননঃ স্বাং তনুং তাং বিমুচ্য। সম্যক্ চ তং সাগরঃ প্রত্যগৃহ্লান্নাগা দিব্যাঃ সরিতশ্চৈব পুণ্যাঃ ॥১৪৷ ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১২-১৪ ) অনুবাদঃতাহার পর কৃষ্ণ যাইয়া নির্জন বনস্থিত একাকী বলরামকে দেখিলেন। ১২।। আরও দেখিলেন যে, যোগপ্রবৃত্ত বলরামের মুখ হইতে একটা শ্বেতবর্ণ বিশাল নাগ নির্গত হইতেছে। সেই নাগ নির্গত হইয়া মহাসমুদ্রে প্রবেশ করিল। যেহেতু, সে মহাপ্রভাবশালী ছিল। ১৩।।সহস্র মস্তক পর্ব্বতের ন্যায় বিশাল দেহ ও রক্তমুখ সেই নাগ নিজ বলরাম- দেহ পরিত্যাগ করিয়া সাগরজলে প্রবেশ করিলেন। তখন সাগরও আদরের সহিত তাঁহাকে গ্রহণ করিল এবং দিব্য নাগসমূহ ও পুণ্য নদীসকলও তাঁহাকে গ্রহণ করিল।” ১৪।। ভগবান বলরামের এরুপ অন্তর্ধানের পর:- ততো গতে ভ্রাতরি বাসুদেবো জানন্ সর্বা গতয়ো দিব্যদৃষ্টিঃ ॥১৭৷ বনে শূন্যে বিচরংশ্চিন্তয়ানো ভূমৌ চাথ সংবিবেশাগ্র্যতেজাঃ। সর্বং তেন প্রাক্ তদা চিন্ত্যমাসীদ্গান্ধাৰ্য্যা যদ্বাক্যমুক্তঃ স পূর্ব্বম ॥১৮৷৷ ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১৭-১৮) অনুবাদঃ”এইভাবে ভ্রাতা বলরাম মর্ত্যলোক হইতে প্রস্থান করিলে দিব্যজ্ঞানশালী কৃষ্ণ সকলেরই সমস্ত অবস্থা জানিতে পারিয়া চিন্তাকুল চিত্তে শূন্য বনে বিচরণ করিতে করিতে ভূতলে শয়ন করিলেন এবং পূর্ব্বে গান্ধারী যে বাক্য বলিয়াছিলেন, মহাতেজা কৃষ্ণ তখন সেই সমস্তই চিন্তা করিতে লাগিলেন।”১৭-১৮৷৷ দুর্বাসসা পায়সোচ্ছিষ্টলিপ্তে যচ্চাপ্যুক্তং তচ্চ সম্মার কৃষ্ণঃ। সঞ্চিন্তয়ন্নন্ধকবৃষ্ণিনাশং কুরুক্ষয়ঞ্চৈব মহানুভাবঃ ॥১৯৷৷ যেনে ততঃ সংক্রমণস্য কালং ততশ্চকারেন্দ্রিযসংনিরোধম্। যথা চ লোকত্রয়পালনার্থং দুর্বাসবাক্যপ্রতিপালনায় ॥২০॥ দেবোহপি সন্দেহবিমোক্ষহেতোনির্ণীত মৈচ্ছৎ সকলার্থতত্ত্ববিৎ। স সংনিরুদ্ধেন্দ্রিয়বাঙ্মনাস্ত শিশ্যে মহাযোগমুপেত্য কৃষ্ণঃ ॥২১৷ জরোহথ তং দেশমুপাজগাম লুব্ধস্তদানীং মৃগলিপ্স রুগ্রঃ। স কেশবং যোগযুক্তং শযানং মৃগাশঙ্কী লুব্ধকঃ সাযকেন ॥২২॥ জরোহবিধাৎ পাদতলে ত্বরাবাংস্তং চাভিতস্তজ্জিবৃক্ষুর্জগাম। অথাপশ্যৎ পুরুষং যোগযুক্তং পীতাম্বরং লুব্ধকোহনেকবাহুম্ ॥২৩৷৷ (মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/১৯-২৩) মহানুভাব কৃষ্ণ যদুবংশ ধ্বংস ও কুরুবংশ বিনাশ ভাবিতে থাকিয়া দুর্ব্বাসার উচ্ছিষ্ট পায়স দ্বারা ভূমি লিপ্ত করিয়া যাহা বলিয়াছিলেন, দুর্ব্বাসার সেই বাক্য স্মরণ করিলেন।১৯।।তাহার পর কৃষ্ণ সেই সময়টাই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করিলেন। পরে তিনি ত্রিভুবন পালন করিবার জন্য এবং দুর্ব্বাসার বাক্য রক্ষা করিবার নিমিত্ত ইন্দ্রিয়গণকে নিরুদ্ধ করিলেন।২০॥ সকলার্থতত্ত্বজ্ঞ কৃষ্ণও সন্দেহ দূর করিবার জন্য নিশ্চিত বিষয় কামনা করিলেন। তখন কৃষ্ণ মহাযোগ অবলম্বন করিয়া ইন্দ্রিয়, বাক্য ও মনকে নিরুদ্ধ রাখিয়া ভূতলে শয়ন করিলেন।২১॥তাহার পর উগ্রমূর্ত্তি ও হরিণলিপ্সু জরানামক এক ব্যাধ সেই সময়ে সেই স্থানে আগমন করিল এবং মৃগ মনে করিয়া বাণদ্বারা যোগযুক্ত অবস্থায় শায়িত কৃষ্ণের পদতলে বিদ্ধ করিল, পরে ত্বরান্বিত হইয়া সেই বিদ্ধ মৃগকে গ্রহণ করিতে ইচ্ছা কবিয়া তাহার নিকট গমন করিল। তদনন্তর সে দেখিল-অনেক বাহু, পীতাম্বরপরিধায়ী ও যোগযুক্ত একটা পুরুষ শায়িত রহিয়াছেন।২২-২৩॥ বিশ্লেষণঃ উপরোক্ত বর্ণনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন দর্শন করলেন বলরাম সমুদ্রে লীন হলেন তখন তিনি সেই সময়টিকেই নিজের প্রস্থানের সময় মনে করেছিলেন। অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই জড় জগত ত্যাগ করার সময় নিজেই নির্ধারণ করেছিলেন। সুতারাং যারা শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবানরুপে স্বীকার করতে চায় না, তাদের কাছে আমাদের জিজ্ঞাসা, শ্রীকৃষ্ণ যদি পরমেশ্বর ভগবান না হন, তাহলে তিনি কিভাবে জড় জগত ত্যাগের সময় নিজেই নির্ধারণ করতে পারেন? এরপর দেখা যাক, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলার পরবর্তী অংশ। মহাত্মানং ত্বপরাদ্ধং স তস্য পাদৌ জরো জগৃহে শঙ্কিতাত্মা।আশ্বাসিতঃ পুণ্যফলেন ভক্ত্যা তথানুতাপাৎ কৰ্ম্মণো জন্মনশ্চ।।২৪।। (মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২৪) অনুবাদঃ”সেই জরা নামক ব্যাধ নিজেকে অপরাধী মনে করিয়া উদ্বিগ্ন চিত্ত হইয়া শ্রীকৃষ্ণের চরণযুগল ধারণ করিল। তখন তাহার পুণ্য, ভক্তি এবং নিজের দুষ্কর্ম ও জন্ম বিষয়ে অনুতাপ করায় কৃষ্ণ তাহাকে আশ্বস্ত করিলেন।” বিশ্লেষণঃ উপরোক্ত শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্ধান লীলার এ অংশে আমরা বুঝতে পারি যে, জরা নামক ব্যাধ শ্রীকৃষ্ণকে মৃগ বা হরিণ মনে করে বাণ নিক্ষেপ করেছিলেন এবং ব্যাধ যখন তীরবিদ্ধ মৃগকে নিতে আসলেন তখন তিনি দেখলেন সেখানে কোন মৃগ নেই বরং সেখানে অসংখ্য হস্তধারী স্বয়ং বিষ্ণু শায়িত আছেন। এখান থেকে স্পষ্ট প্রমানিত হয় যে, শ্রীকৃষ্ণ কখনো কোন সাধারন মানুষ নন, তিনি হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু। সুতারাং অসুরেরা যে প্রচার করছেন যে, শ্রীকৃষ্ণ জরা নামক ব্যাধের তীরে মারা গেছেন, প্রকৃতপক্ষে তা হল মিথ্যা প্রচার, কারণ শ্রীবিষ্ণু, যিনি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান, তার কখনো মৃত্যু হতে পারে না।এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে নিম্নে আলোচনা করা হয়েছে। যাহোক ব্যাধ অনেকবাহু শ্রীবিষ্ণুকে ( শ্রীকৃষ্ণ) দর্শন করা মাত্রই নিজের কর্মকে দূষ্কর্ম ও জন্ম বিষয়ে অনুতাপ করলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন। এরপর দৃষ্টা তথা দেবমন্তবীর্য্যং দেবৈঃ স্বর্গং প্রাপিতস্ত্যক্তদেহ।গণৈমুনীণাং পূজিতস্তত্র কৃষ্ণো গচ্ছন্নদ্ধং ব্যাপ্য লোকান স লক্ষ্যা।। ২৫।।দিব্যং প্রাপ্তয় বাসবোহথাশ্বণৌ চ রুদ্রাদিত্যা বসবশ্চাথ বিশ্বে।প্রত্যু্যদৃযষুমুর্নয়শ্চাপি সিদ্ধা গন্ধর্বমুখ্যাশ্চ সহাপ্সরোভব।।২৬।। ততো রাজন! ভগবানুগ্রতেজা নারায়নঃ প্রভবশ্চাব্যয়শ্চ।যোগাচার্য্যো রোদসী ব্যাপ্য লক্ষ্যা স্থাং প্রাপ স্বং মহাত্মহপ্রমেয়ম।।২৭।। ( মহাভারত, মৌষলপর্ব ৪/২৫-২৭ ) অনুবাদ: দেবগণ অনন্তবীর্য নারায়ণকে (শ্রীকৃষ্ণ) দর্শন করিয়া ব্যাধের দেহকে রাখিয়া ব্যাধকে স্বর্গে লইয়া গিয়াছিলেন এবং শ্রীকৃষ্ণ আপন কান্তিদ্বারা জগৎ ব্যাপ্ত করে উর্দ্ধদিকে গমন করিতে লাগিলেন তখন মুনিগণ শ্রীকৃষ্ণের পূজা করিতে লাগিলেন।২৫।। শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গে উপস্থিত হইলে ইন্দ্র,অশ্বিনীকুমারদ্বয়,একাদশ রুদ্র,দ্বাদশ আদিত্য,অষ্টবসু, বিশ্বদেবগণ,সিগ্ধ মুনিগণ এবং অপ্সরাদের সাথে গন্ধর্বশ্রেষ্টগণ তাহার (কৃষ্ণের) প্রত্যুদ্গমন (আরাধনা) করিয়াছিলেন।২৬।। তাহার পর ভীষণতেজা, জগতের উৎপাদক, অবিনশ্বর, যোগ শিক্ষক, মহাত্মা ভগবান নারায়ন ( শ্রীকৃষ্ণ) আপন কান্তিদ্বারা স্বর্গ,মর্ত্ত্য ব্যাপ্ত করিয়া সাধারণের অর্জ্ঞেয় স্বকীয় বৈকুণ্ঠধাম গমন করিয়াছিলেন।২৭।। বিশ্লেষণ: উপরোক্ত মহাভারতের আলোচনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অনেকবাহু ধারন করে স্বশরীরে প্রথমে স্বর্গ এরপর তার স্বীয় চিন্ময় বৈকুন্ঠ জগতে প্রবেশ করেছিলেন। এ সম্পর্কে ভাগবতেও একই তথ্য পরিবেশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে.. লোকাভিরামাং স্বতনুং ধারানাধ্যানমঙ্গলম। যোগধারনয়াগ্নেয়্যাদগ্ধা ধামাবিশ্য স্বকর্ম।। ( শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১১/৩১/০৬ ) অনুবাদ: “সর্বজগতের সর্বাকর্ষক বিশ্রামস্থল, এবং সর্বপ্রকারের ধ্যান ও মননের বিষয়,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার দিব্য শরীরে আগ্নেয় নামক অলৌকিক ধ্যানের প্রয়োগে দগ্ধ না করিয়া তার স্বীয় ধামে গমন করিয়াছিলেন।” পরিশেষে উপরোক্ত মহাভারত এবং শ্রীমদ্ভাগবতের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়,পরমেশ্বর ভগবানরুপে শ্রীকৃষ্ণের কখনো মৃত্যু হয়
ঈশ্বরের সমার্থক শব্দরুপে “ভগবান” শব্দটি কেন যুক্তিযুক্ত?

বেদ সহ সমগ্র সনাতনী শাস্ত্রে ঈশ্বরকে সাকার বলা হয়েছে।ঈশ্বর সাকার,কেননা ঈশ্বরের আকার বা রুপ বা ইন্দ্রিয় রয়েছে।অথাৎ ঈশ্বরের মস্তক( মাথা),চক্ষু( চোখ),হস্ত( হাত),পদ( পা) ইত্যাদি সমস্ত ইন্দ্রিয় বা আকার বা রুপ রয়েছে। “হিরন্ময়েন পাত্রেন সত্যস্যাহপিহিতং মুখম। তৎ ত্বং পুষন্নপাবৃনু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে।।” –ঈশোপনিষদঃ ৬(শুক্ল যজুর্বেদ) অনুবাদঃ হে প্রভু,হে সর্বজীবপালক,আপনার উজ্জ্বল জ্যোতির দ্বারা আপনার শ্রীমুখ আচ্ছাদিত।কৃপা করে সেই আচ্ছাদন দূর করুন এবং যাতে আমরা আপনাকে দেখতে পারি। সমগ্র সনাতনী শাস্ত্রে সেই এক ঈশ্বরকে ভগবান( ষড়ৈশ্বর্যময় প্রভু), পরমব্রহ্ম ( সর্বব্যাপ্ত প্রভু),পরমাত্মা( সর্ব জীবের হৃদয়ে অবস্থিত প্রভু),পরমেশ্বর( পরম ঈশ্বর) , মহেশ্বর ( মহান ঈশ্বর) ইত্যাদি নামে সম্বোধন করা হয়েছে।একইসাথে বেদসহ সমগ্র সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে সে ঈশ্বর বা পরমেশ্বর বা ভগবান হলেন শ্রীকৃষ্ণ। কিন্তু তারপরও আজকাল কিছু শাস্ত্র জ্ঞানহীন অন্ধ ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করছে শ্রীকৃষ্ণ হলেন ভগবান কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বর বা পরমেশ্বর নন। তাদের দৃষ্টিতে ভগবান এবং ঈশ্বর নাকি ভিন্ন শব্দ। তারা অপপ্রচার করছে ঈশ্বর মানে সৃষ্টিকর্তা আর ভগবান মানে নাকি মহাত্মা।তাদের এ ধরনের উদ্ভট কথা সনাতনী শাস্ত্রে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।তাদের এ ধরনের কথা শুনলে আমাদের হাসি পায়।কারন সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে আমরা যখন ভগবান শব্দটিকে বিশ্লেষণ করি তখন দেখতে পায়,এই ভগবান শব্দটি ঈশ্বর বা পরমেশ্বরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভগবানঃ“ভগ”শব্দের অর্থ হল ষড়ৈশ্বর্য, এবং দ্বিতীয় অংশ “বান” যার আভিধানিক অর্থ হল অধিকারী।সুতরাং সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর হলেন ষড়ৈশ্বর্যের পূর্ণ অধিকারী,আর তাই সে ঈশ্বর বা পরমেশ্বরকে ভগবান বলা হয়।বিষ্ণু পুরাণ শাস্ত্রে ভগবান শব্দটি সম্পর্কে বলা হয়েছে – “ঐশ্বর্য্যস্য সমগ্রস্য বীর্যস্য যশসঃ শ্রিয়ঃ। জ্ঞানবৈরাগ্যয়োশ্চৈব ষন্নৎ ভগ ইতিঙ্গনা।।” -(বিষ্ণুপুরাণ ৬/৫/৭৪) অনুবাদঃ “যার মধ্যে সমস্ত ঐশ্বর্য(সম্পদ), সমস্ত বীর্য (শক্তি), সমস্ত যশ(খ্যাতি), সমস্ত শ্রী (ধনসম্পদ), সমস্ত জ্ঞান, সমস্ত বৈরাগ্য এই ছয়টি বিষয় পূর্ণ মাত্রায় বর্তমান তিনিই হচ্ছেন ভগবান।” ঈশ্বরঃ সংস্কৃতে “ঈশ্বর” শব্দের ধাতু মূল “ঈশ্”, যার অর্থ হল মালিক, শাসক,নিয়ন্ত্রক। দ্বিতীয় অংশ ‘বর’ যার আভিধানিক অর্থ হল “সর্বশ্রেষ্ঠ”।সুতারাং “ঈশ্বর” শব্দের অর্থ হলো– যিনি সমস্ত কিছুর মালিক/নিয়ন্ত্রক/ সৃষ্টিকর্তা। সুতারাং যিনি ঈশ্বর বা পরমেশ্বর ( পরম ঈশ্বর)বা মহেশ্বর ( মহান ঈশ্বে) বা পরম ব্রহ্ম বা পরমাত্মা তাকে ভগবান বলা হয়। কারন “ভগ” শব্দে ষড়ৈশ্বর্যকে নির্দেশ করা হয়েছে। ষড়ৈশ্বর্যের প্রথমটি হল, “সমগ্র ঐশ্বর্য” ( সমগ্র সম্পদ)-এ জগতের সমস্ত সম্পদের মালিকানা একমাত্র ঈশ্বরই দাবী করতে পারেন।ঠিক তেমনই “সমগ্র বীর্য” বা সমস্ত শক্তি,” সমগ্র শ্রী” বা সমস্ত সৌন্দর্য, “সমগ্র জ্ঞান”, “সমগ্র যশ”(খ্যাতি),”সমগ্র বৈরাগ্য” শুধু মাত্র ঈশ্বরই দাবী করতে পারেন।তাই ঈশ্বরকে সনাতনী শাস্ত্রে ভগবান বলা হয়েছে। তাঁর প্রথম প্রমান হল কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ।যেখানে সর্বব্যাপী পরমব্রহ্ম এবং সমস্ত জীবের হৃদয়ে অবস্থানকারী পরমাত্মা পরম ঈশ্বরকে ভগবান বলা হয়েছে। সর্বাননশিরোগ্রীবঃ সর্বভূতগুহাশয়ঃ। সর্বব্যাপী স ভগবান্ তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ।।১১।। – শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ৩/১১(কৃষ্ণ যজুর্বেদ) শব্দার্থঃ সর্বাননশিরোগ্রীবঃ = সর্বদিকে মুখ, মস্তক ও গ্রীবা, সর্বভূতগুহাশয়ঃ =সকল প্রাণীর হৃদয় গুহায় অন্তর্যামী রূপে অবস্থান করেন। সর্বব্যাপী= সর্বব্যাপক, সঃ =তিনি, ভগবান= ভগবান, তস্মাৎ= এইজন্য, সর্বগতঃ= সর্বত্র অবস্থিত, শিবঃ= পরম মঙ্গলময়। অনুবাদ:-” ঈশ্বর সর্বানন শিরোগ্রীব,অথাৎ সর্বদিকে ঈশ্বরের মুখ, মস্তক ও গ্রীবা বর্তমান।তিনি সকলের হৃদয় গুহায় অন্তর্যামীরুপে অবস্থান করেন তাই তিনি সর্বভূত গুহাশয়। তিনি সর্বব্যাপক তাই তিনি ভগবান ও মঙ্গলময়।” সুতারাং সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে যিনি ঈশ্বর বা পরমেশ্বর তাঁর একটি সমার্থক শব্দ হল ভগবান।এর আরো প্রমান পাই বেদ/শ্রুতিসহ মহাভারত, গীতা, অষ্টাদশ পুরান এবং পঞ্চরাত্র ইত্যাদি শাস্ত্রে।এছাড়াও বেদসহ সমগ্র সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ হলেন পরমেশ্বর। শ্রীকৃষ্ণকে বেদসহ সমগ্র সনাতনী শাস্ত্রে ঈশ্বর, পরমাত্মা,পরমব্রহ্ম শব্দে যেমন সম্বোধন করা হয়েছে ঠিক তেমনই তাকেই ভগবান শব্দে সম্বোধন করা হয়েছে। তস্মাদ্ভারত সর্বাত্মা ভগবানীশ্বরো হরিঃ। শ্রোতব্যঃ কীর্তিতব্যশ্চ স্মর্তব্যশ্চেচ্ছতাভয়ম্ ॥৫॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ২/১/৫) শব্দার্থঃ-তস্মাৎ=এই কারণে; ভারত=হে ভরত বংশীয়, সর্বাত্মা=পরমাত্মা; ভগবান্ = ভগবান, ঈশ্বর=নিয়ন্তা, হরিঃ-শ্রীহরি(শ্রীকৃষ্ণ),শ্রোতব্য=শ্রবণীয়; কীর্তিতব্য=কীর্তনীয়; চ=ও: স্মর্তব্যঃ=স্মরণীয়: চ= এবং; ইচ্ছতা=ইচ্ছুক; অভয়ম্= ভয় থেকে মুক্তি। অনুবাদ “হে ভারত, এই কারনে সমস্ত ভয় থেকে যারা মুক্ত হতে ইচ্ছা করেন তাদের অবশ্যই পরম নিয়ন্তা(ঈশ্বর) পরমাত্মা(সর্বাত্মা) ভগবান (ষড়ৈশ্বর্যময় পরমপুরুষ) শ্রীহরির (শ্রীকৃষ্ণ) কথা শ্রবণ, কীর্তন এবং স্মরণ করতে হবে।” অর্জুন উবাচ।”পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্।পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভুম্।।আহুস্ত্বামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষিনারদস্তথা।অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে।।” – (গীতা ১০/১২-১৩ঃ অর্জুন) শব্দার্থঃ অর্জুন উবাচ =অর্জুন বললেন।পরম্ ব্রহ্ম= পরমব্রহ্ম; পরম ধাম=পরম ধাম,পবিত্রম= পবিত্র; পরমম্=পরম; ভবান= তুমি; পুরুষম্=পুরুষ, শাশ্বতম্ =সনাতন; দিব্যম্ =দিব্য; আদি দেবম=আদি দেব; অজম্ =জন্মরহিত; বিভুম্=মহত্তম।আহুঃ=বলেন; ত্বাম্=তোমাকে; ঋষয়ঃ =ঋষিগণ; সর্বে=সমস্ত; দেবর্ষিঃ=দেবর্ষি; নারদ=নারদ,তথা=ও; অসিতঃ= অসিত; দেবলঃ=দেবল,ব্যাসঃ=ব্যাসদেব; স্বয়ম্= তুমি নিজে; চ=ও, এব=অবশ্যই; ব্রবীমি=বলছ; মে=আমাকে। অনুবাদঃ” অর্জুন বললেন- তুমি (শ্রীকৃষ্ণ)পরমব্রহ্ম(পরমেশ্বর), পরম ধাম, পরম পবিত্র ও পরম পুরুষ। তুমি নিত্য, দিব্য, আদি দেব, অজ ও বিভু। দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল, ব্যাস আদি ঋষিরা তোমাকে সেভাবেই বর্ণনা করেছেন এবং তুমি নিজেও এখন আমাকে তা বলছ।” শ্রীভগবানুবাচ। বহুনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন। তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেথ পরন্তপ ।। ৫।।অজোহপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন্। প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া ।। ৬।। শব্দার্থঃশ্রীভগবান উবাচ = ভগবান বললেন; বহুনি=বহু, মে=আমার; ব্যতীতানি=অতিবাহিত হয়েছে; জন্মানি= জন্মসমূহ; তব= তোমার; চ=ও; অর্জুন=হে অর্জুন; তানি=সেই সমস্ত; অহম্=আমি; বেদ=জানি; সর্বাণি=সমস্ত; ন=না; ত্বম্=তুমি; বেথ= জান; পরন্তপ= হে শত্রুদমনকারী।অজ=জন্মরহিত; অপি=যদিও; সন্=হয়েও; অব্যয়=অক্ষয়; আত্মা=দেহ; ভূতানাম্=জীবসমূহের, ঈশ্বর=ঈশ্বর/পরমেশ্বর; অপি= যদিও; সন্=হয়েও; প্রকৃতিম্=চিন্ময় রূপে; স্বাম্=আমার; অধিষ্ঠায়=অধিষ্ঠিত হয়ে; সম্ভবামি=আবির্ভূত হই; আত্মমায়য়া=আমার অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা। অনুবাদ-“ভগবান বললেন(শ্রীকৃষ্ণ), হে পরন্তপ অর্জুন, আমার ও তোমার বহু জন্ম অতিবাহিত হয়েছে। আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি, কিন্তু তুমি পার না।যদিও আমি জন্মরহিত( আমার জন্ম নাই), আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় এবং যদিও আমি সর্বভূতের (সমস্ত জীবের) ঈশ্বর, তবুও আমার অন্তরঙ্গা শক্তিকে আশ্রয় করে আমি আমার আদি চিন্ময় রূপে যুগে যুগে অবতীর্ণ হই।” একো বশী সর্বগঃ কৃষ্ণ ঈড্যঃ” –গোপালতাপনী উপনিষদ ১/২১(অথর্ববেদ) অনুবাদঃ”সেই একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই পরম পুরুষোত্তম ভগবান,তিনিই আরাধ্য।” “ব্রহ্মন্যো দেবকীপুত্রঃ” –নারায়ন উপনিষদ ৪( কৃষ্ণ যজুর্বেদ) অনুবাদঃ “দেবকীপুত্র শ্রীকৃষ্ণই পরমব্রহ্ম (পরমেশ্বর)” “এষ বৈ ভগবান সাক্ষাদাদ্যো নারায়ন পুমান। মোহয়ন্মায়য়া লোকং গূঢ়শ্চতি বৃষ্ণিষু।।” –(শ্রীমদ্ভাগবত পুরানঃ১/৯/১৮,ভীষ্মদেব) অনুবাদঃ”তোমাদের মাঝে দন্ডায়মান এই কৃষ্ণ সাক্ষাৎ ভগবান, তিনি আদি নারায়ন। কিন্তু তিনি তার নিজের সৃষ্ট মায়া শক্তির প্রভাবে আমাদের মুগ্ধ করে বৃষ্ণিকূলের একজনের মত হয়ে আমাদের মাঝে বিচরন করছেন।” “ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ। অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্ব কারণকারণম্।।” –(ব্রহ্মসংহিতা ৫/১, ব্রহ্মা) অনুবাদঃ”কৃষ্ণ পরম ঈশ্বর। তার দেহ সচ্চিদানন্দময়। তিনি অনাদি ও আদি। তিনিই সর্ব্ব কারণের কারণ, তিনিই গোবিন্দ।” অনেকে প্রশ্ন করেন,এক সৃষ্টিকর্তাকে যদি ঈশ্বর এবং ভগবান বলা হয়, তাহলে সনাতনী শাস্ত্রে তো বিভিন্ন স্থানে ব্রহ্মা, শিব সহ অনেক মহান দেবদেবীদেরকেও ঈশ্বর বলা হয়েছে, তারা কি আদৌ ঈশ্বর ? এর উত্তর হল সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে প্রকৃতির বিভিন্ন বিভাগের,যেমনঃব্রহ্মা- সৃষ্টি, শিব-ধ্বংস, ইন্দ্রদেব-স্বর্গ এবং বৃষ্টি ,বরুনদেব-জল,অগ্নিদেব- অগ্নি,সূর্যদেব- আলো, সরস্বতী-বিদ্যা, কার্তিক – দেবতাদের সেনাপতি,দুর্গা-শক্তি,লক্ষ্মী-ধনসম্পদ ইত্যাদি দেবদেবীগণ হলেন এক একটি গুণের অধিপতি বা ঈশ্বর বা ঈশ্বরী বা ক্ষমতাধর,কিন্তু তারা প্রকৃতির সমস্ত বিভাগের একক ক্ষমতাধর বা ঈশ্বর নন।তাই সনাতনী শাস্ত্রে তাদেরকে সন্মানসূচক ঈশ্বর শব্দে বিভিন্ন মুনি ঋষিরা সম্বোধন করেছেন।কিন্তু তাদেরকে কেউ পরম ঈশ্বর /পরমেশ্বর বলে সম্বোধন করে নি।পরমেশ্বর হলেন একজন, যার নাম শ্রীকৃষ্ণ, যিনি প্রকৃতির বিভিন্ন
ঈশ্বর এক (একজন)নাকি বহু?

ঈশ্বর সর্বশক্তিমান। তিনি অনাদির আদি।তিনি সর্বব্যাপী। তিনি এই সমগ্র জগৎ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আবার এই জগৎকে পালন করছেন,পুনরায় তিনিই আবার এই জগৎকে ধ্বংস করবেন। তাকে সনাতনী শাস্ত্রে ভগবান,পরমব্রহ্ম,পরমাত্মা, পরমেশ্বর বলা হয়েছে। বেদসহ সমগ্র সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে সেই ঈশ্বর হলেন সাকার।অথাৎ ঈশ্বরের মস্তক(মাথা),চক্ষু (চোখ),হস্ত(হাত),পদ(পদ) ইত্যাদি সমস্ত ইন্দ্রিয় বিদ্যমান। দিবো বা বিষ্ণো উত বা পৃথিব্যা মহো বা বিষ্ণু উরোরন্তরিক্ষাৎ। উভো হি হস্তা বসুনা পূনস্বা প্রযচ্ছ দক্ষিণাদোত সব্যাদ্বিষ্ণবে দ্বা।। – (শুক্ল যজুর্বেদ ৫।১৯) অনুবাদঃ “হে বিষ্ণু(ঈশ্বর),তুমি দ্যুলোক অথবা ভূলোক হতে কিংবা মহান বিস্তৃত অন্তরিক্ষলোক হতে, তোমার উভয় হস্ত ধনের দ্বারা পূর্ণ কর। এবং দক্ষিণ অথবা বাম হস্তে আমাদের তা দান কর।” বেদ,রামায়ন,মহাভারত, অষ্টাদশ পুরান, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ইত্যাদি শাস্ত্র অনুসারে ঈশ্বর একজন।তথাপি তিনি তার অনন্ত শক্তির প্রভাবে বহুরুপে এবং বহুনামে নিজেকে প্রকাশ করেন। সমগ্র সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে সে এক পরমেশ্বর হলেন শ্রীকৃষ্ণ। তিনি বিষ্ণু, রাম,বলরাম,বামন,নৃসিংহ, বরাহ,কূর্ম ইত্যাদি বহুরুপে নিজেকে প্রকাশ করেন।একটি মাটির প্রদীপের অগ্নি থেকে বহু বহু মাটির প্রদীপে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হলেও, সমস্ত প্রদীপকে দেখতে যেমন ভিন্ন ভিন্ন মনে হয়,কিন্তু তারপরেও প্রতিটি প্রদীপই যেমন এক অগ্নি,ঠিক তেমনই এক পরমেশ্বর ভগবান হলেন শ্রীকৃষ্ণ, তিনি তার অনন্ত শক্তির প্রভাবে বিষ্ণু,রাম, বলরাম,নৃসিংহ ইত্যাদি বহুরুপে প্রকাশিত বা আবির্ভূত হলেও মূলত তারা এক পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। “একো বশী সর্বভূতান্তরাত্মা একং রূপং বহুধা যঃ করোতি।” একক বশকর্তা, সর্ব জীবের অন্তরাত্মা, সেই পরমেশ্বর এক তথাপি তিনি বহু রূপ ধারন করেছেন। -কঠোপনিষৎ- ২/২/১২ ( কৃষ্ণ যজুর্বেদ) “সহস্রং স একমুখো” ঈশ্বরের সহস্র রূপ তথাপি তিনি এক। -অথর্ববেদ ৯/৪/৯ “সহস্রস্য প্রতিমা বিশ্বরুপম।।” এক পরম ঈশ্বরের অসংখ্য রুপের প্রতিমা বা মূর্তি বা রুপ রয়েছে। – শুক্ল যজুর্বেদঃ ১৩/৪১ “তদৈক্ষত বহুস্যাং প্রজায়েয়তি” –পরমেশ্বর বহু রুপে নিজেকে বিস্তার করেন। -ছান্দোগ্য উপনিষদ ৬/২/৩( সামবেদ) “অজায়মানো বহুধা বিজায়তে” –সেই পরমেশ্বর যদিও জন্মরহিত তথাপিও তিনি বহুরুপে জন্মগ্রহণ করেন। -শুক্ল যজুর্বেদ -৩১/১৯,তৈত্তিরীয় আরন্যক ৩/১৩/১ “যে ত্রিষপ্তাঃ পরিয়ন্তি বিশ্বরুপানি বিভ্রতঃ। বাচষ্পতির্বলা তেষা তন্বো অদ্য দধাতু মে।।” – অথর্ববেদ ১/১/১ অনুবাদঃ”যিনি (যে) স্বর্গ, মত্য এবং পাতাল এই তিন লোক (ত্রিষপ্তা) জুড়ে পরিব্যাপ্ত ( পরিয়ন্তি),সেই ঈশ্বর বহুরূপ (বিশ্বরুপানি) ধারী ( বিভ্রত)। সে ঈশ্বর (বাচষ্পতি) তাহার শক্তি ( বলা তেষা) আমার শরীরে ( তন্বো) তিনি আমাকে দান করুন ( অদ্য দধাতু মে)।” “রুপং রুপং প্রতিরুপো বভূব তদস্য রুপং প্রতিচক্ষণায়। ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরুপ ঈয়তে যুক্তা হ্যস্য হরয়ঃ শতা দশ।।” -ঋগ্বেদ ৬/৪৭/১৮ অনুবাদঃ “ঈশ্বর (ইন্দ্র), বিভিন্ন রুপ বা দেহ ধারন করেন। এবং সে রুপ ধারন করে তিনি পৃথকভাবে প্রকাশিত হন।তিনি তার অন্তরঙ্গা শক্তি দ্বারা বিবিধ রুপ ধারন করে যজমানগণের নিকট উপস্থিত হন।কারন তার রথ সহস্র অশ্ব সংযুক্ত(অনন্ত শক্তি), অথাৎ তিনি অসীম ক্ষমতার অধিকারী।” “একো দেবো নিত্যলীলানুরক্তো ভক্তব্যাপী হৃদ্যন্তরাত্মা” -(পুরুষবোধিনী উপনিষদ) অনুবাদঃ -“এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর ভগবান নানা দিব্যরুপে তার শুদ্ধ ভক্তদের সঙ্গে লীলা সম্পাদনে নিত্য অনুরক্ত।” একই কথা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতার ৪/৬,৭,৮ নং শ্লোকে বর্ণনা করেন.. “অজোহপি সন্নব্যায়িত্মা ভূতানামীশ্বরোহপি সন। প্রকৃতিং স্বামহধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।। যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানি ভবতি ভারত।অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম।।পরিত্রানায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম।ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।।জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোহর্জুন।।” – (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪/৬,৭,৮,৯) অনুবাদঃ “হে অর্জুন, যদিও আমি সমস্ত জীবের ঈশ্বর,যদিও আমার জন্ম নেই ( অজ)এবং আমার চিন্ময় দেহ অব্যয় ।তবুও আমি আমার অন্তরঙ্গ শক্তিকে আশ্রয় করে অবতীর্ণ হই।যখনই জগতে ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের পরিমান বেড়ে যায়,তখনই সাধুদের (ভক্ত) রক্ষা ও দুষ্কৃতিকারীদের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপন হেতু যুগে যুগে অবতীর্ন হই।হে অর্জুন! যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম ও কর্ম যথাযথভাবে জানেন, তাঁকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্মগ্রহণ করতে হয় না, তিনি আমার নিত্য ধাম ( চিন্ময় জগৎ) লাভ করেন।” এছাড়াও এ সম্পর্কে অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদে বলা হয়েছে – একো বশী সর্বগঃ কৃষ্ণ ঈড্য একোহপি সন্ বহুধা হো বিভাতি। -গোপালতাপনী উপনিষদ ১/২১ (অথর্ববেদ) অনুবাদঃ একমাত্র শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান এবং তিনিই আরাধ্য।তিনি এক,কিন্তু তিনি অনন্ত রুপ এবং অবতারের মাধ্যমে প্রকাশিত হন।” ব্রহ্মসংহিতা শাস্ত্রেও এ সম্পর্কে বলা হয়েছে – দীপার্চ্চিরেব হি দশান্তরমভ্যুপেত্য দীপায়তে বিবৃতহেতুসমানধৰ্ম্মা। যস্তাদৃগেব হি চরিষ্ণুতয়া বিভাতি গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।৪৬।। -(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৪৬) অনুবাদঃ” এক মূল প্রদীপের জ্যোতিঃ(অগ্নি) যেমন অন্য বর্তি বা বাতি-গত হয়ে বিস্তার (বিবৃত) হেতু সমান ধর্মের সাথে পৃথক প্রজ্বলিত হয়, সেইরূপ যিনি বিষ্ণুরুপে( রিষ্ণু) প্রকাশ পান, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ) আমি ভজনা করি ।” যস্যৈকনিশ্বসিতকালমথাবলম্ব্য জীবন্তি লোমবিলোজা জগদগুনাথাঃ। বিষ্ণুর্মহান্ স ইহ যস্য কলাবিশেষো গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ।।৪৮ -(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৪৮) অনুবাদঃ” মহাবিষ্ণুর একটি নিশ্বাস বের হয়ে যে কাল পর্যন্ত অবস্থান করে, তাঁর রোমকূপজাত ব্রহ্মাণ্ডপতি ব্রহ্মাদি সেই-কালমাত্র জীবিত থাকেন। সেই মহাবিষ্ণু-যাঁর কলাবিশেষ অর্থাৎ অংশের অংশ, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ)আমি ভজনা করি।।”৪৮।। “রামাদিমূর্তিষু কলানিয়মেন তিষ্ঠন নানাবতারমকরোদ্ভূবনেষু কিন্তু। কৃষ্ণ স্বয়ং সমভবৎ পরমঃ পুমান্ যো গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি ॥ ৩৯ ॥ -(ব্রহ্মসংহিতা৫/৩৯) অনুবাদঃ “যে পরমপুরুষ স্বাংশ কলাদি নিয়মে রাম, নৃসিংহ ইত্যাদি মূর্তিতে স্থিত হয়ে ভুবনে নানাবতার প্রকাশ করেছিলেন এবং স্বয়ং কৃষ্ণরূপে প্রকট হয়েছিলেন, সেই আদিপুরুষ গোবিন্দকে (শ্রীকৃষ্ণ) আমি ভজনা করি।” হরে কৃষ্ণ। প্রনাম সদগুন মাধব দাস। স্বধর্মম্ : Connect to the inner self.
মহাভারত অনুযায়ী,কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ কি আদৌ গীতার জ্ঞান ভূলে গিয়েছিলেন ?

মহাভারত শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকে শ্রীবিষ্ণু বলা হয়েছে,পরমেশ্বর ভগবান বলা হয়েছে। (“অনুগ্রহার্থং লোকানাং বিষ্ণুলোক নমস্কৃতঃ।বসুদেবাত্তু দেবক্যাং প্রাদুর্ভূতো মহাযশাঃ।।”- “ত্রিজগতের পূজনীয় মহাযশস্বী স্বয়ং বিষ্ণু লোকের প্রতি অনুগ্রহ করিবার জন্য বসুদেব-দেবকীতে আবির্ভূত হইয়া ছিলেন৷”–মহাভারত আদিপর্ব, ৫৮/১৩৮) এছাড়াও মহাভারত শাস্ত্রের ভীষ্মপর্বের ৩৪ তম অধ্যায়ের ৮ নং শ্লোকে অথাৎ গীতা ১০/৮ নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন নিজেকে সমগ্র জগতের সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বররুপে দাবী করেন,তখন অর্জুন কোনরুপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা না করে মহাভারত, ভীষ্মপর্ব ৩৪/১২-১৩ নং শ্লোকে অথাৎ গীতা ১০/১২-১৩ নং শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণকে পরমব্রহ্ম বা পরমেশ্বর ভগবান বলে সম্বোধন করেন – অর্জুন উবাচ-“পরং ব্রহ্ম পরং ধাম পবিত্রং পরমং ভবান্ ।পুরুষং শাশ্বতং দিব্যমাদিদেবমজং বিভুম্ ॥আহুস্তামৃষয়ঃ সর্বে দেবর্ষির্নারদস্তথা ।অসিতো দেবলো ব্যাসঃ স্বয়ং চৈব ব্রবীষি মে ॥” – গীতাঃ ১০/১২-১৩ঃঅর্জুন অনুবাদঃ “অর্জুন বললেন- তুমি ( হে কৃষ্ণ) পরম ব্রহ্ম ( ঈশ্বর) , পরম ধাম( পরম আশ্রয়), পরম পবিত্র ও পরম পুরুষ৷ তুমি নিত্য, দিব্য, আদি দেব, অজ ও বিভু। দেবর্ষি নারদ, অসিত, দেবল, ব্যাস আদি ঋষিরা তোমাকে সেভাবেই বর্ণনা করেছেন এবং তুমি নিজেও এখন আমাকে তা বলছ।” এইভাবে সমগ্র সনাতনী শাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান বলা হয়েছে,বিষ্ণু বলা হয়েছে। কিন্তু তারপরও শাস্ত্র জ্ঞানহীন কিছু মানুষ আমাদের সমাজে রয়েছে,যারা সনাতনী শাস্ত্রে উল্লেখিত শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর ভগবান রুপে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে।শুধু তাই নয় তারা জনসমাজে অপপ্রচার করছে যে,মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে অজুর্ন যখন দ্বিতীয় বার কৃষ্ণকে গীতার জ্ঞান দান করতে অনুরোধ করেন ,তখন কৃষ্ণ বলছেন আমি গীতার জ্ঞান ভুলে গিয়েছি। তাই এই সমস্ত জ্ঞানান্ধ মানুষেরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, কৃষ্ণ পরমেশ্বর ভগবান নন,তিনি একজন মানুষ,তাই তিনি ভুলে যাওয়ার কথা বলছেন। অথচ তারা একবারও চিন্তা করে দেখে না,কৃৃষ্ণ কিভাবে গীতার জ্ঞান ভূলে যাবেন,তিনি নিজে গীতা ৪/৫ নং শ্লোকে বর্ণনা করছেন,”তোমার ও আমার বহু জন্ম অতিবাহিত হয়েছে।আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি,কিন্তু তুমি তা পার না( “বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন । তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ।।”)” কৃষ্ণ এই পৃথিবীতে দুষ্টের দমন, সন্তের রক্ষা এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য বহুবার বিভিন্ন অবতাররুপে আবির্ভূত হয়েছেন(গীতা৪/৬-৮)।সেসমস্ত আবির্ভাব বা দিব্য জন্মের কথা সবই কৃষ্ণের মনে আছে। অথচ অর্জুনের বর্তমান জীবনে কিছুদিন পূর্বে কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে ভগবদগীতার জ্ঞান ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অজুর্নকে দান করলেন, সে জ্ঞানের একটা লাইনও কৃষ্ণের মনে নাই।এ ধরনের কথা বলার পেছনে যে কোন হেতু বা কারন আছে, যে কেউ তা বুঝতে পারবে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যদি গীতার জ্ঞান ভুলে যাবেন, তাহলে সে একই কৃষ্ণের পক্ষে অজুর্নকে বহু প্রাচীন ইতিহাসের মাধ্যমে হুবহু ভগবদ্গীতা ১৮ টি অধ্যায়ের মতো মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্ব, ১৭- ৬৬ অধ্যায় অথাৎ ৫০ টি অধ্যায়ে অনুগীতা দান করা কিভাবে সম্ভব হল?বস্তুত পক্ষে পরমাত্মা কৃষ্ণের উদ্দেশ্য ছিল জড় জগতে পুনরায় সিদ্ধ ব্রাহ্মণ এবং মহর্ষি কশ্যপ,ব্রাহ্মণ এবং ব্রাহ্মণী, গুরু এবং শিষ্যের তত্ত্ব জ্ঞান আলোচনার মাধ্যমে গীতার জ্ঞান প্রদান করা,যাকে মহাভারতে অনুগীতা বলা হয়েছে। মূল ঘটনাঃ মহাভারতের ১৪ তম আশ্বমেধিক পর্বের ১৭তম অধ্যায়ে অর্জুনের প্রশ্ন ছিল, হে কৃষ্ণ! তুমি যে যুদ্ধক্ষেত্রে গীতার জ্ঞান আমাকে দান করেছ তা আমি এখন ভুলে গেছি, সে জ্ঞান পুনরায় আমাকে দান কর। যত্তু তদ্ভবতা প্রোক্তং পুরা কেশব! সৌহৃদাৎ।তৎসর্ব্বং পুরুষব্যাঘ্র! নষ্টং মে ব্যগ্রচেতসঃ ॥৬॥মম কৌতূহলং স্বস্তি তেষর্থেষু পুনঃ পুনঃ।ভবাংস্তু দ্বারকাং গন্তা নচিরাদিব মাধব! ॥৭॥ -(মহাভারত,অশ্বমেধিক পর্ব ১৭/৬-৭) অনুবাদঃ “পুরুষশ্রেষ্ঠ কেশব! তুমি সৌহাদ্যবশতঃ পূর্ব্বে যে সকল কথা বলেছিলে, আমি যুদ্ধে আসক্তচিত্ত হওয়ায় সে সমস্তই আমার লুপ্ত হয়ে গিয়েছে(ভূলে গিয়েছি)। হে মাধব,সেই সকল বিষয় পুনরায় শ্রবণ করার জন্য আবার আমার কৌতুহল হচ্ছে,কেননা তুমি খুব শীঘ্রই দ্বারকায় গমন করবে।” কৃষ্ণ চিন্তা করলেন, অর্জুনের মতো আমার পরম ভক্ত যদি এ গীতার জ্ঞান ভুলে যায় তাহলে সাধারণ মানুষের আর কি কথা।তখন পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের এরুপ কথাতে ভীষণ অসন্তুষ্ট হন এবং বাণীরুপে ভগবদ্গীতার জ্ঞান দান করতে অস্বীকার করে ক্ষোভ থেকে সৃষ্ট অসত্য উক্তি দ্বারা বলেছিলেন,হে অর্জুন তোমার মত আমিও তা এখন বলতে পারব না। বাসুদেব উবাচ।শ্রাবিতত্ত্বং ময়া গুহ্যং জ্ঞাপিতশ্চ সনাতনম্। ধৰ্ম্মং স্বরূপিণং পার্থ! সর্ব্বলোকাংশ্চ শাশ্বতান্ ॥৯৷৷ অবুদ্ধ্যা নাগ্রহীর্যত্বং তন্মে সুমহদপ্রিয়ম্। ন চ সাদ্য পুনর্ভু’য়ঃ স্মৃতিমে সংভবিষ্যতি ॥১০॥ -(মহাভারত,অশ্বমেধিক পর্ব ১৭/৯-১২)” অনুবাদঃ “কৃষ্ণ বললেন- ‘পৃথানন্দন! আমি তোমাকে গোপনীয় বিষয় শুনিয়েছি এবং লক্ষণযুক্ত সনাতন ধর্ম ও শাশ্বত সমস্ত লোকের বিষয় জানিয়েছি। তুমি যে বৈমত্যবশতঃ সে সকল মনে রাখতে পার নি, তা আমার খুব অপ্রিয় হয়েছে(তাতে আমি খুব অসন্তুষ্ট হয়েছি)। এখন সেই স্মৃতি পুনরায় আমার হবে না।” এরপর ঘটনাটি ঘটল অন্যরকম।ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সরাসরি বাণীর মাধ্যমে গীতার জ্ঞান দান না করে এক সিদ্ধ ব্রাহ্মন কৃত মহর্ষি কশ্যপকে উপদেশরুপ তত্ত্বজ্ঞান বর্ননা করেন, যাকে মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্বে-অনুগীতা বলা হয়েছে,যেখানে মহর্ষি কশ্যপের প্রতি সিদ্ধ ব্রাহ্মনের উপদেশ- ১৭ অধ্যায় থেকে ২১ তম অধ্যায়, এই ৫ টি অধ্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে। “পরং হি ব্রহ্ম কথিতং যোগযুক্তেনতন্ময়া। ইতিহাসং তু বক্ষ্যামি তস্মিন্নর্থে পুরাতনম।।” -(মহাভারত,আশ্বমেধিক পর্ব-১৭/ ১৩) অনুবাদঃ “যোগযুক্ততন্ময় পরমব্রহ্মরুপে যেই ভগবদ্গীতার জ্ঞান পূর্বে দান করেছি,তা পুনরায় পুরাতন এক ইতিহাসের মাধ্যমে তোমাকে বর্ণনা করব।” মহাভারতে বর্ণিত শ্রীকৃষ্ণ কতৃর্ক অর্জুনকে বর্ণিত সে পুরাতন ইতিহাস, যাকে মহাভারতে অনুগীতা বলা হয়েছে, তা হুবহু কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে প্রদানকারী ভগবদ্গীতার অনুরুপ।অনুগীতা নামক পুরাতন ইতিহাসটিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বর্ননা করেন,যেখানে এক সিদ্ধ ব্রাহ্মন মর্হষি কশ্যপকে আত্মা সম্বন্ধে উপদেশ দিচ্ছেন, যা ভগবদগীতায় বর্নিত হুবহু দ্বিতীয় অধ্যায় সংখ্যা যোগ বা আত্মার জ্ঞান। এরপর মহাভারতের সেই অনুগীতাতে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ,সন্ন্যাসযোগ,ভক্তিযোগের কথা বলা হয়েছে,যা হুবহু শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা। সিদ্ধ উবাচ।বিবিধৈঃ কৰ্ম্মভিস্তাত! পুণ্যযোগৈশ্চ কেবলৈঃ। গচ্ছন্তীহ গতিং মর্ত্য। দেবলোকে চ সংস্থিতিম্ ॥২৯৷৷– -(মহাভারতঃঅশ্বমেধিক পর্ব ১৭/২৯)” অনুবাদঃ”সিদ্ধ ব্রাহ্মণ বললেন-‘বৎস কাশ্যপ, মানুষ নানা রকম সৎকর্ম এবং শুধুমাত্র পুণ্য দ্বারা উত্তম গতি ও স্বর্গলোকে স্থিতি লাভ করে থাকে ॥” কাশ্যপ উবাচ। কথং শরীরাচ্চ্যবতে কথঞ্চৈবোপপদ্যতে। কথং কষ্টাচ্চ সংসারাৎ সংসরন্ পরিমুচ্যতে ॥২॥ -(মহাভারতঃঅশ্বমেধিক পর্ব ১৮/২) অনুবাদঃ”কাশ্যপ বললেন- আত্মা কি প্রকারে শরীর হতে নির্গত(বের) হয়, কি প্রকারেই বা শরীরান্তর(একটির পর অন্য একটি শরীর) গ্রহণ করে এবং গমনাগমনকারী আত্মা কি প্রকারে কষ্টজনক সংসার হতে মুক্তি লাভ করে থাকে?” ব্রাহ্মণ উবাচ। শুভানামশুভানাঞ্চ নেহ নাশোহস্তি কৰ্ম্মণাম্। প্রাপ্য প্রাপ্যানুপচ্যন্তে ক্ষেত্রং ক্ষেত্রং তথা তথা ॥১॥ (মহাভারত,অশ্বমেধিক পর্ব ১৯/১) অনুবাদঃসিদ্ধ ব্রাহ্মণ বলিলেন-‘কাশ্যপ। এই দেহে ভোগব্যতীত শুভ বা অশুভ কর্ম্মের ধ্বংস হয় না। প্রাণীরা সেই কৰ্ম্ম অনুসারে বিভিন্ন প্রকার শরীর লাভ করে সুখ বা দুঃখ অনুভব করে ॥১॥ যথা চ দীপঃ শরণে দীপ্যমানঃ প্রকাশতে। এবমেব শরীরাণি প্রকাশযতি চেতনা ॥১১৷৷ যদ্যচ্চ কুরুতে কৰ্ম্ম শুভং বা যদি বা শুভম্। পূর্ব্বদেহকৃতং সর্বমবশ্যমুপভুজ্যতে ॥১২৷৷ -(মহাভারত,অশ্বমেধিক পর্ব ১৯/১১-১২) অনুবাদঃ”দীপ যেমন গৃহে দীপ্তি প্রকাশ করে সমস্ত গৃহকে প্রকাশ করে(আলোকিত), ঠিক সেইরূপ আত্মা গর্ভশরীরে প্রবেশ করে সকল শরীরকেই চৈতন্য সমন্বিত করে। জীব পূর্ব্বদেহে শুভ বা অশুভ যে যে কৰ্ম্ম করেছিল, বর্তমান দেহে সেই পূর্ব্বদেহকৃত কর্ম্মেব ফল অবশ্যই ভোগ করে থাকে।” আত্মবৎ সর্বভূতেষু যশ্চরেন্নিষতঃ শুচিঃ। অমানী নিরভীমানঃ সর্বতো মুক্ত এব সঃ ॥৩॥ জীবিতং মরণং চোভে সুখদুঃখে তথৈব চ। লাভালাভে প্রিয়দ্বেষ্যে যঃ সমঃ
চিন্ময় জগৎ কি? চিন্ময় জগত বা ভগবদ্ধাম সম্পর্কে আলোচনা করুন।
চিন্ময় জগৎঃ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাস্ত্রে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দুটি জগতের কথা বর্ণনা করেন- অপরা প্রকৃতি বা জড় জগৎ এবং পরা প্রকৃতি বা চিন্ময় জগৎ।চতুর্দশ ভূবন সমন্বিত যেখানে আমরা বর্তমানে বসবাস করছি, সেটিকে বলা হয় জড় জগৎ বা অপরা প্রকৃতি।আর এ জড় জগতের বিপরীতে রয়েছে সমগ্র জীবের পরম গন্তব্য পরা প্রকৃতি বা চিন্ময় জগৎ।সে চিন্ময় জগতকে ভগবদ্ধাম বা ভগবানের ধামও বলা হয়। সেই চিন্ময় জগতে নিত্য আনন্দ বর্তমান।সেখানে সমস্ত জীব জন্ম,মৃত্যু, জরা, ব্যাধি,ত্রিতাপ ক্লেশ (আদিভৌতিক,আদিদৈবিক, আধ্যত্মিক) থেকে সর্বদা মুক্ত। “অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধিমে পরাম্। জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ।।” -(গীতা ৭/৫ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ” হে মহাবাহো! এই অপরা প্রকৃতি ( জড় জগৎ) ব্যতীত আমার আর একটি পরা প্রকৃতি(চিন্ময় জগৎ) রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য-স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জগৎকে ধারণ করে আছে।” কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় কঠ উপনিষদ শাস্ত্রেও চিন্ময় জগত সম্পর্কে বলা হয়েছে.. “ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।।” – (কঠ উপনিষদ ২/২/১৫) অনুবাদঃ “চিন্ময় জগতে সূর্য প্রকাশিত হয় না,চন্দ্র ও তাঁরাগনও সেখানে প্রকাশিত হয় না,এমনকি বিদ্যুৎ ঝলকায় না,তাহলে এই লৌকিক অগ্নিই কিভাবে সেখানে প্রকাশিত হতে পারে, তার প্রকাশের দ্বারাই সমস্ত (সূর্য চন্দ্র তারকাদি) কিছু প্রকাশিত হয়,তার জ্যোতিতেই সম্পূর্ণ চিন্ময় জগৎ প্রকাশিত হয়।” ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান, ব্রহ্মসংহিতা সহ বিভিন্ন সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে গোলক বৃন্দাবন নামক কৃষ্ণলোক, যেখানে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তারই অভিন্ন প্রকাশ শ্রীমতি রাধারাণী, বলরাম সহ অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত।গোলক বৃন্দাবনের অধোদিকে বৈকুন্ঠলোক,এই বৈকুন্ঠ লোকে ভগবান শ্রীনারায়ন মাতা লক্ষ্মী সহ অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত। এরপর রয়েছে শিবলোক,এখানে ভগবান সদাশিব, যিনি স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু তিনি অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত। অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদে চিন্ময় জগতের গোলক বৃন্দাবন সম্পর্কে বলা হয়েছে… “তমেকং গোবিন্দং সচ্চিদানন্দ বিগ্রহং পঞ্চপদং বৃন্দাবনসুরভূরুহতলাসীনং সততং সমরুদগণোহহং পরময়া স্তুত্যা তোষয়ামি।।” -(গোপালতাপনী উপনিষদঃ পূর্ব ২/৩৫) অনুবাদঃ “যিনি গোলক বৃন্দাবনের কল্পতরুমূলে সমাসীন আছেন,সতত আমি মরুদগনের সহিত পরম স্তুতি দ্বারা পঞ্চপদাত্মক সেই গোবিন্দদেবের(শ্রীকৃষ্ণের) সন্তোষ বিধান করি।” অষ্টাদশ পুরানের শাস্ত্রের ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে চিন্ময় জগতের গোলক বৃন্দাবন ধাম এবং তার অধোদেশে বৈকুন্ঠ এবং শিবধাম সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরন পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে… “সূর্য্যকোটিপ্রভং নিত্যমসখ্যং বিশ্বব্যাপকম। স্বেচ্ছাময়স্য চ বিভোস্তজ্জ্যোতবরুজ্জ্বলং মহৎ।। জ্যোতিরভ্যন্তরে লোকত্রয়মেব মনোহরম। অদৃশ্য যোগিবি স্বপ্নে দৃশ্য গম্যঞ্চ বৈষ্ণবৈঃ।। যোগেন ধৃতমীশেন চান্তরীক্ষস্থিতং পরম। আধিব্যাধিজরামৃত্যুশোকবীতিবিবর্জিত।। সদ্রত্মরচিতাসংখ্যমন্দিরৈঃ পরিশোবিত। লয়ে কৃষ্ণযুতং সৃষ্টৌ গোপগোপীভিরাবৃতম।। তদধো দক্ষিনে সব্যে পঞ্চাশংকোটিযোজনাৎ। বৈকুন্ঠং শিবলোকঞ্চ তৎসমং সুমনোহরম।। কোটিযোজনবিস্তীনং বৈকুন্ঠং মন্ডলাকৃতম। লয়ে শূণ্যঞ্চ সৃষ্টৌ চ লক্ষ্মীনারায়নন্বিতম।। গোলকাভ্যন্তরে জ্যোতিঃ সর্ব্বতেজোগুণান্বিতম। চতুর্ভুজৈ পার্ষদৈশ্চ জন্মমৃত্যুবিবর্জ্জিতৈ।। সব্যে চ শিবলোকশ্চ কোটিযোজনবিস্তৃতম। লয়ে সৃষ্টৌ চ সপার্ষদশিবান্বিতম।।” – (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানঃ ব্রহ্মখন্ড ২/৪-১১) অনুবাদঃ”কোটিসূর্যের প্রভাসমন্বিত চিন্ময় জগৎ,যার অভ্যন্তরে স্বেচ্ছাময় পরমেশ্বর ভগবান বিরাজমান।সেই উজ্জ্বল জ্যোতির অভ্যন্তরে অবস্থিত মনোহর ত্রিলোক( গোলক বৃন্দাবন, বৈকুন্ঠ এবং শিবধাম)।যোগীগন স্বপ্নেও সেই চিন্ময় জগতকে দর্শন করতে পারে না,কিন্তু বৈষ্ণবগন সেই জগৎ দর্শন করতে পারে এবং সেখানে গমন করতে পারে।সে জগৎ আধিভৌতিক, আদি দৈবিক, আধ্যত্মিক ক্লেশ থেকে মুক্ত।জরা,মৃত্যু, শোক বিবর্জিত। সে জগত অসংখ্য রত্মখচিত মন্দির দ্বারা পরিবৃত।সে জগতের মধ্যে গোলক বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ অসংখ্য গোপ গোপী সমন্বিত হয়ে অবস্থান করছেন।গোলক বৃন্দাবনের অধোদেশে(“তদধো”- তৎ+ অধ)পঞ্চাশ কোটি যোজন দক্ষিণে অবস্থিত বৈকুন্ঠ।গোলক বৃন্দাবনের মতোই মনোরম বৈকুন্ঠ এবং শিবলোক ।বৈকুন্ঠের পরিধি কোটি যোজন বিস্তৃত। সৃষ্টির সময় থেকে বৈকুন্ঠে নারায়ন লক্ষ্মী সমন্বিত রুপে বিরাজমান।সে বৈকুন্ঠে বিষ্ণুর পার্ষদগন চতুর্ভুজ, তারা জন্মমৃত্যু বর্জিত।শিবলোক কোটিযোজনবিস্তৃত,এবং সে লোক সৃষ্টির সময় থেকে স্বপার্ষদ শিব সমন্বিত।” ব্রহ্মসংহিতা শাস্ত্রেও চিন্ময় জগতের সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়।সেখানে বলা হয়েছে… “গোলকনাম্নি নিজধাম্নি তলে চ তস্য দেবী-মহেশ-হরি-ধামসু-তেষু তেষু। তে তে প্রভাবনিচয়া বিহিতাশ্চ যেন গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি॥ -(ব্রহ্মসংহিতা-৫/৪৩ঃব্রহ্মা) অনুবাদঃ” এই চৌদ্দভুবন বিশিষ্ট দেবীধাম বা জড় জগৎ।তার উপরে রয়েছে (চিন্ময়জগৎ) শিবধাম,তার উপরে বৈকুন্ঠধাম এবং সবার উপরে গোলক নামক কৃষ্ণধাম।সেই সমস্ত ধামে বিভিন্ন প্রভাব সমূহ যিনি বিধান করেছেন,সেই আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।” “চিন্তামনিপ্রকরসন্মসু কল্পবৃক্ষ- লক্ষাবৃতেষু সুরভীরভিপালয়ন্তম। লক্ষ্মীসহস্রশতসম্ভ্রমসেব্যমানং গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।” –( ব্রহ্মসংহিতা ৫/২৯, ব্রহ্মা) অনুবাদঃ লক্ষ লক্ষ কল্পবৃক্ষ দ্বারা আবৃত চিন্তামণিকর গঠিত গৃহসমূহে সুরভী অর্থাৎ কামধেনুগণকে যিনি পালন করছেন এবং শত সহস্র লক্ষ্মীগণ(গোপীগন) কর্তৃক সাদরে যিনি সেবিত হচ্ছেন সে আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি। ” শ্রিয়ঃ কান্তাঃ কান্তঃ পরমপুরুষঃ কল্পতরবো দ্রুমা ভূমিশ্চিন্তামনিগণময়ী তোয়মমৃতম।। কথা গানং নাট্যং গমনমপি বংশী প্রিয়সখী চিদানন্দং জ্যোতি পরমপি তদাস্বাদ্যমপি চ।। স যত্র ক্ষীরাব্ধিঃ স্রবতি সুরভীভ্যশ্চ সুমহান্ নিমেষার্ধাখ্যো বা ব্রজতি ন হি যত্রাপি সময়ঃ। ভজে শ্বেতদ্বীপং তমহমিহ গোলকমিতি যং বিদন্তস্তে সন্তঃ ক্ষিতিবিরলচারাঃ কতিপয়ে।।” –(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৫৬ঃ ব্রহ্মা) অনুবাদঃ যে স্থানে চিন্ময়ী লক্ষ্মীগন( গোপীগণ) কান্তারুপা,পরমপুরুষ কৃষ্ণই একমাত্র কান্ত,বৃক্ষমাত্রই চিদগত কল্পতরু,ভূমিমাত্রই চিন্তামণি ( চিন্ময় মণিবিশেষ),জলমাত্রই অমৃত,কথামাত্রই গান,গমনমাত্রই নাট্য,বংশী – প্রিয়সখী,জ্যোতি- চিদানন্দময়,আহার মাত্রই আস্বাদনীয়( সুস্বাদু),যে স্থানে কোটি কোটি সুরভী হতে চিন্ময় মহা – ক্ষীরসমুদ্র নিরন্তর স্রাবিত হচ্ছে,ভূত ও ভবিষ্যৎরুপ খন্ডত্ব রহিত চিন্ময় কাল নিত্য বর্তমান, সুতারাং নিমেষার্ধ প্রাপ্ত হয় না,সেই শ্বেতদ্বীপরুপ পরমপীঠকে আমি ভজনা করি।সেই ধামকে এই জড় জগতে বিরলচর অতি স্বল্পসংখ্যাক সাধুব্যক্তিই গোলক বলে জানেন। হরে কৃষ্ণ।প্রনাম প্রচারে- স্বধর্মম্ : Connect to the inner self.
চিন্ময় জগৎ কি? চিন্ময় জগৎ বা ভগবদ্ধাম সম্পর্কে আলোচনা করুন।

চিন্ময় জগৎঃ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাস্ত্রে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দুটি জগতের কথা বর্ণনা করেন- অপরা প্রকৃতি বা জড় জগৎ এবং পরা প্রকৃতি বা চিন্ময় জগৎ।চতুর্দশ ভূবন সমন্বিত যেখানে আমরা বর্তমানে বসবাস করছি, সেটিকে বলা হয় জড় জগৎ বা অপরা প্রকৃতি।আর এ জড় জগতের বিপরীতে রয়েছে সমগ্র জীবের পরম গন্তব্য পরা প্রকৃতি বা চিন্ময় জগৎ। সেই চিন্ময় জগতে নিত্য আনন্দ বর্তমান।সেখানে সমস্ত জীব জন্ম,মৃত্যু, জরা, ব্যাধি,ত্রিতাপ ক্লেশ (আদিভৌতিক,আদিদৈবিক, আধ্যত্মিক) থেকে সর্বদা মুক্ত। “অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধিমে পরাম্। জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ।।” -(গীতা ৭/৫ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ” হে মহাবাহো! এই অপরা প্রকৃতি ( জড় জগৎ) ব্যতীত আমার আর একটি পরা প্রকৃতি(চিন্ময় জগৎ) রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য-স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জগৎকে ধারণ করে আছে।” কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় কঠ উপনিষদ শাস্ত্রেও চিন্ময় জগত সম্পর্কে বলা হয়েছে.. “ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।।” – (কঠ উপনিষদ ২/২/১৫) অনুবাদঃ “চিন্ময় জগতে সূর্য প্রকাশিত হয় না,চন্দ্র ও তাঁরাগনও সেখানে প্রকাশিত হয় না,এমনকি বিদ্যুৎ ঝলকায় না,তাহলে এই লৌকিক অগ্নিই কিভাবে সেখানে প্রকাশিত হতে পারে?তার প্রকাশের দ্বারাই সমস্ত (সূর্য চন্দ্র তারকাদি) কিছু প্রকাশিত হয়,তার জ্যোতিতেই সম্পূর্ণ চিন্ময় জগৎ প্রকাশিত হয়।” চিন্ময় জগৎ সম্পর্কে একই কথা পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায়ও বর্ণনা করেন- ন তদ্ ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ। যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ।। ৬।। -(গীতা ১৫/৫,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ “যেখানে গেলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।সেই আমার পরম ধামকে সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি বা বিদ্যুৎ আলোকিত করতে পারে না।” 👉ব্রহ্মবৈবর্ত পুরান, ব্রহ্মসংহিতা সহ বিভিন্ন সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে চিন্ময় জগতের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে গোলক বৃন্দাবন নামক কৃষ্ণলোক, যেখানে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তারই অভিন্ন প্রকাশ শ্রীমতি রাধারাণী, বলরাম সহ অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত।গোলক বৃন্দাবনের অধোদিকে বৈকুন্ঠলোক,এই বৈকুন্ঠ লোকে ভগবান শ্রীনারায়ন মাতা লক্ষ্মী সহ অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত। এরপর রয়েছে শিবলোক,এখানে ভগবান সদাশিব, যিনি স্বয়ং শ্রীবিষ্ণু তিনি অসংখ্য ভক্তবৃন্দ দ্বারা পরিবৃত। অথর্ববেদীয় গোপালতাপনী উপনিষদে চিন্ময় জগতের গোলক বৃন্দাবন সম্পর্কে বলা হয়েছে… “তমেকং গোবিন্দং সচ্চিদানন্দ বিগ্রহং পঞ্চপদং বৃন্দাবনসুরভূরুহতলাসীনং সততং সমরুদগণোহহং পরময়া স্তুত্যা তোষয়ামি।।” -(গোপালতাপনী উপনিষদঃ পূর্ব ২/৩৫) অনুবাদঃ “যিনি গোলক বৃন্দাবনের কল্পতরুমূলে সমাসীন আছেন,সতত আমি মরুদগনের সহিত পরম স্তুতি দ্বারা পঞ্চপদাত্মক সেই গোবিন্দদেবের(শ্রীকৃষ্ণের) সন্তোষ বিধান করি।” 👉অষ্টাদশ পুরানের শাস্ত্রের ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানে চিন্ময় জগতের গোলক বৃন্দাবন ধাম এবং তার অধোদেশে বৈকুন্ঠ এবং শিবধাম সম্পর্কে বিস্তৃত বিবরন পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে… “সূর্য্যকোটিপ্রভং নিত্যমসখ্যং বিশ্বব্যাপকম। স্বেচ্ছাময়স্য চ বিভোস্তজ্জ্যোতবরুজ্জ্বলং মহৎ।।জ্যোতিরভ্যন্তরে লোকত্রয়মেব মনোহরম। অদৃশ্য যোগিবি স্বপ্নে দৃশ্য গম্যঞ্চ বৈষ্ণবৈঃ।।যোগেন ধৃতমীশেনচান্তরীক্ষস্থিতং পরম।আধিব্যাধিজরামৃত্যুশোকবীতিবিবর্জিত।। সদ্রত্মরচিতাসংখ্যমন্দিরৈঃ পরিশোবিত। লয়ে কৃষ্ণযুতং সৃষ্টৌ গোপগোপীভিরাবৃতম।।তদধো দক্ষিনে সব্যে পঞ্চাশংকোটিযোজনাৎ।বৈকুন্ঠং শিবলোকঞ্চ তৎসমং সুমনোহরম।। কোটিযোজনবিস্তীনং বৈকুন্ঠং মন্ডলাকৃতম। লয়ে শূণ্যঞ্চ সৃষ্টৌ চ লক্ষ্মীনারায়নন্বিতম।। গোলকাভ্যন্তরে জ্যোতিঃ সর্ব্বতেজোগুণান্বিতম। চতুর্ভুজৈ পার্ষদৈশ্চ জন্মমৃত্যুবিবর্জ্জিতৈ।। সব্যে চ শিবলোকশ্চ কোটিযোজনবিস্তৃতম।লয়ে সৃষ্টৌ চ সপার্ষদশিবান্বিতম।।” – (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরানঃ ব্রহ্মখন্ড ২/৪-১১) অনুবাদঃ”কোটিসূর্যের প্রভাসমন্বিত চিন্ময় জগৎ,যার অভ্যন্তরে স্বেচ্ছাময় পরমেশ্বর ভগবান বিরাজমান।সেই উজ্জ্বল জ্যোতির অভ্যন্তরে অবস্থিত মনোহর ত্রিলোক( গোলক বৃন্দাবন, বৈকুন্ঠ এবং শিবধাম)।যোগীগন স্বপ্নেও সেই চিন্ময় জগতকে দর্শন করতে পারে না,কিন্তু বৈষ্ণবগন সেই জগৎ দর্শন করতে পারে এবং সেখানে গমন করতে পারে।সে জগৎ আধিভৌতিক, আদি দৈবিক, আধ্যত্মিক ক্লেশ থেকে মুক্ত।জরা,মৃত্যু, শোক বিবর্জিত। সে জগত অসংখ্য রত্মখচিত মন্দির দ্বারা পরিবৃত।সে জগতের মধ্যে গোলক বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ অসংখ্য গোপ গোপী সমন্বিত হয়ে অবস্থান করছেন।গোলক বৃন্দাবনের অধোদেশে(“তদধো”- তৎ+ অধ)পঞ্চাশ কোটি যোজন দক্ষিণে অবস্থিত বৈকুন্ঠ।গোলক বৃন্দাবনের মতোই মনোরম বৈকুন্ঠ এবং শিবলোক ।বৈকুন্ঠের পরিধি কোটি যোজন বিস্তৃত। সৃষ্টির সময় থেকে বৈকুন্ঠে নারায়ন লক্ষ্মী সমন্বিত রুপে বিরাজমান।সে বৈকুন্ঠে বিষ্ণুর পার্ষদগন চতুর্ভুজ, তারা জন্মমৃত্যু বর্জিত।শিবলোক কোটিযোজনবিস্তৃত,এবং সে লোক সৃষ্টির সময় থেকে স্বপার্ষদ শিব সমন্বিত।” ব্রহ্মসংহিতা শাস্ত্রেও চিন্ময় জগতের সম্পর্কে স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়।সেখানে বলা হয়েছে… “গোলকনাম্নি নিজধাম্নি তলে চ তস্য দেবী-মহেশ-হরি-ধামসু-তেষু তেষু। তে তে প্রভাবনিচয়া বিহিতাশ্চ যেন গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি॥ -(ব্রহ্মসংহিতা-৫/৪৩ঃব্রহ্মা) অনুবাদঃ” এই চৌদ্দভুবন বিশিষ্ট দেবীধাম বা জড় জগৎ।তার উপরে রয়েছে (চিন্ময়জগৎ) শিবধাম,তার উপরে বৈকুন্ঠধাম এবং সবার উপরে গোলক নামক কৃষ্ণধাম।সেই সমস্ত ধামে বিভিন্ন প্রভাব সমূহ যিনি বিধান করেছেন,সেই আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি।” “চিন্তামনিপ্রকরসন্মসু কল্পবৃক্ষ- লক্ষাবৃতেষু সুরভীরভিপালয়ন্তম। লক্ষ্মীসহস্রশতসম্ভ্রমসেব্যমানং গোবিন্দমাদিপুরুষং তমহং ভজামি।।” -( ব্রহ্মসংহিতা ৫/২৯, ব্রহ্মা) অনুবাদঃ লক্ষ লক্ষ কল্পবৃক্ষ দ্বারা আবৃত চিন্তামণিকর গঠিত গৃহসমূহে সুরভী অর্থাৎ কামধেনুগণকে যিনি পালন করছেন এবং শত সহস্র লক্ষ্মীগণ(গোপীগন) কর্তৃক সাদরে যিনি সেবিত হচ্ছেন সে আদি পুরুষ গোবিন্দকে আমি ভজনা করি। ” শ্রিয়ঃ কান্তাঃ কান্তঃ পরমপুরুষঃ কল্পতরবো দ্রুমা ভূমিশ্চিন্তামনিগণময়ী তোয়মমৃতম। কথা গানং নাট্যং গমনমপি বংশী প্রিয়সখী চিদানন্দং জ্যোতি পরমপি তদাস্বাদ্যমপি চ।। স যত্র ক্ষীরাব্ধিঃ স্রবতি সুরভীভ্যশ্চ সুমহান্ নিমেষার্ধাখ্যো বা ব্রজতি ন হি যত্রাপি সময়ঃ। ভজে শ্বেতদ্বীপং তমহমিহ গোলকমিতি যং বিদন্তস্তে সন্তঃ ক্ষিতিবিরলচারাঃ কতিপয়ে।।” –(ব্রহ্মসংহিতা ৫/৫৬ঃ ব্রহ্মা) অনুবাদঃ যে স্থানে চিন্ময়ী লক্ষ্মীগন( গোপীগণ) কান্তারুপা,পরমপুরুষ কৃষ্ণই একমাত্র কান্ত,বৃক্ষমাত্রই চিদগত কল্পতরু,ভূমিমাত্রই চিন্তামণি ( চিন্ময় মণিবিশেষ),জলমাত্রই অমৃত,কথামাত্রই গান,গমনমাত্রই নাট্য,বংশী – প্রিয়সখী,জ্যোতি- চিদানন্দময়,আহার মাত্রই আস্বাদনীয়( সুস্বাদু),যে স্থানে কোটি কোটি সুরভী হতে চিন্ময় মহা – ক্ষীরসমুদ্র নিরন্তর স্রাবিত হচ্ছে,ভূত ও ভবিষ্যৎরুপ খন্ডত্ব রহিত চিন্ময় কাল নিত্য বর্তমান, সুতারাং নিমেষার্ধ প্রাপ্ত হয় না,সেই শ্বেতদ্বীপরুপ পরমপীঠকে আমি ভজনা করি।সেই ধামকে এই জড় জগতে বিরলচর অতি স্বল্পসংখ্যাক সাধুব্যক্তিই গোলক বলে জানেন। হরে কৃষ্ণ।প্রনাম প্রচারে- স্বধর্মম্ : Connect to the inner self.
নরক কি? নরক সম্পর্কে আলোচনা করুন।

নরকঃ মনুষ্য জীবের পাপকর্মের ফল স্বরুপ যে স্থান পরমেশ্বর ভগবান কতৃর্ক নির্ধারিত আছে, তাকে নরক বলা হয়। শ্রীমদ্ভাগবতের ৫/২৬/৫ নং শ্লোকের বর্ণনা অনুসারে, গর্ভোদক সমুদ্রের উপরে অথাৎ ব্রহ্মান্ডের ৭ টি অধঃলোকের মধ্যবর্তী স্থানে নরকের অবস্থান। “অন্তরাল এব ত্রিজগত্যাস্ত দিশি দক্ষিণস্যামধস্তাত্তুমেরু পরিষ্টাচ্চ জলাদ্যস্যামগ্নিষ্বাত্তাদয়ঃ পিতৃগণা দিশি স্বানাং গোত্রাণাং পরমেণ সমাধিনা সত্যা এবাশিষ আশাসানা নিবসন্তি ॥”৫ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবতের ৫/২৬/৫) অনুবাদ-“সমস্ত নরক ত্রিলোকের অন্তরালে অবস্থিত। দক্ষিণ দিকে ভূমণ্ডলের অধঃভাগে এবং গর্ভোদক সমুদ্রের উপরিভাগে নরকের অবস্থান। পিতৃলোকও সেই প্রদেশে অর্থাৎ গর্ভোদক সমুদ্র এবং নিম্নলোকের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। অগ্নিষ্বাত্তা আদি পিতৃগণ পরম সমাধিযোগে ভগবানের ধ্যান করেন এবং তাঁদের গোত্রভূত ব্যক্তিদের মঙ্গল কামনা করেন।” শ্রীমদ্ভাগবত পুরান সহ অষ্টাদশ পুরান,বেদ, উপনিষদ, রামায়ন, মহাভারত,গীতা ইত্যাদি বহুবিধ সনাতনী শাস্ত্রে নরক সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। ভগবদগীতা ১/৪১ এবং ৪৩ নং শ্লোকে নরক সম্পর্কে বলা হয়েছে… ” সঙ্করো নরকায়ৈব কুলঘ্নানাং কুলস্য চ। পতন্তি পিতরো হ্যেষাং লুপ্তপিন্ডোদকক্রিয়াঃ।।”৪১।। -(গীতা ১/৪১ঃ অর্জুন) অনুবাদঃ “বর্ণসঙ্কর উৎপাদন বৃদ্ধি হলে কুল ও কুলঘাতকেরা নরকগামী হয়।সেইকুলে পিন্ডদান ও তর্পণক্রিয়া লোপ পাওয়ার ফলে তাদের পিতৃপুরুষেরাও নরকে অধঃপতিত হয়।” “উৎসন্নকুলধর্মাণাং মনুষ্যাণাং জনার্দন। নরকে নিয়তং বাসো ভবতীত্যনুশুশ্রুম।।”৪৩।। -(গীতা ১/৪৩ঃ অর্জুন) অনুবাদঃ হে জনার্দন!আমি পরম্পরাক্রমে শুনেছি যে, যাদের কুলধর্ম বিনষ্ট হয়েছে, তাদের নিয়ত নরকে বাস করতে হয়। শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৭ শ্লোকে ২৮ টি নরকের কথা শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বর্ণনা করেন। “তত্র হৈকে নরকানেকবিংশতিং গণয়ন্তি অথ তাংস্তেরাজন্নামরূপলক্ষণতোহনুক্রমিষ্যামস্তামিম্রোহ ন্ধতামিম্রো রৌরবো মহারৌরবঃ কুন্তীপাকঃ কালসূত্রমসিপত্রবনং সূকরমুখমন্ধকূপঃ কৃমিভোজনঃ সন্দংশস্তপ্তসূর্মিবজ্রকণ্টকশাল্মলী বৈতরণী পৃয়োদঃ প্রাণরোধো বিশসনং লালাভক্ষঃ সারমেয়াদনমবীচিরয়ঃপানমিতি। কিঞ্চ ক্ষারকদমো রক্ষোগণভোজনঃ শূলপ্রোতো দন্দশূকোহ বটনিরোধনঃ পর্যাবর্তনঃ সূচীমুখমিত্যষ্টাবিংশতির্নর কাহবিবিধযাতনাভূময়ঃ ॥” -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৭) অনুবাদঃ”কেউ কেউ বলেন যে, ২১টি নরক রয়েছে, এবং অন্য কেউ বলেন ২৮টি। হে রাজন, আমি তাদের নাম, রূপ এবং লক্ষণ অনুসারে বর্ণনা করব। সেগুলি হচ্ছে-তামিস্র, অন্ধতামিস্র, রৌরব, মহারৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, অসিপত্রবন, সূকরমুখ, অন্ধকূপ, কৃমিভোজন, সন্দংশ, তপ্তসূর্মি, বজ্রকণ্টক-শাল্মলী, বৈতরণী, পূয়োদ, প্রাণরোধ, বিশসন, লালাভক্ষ, সারমেয়াদন, অবীচি, অয়ঃপান, ক্ষারকর্দম, রক্ষোগণ-ভোজন, শূলপ্রোত, দন্দশূক, অবটনিরোধন, পর্যাবর্তন এবং সূচীমুখ। এইগুলি জীবের দণ্ডভোগের স্থান।” এরপর শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৮-৩৬ নং শ্লোকে মুক্তপূরুষ শ্রীল শুকদেব গোস্বামী কিরুপ পাপকর্মে যুক্ত হওয়ার ফলে পাপীগণকে যমদূতগন কোন কোন নরকে নিক্ষেপ করে কঠিন শাস্তি প্রদান করেন তার বিস্তীত বিবরণ প্রদান করেন। নিম্নে তা আলোচনা করা হল- ১/ তামিস্র নরকঃ তত্র যস্তু পরবিত্তাপত্যকলত্রাণ্যপহরতি স হি কালপাশবদ্ধো যম- পুরুষৈরতিভয়ানকৈস্তামিস্রে নরকে বলান্নিপাত্যতে অনশনানুদপানদণ্ডতাড়ন- সন্তর্জনাদিভির্যাতনাভির্যাত্যমানো জন্তুর্যত্র কশ্মলমাসাদিত একদৈব মূর্ছামুপযাতি তামিস্রপ্রায়ে ॥ ৮।। -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৮) অনুবাদঃ “হে রাজন, যে ব্যক্তি অপরের ধন, স্ত্রী ও পুত্র অপহরণ করে, অত্যন্ত ভয়ঙ্কর যমদূতেরা তাকে কালপাশে বেঁধে বলপূর্বক তামিস্র নরকে নিক্ষেপ করে। এই তামিস্র নরক ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন; সেখানে যমদূতেরা পাপীকে ভীষণভাবে প্রহার, তাড়ন এবং তর্জন করে। সেখানে তাকে অনশনে রাখা হয় এবং জল পান করতে দেওয়া হয় না। এইভাবে ক্রুদ্ধ যমদূতদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে সে মূর্ছিত হয়।” ২/ অন্ধতামিস্র নরকঃ এবমেবান্ধতামিস্রে যস্তু বঞ্চয়িত্বা পুরুষং দারাদীনুপযুঙক্তে যত্র শরীরী নিপাত্যমানো যাতনাস্থো বেদনয়া নষ্টমতির্নষ্টদৃষ্টিশ্চ ভবতি যথা বনস্পতিবৃশ্চমানমূলস্তস্মাদগ্ধতামিস্রং তমুপদিশন্তি।। ৯ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৯) অনুবাদঃ “যে ব্যক্তি পতিকে বঞ্চনা করে তার স্ত্রী-পুত্র উপভোগ করে, সে অন্ধতামিস্র নরকে পতিত হয়। বৃক্ষকে ভূপাতিত করার পূর্বে যেমন তার মূল ছেদন করা হয়, তেমনই সেই পাপীকে ঐ নরকে নিক্ষেপ করার পূর্বে যমদূতেরা নানা প্রকার যন্ত্রণা প্রদান করে। এই যন্ত্রণা এতই প্রচণ্ড যে, তার ফলে তার বুদ্ধি এবং দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায়। সেই জন্যই সেই নরককে পণ্ডিতেরা অন্ধতামিস্র বলেন।” ৩/রৌরব নরকঃ যত্ত্বিহ বা এতদহমিতি মমেদমিতি ভূতদ্রোহেণ কেবলং স্বকুটুম্বমেবানুদিনং প্রপুষ্ণাতি স তদিহ বিহায় স্বয়মেব তদণ্ডভেন রৌরবে নিপততি ॥১০৷৷ যে ত্বিহ যথৈবামুনা বিহিংসিতা জন্তবঃ পরত্র যমযাতনামুপগতং ত এব রুরবো ভূত্বা তথা তমেব বিহিংসন্তি তস্মাস্ত্রেীরবমিত্যাহুঃ রুরুরিতি সর্পদিতিক্রুরসত্ত্বস্যাপদেশঃ ॥ ১১ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১০-১১) অনুবাদঃ”যে ব্যক্তি তার জড় দেহটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে, তার নিজের দেহ এবং দেহের সম্পর্কে সম্পর্কিত আত্মীয়-স্বজনদের ভরণ-পোষণের জন্য দিনের পর দিন অপর প্রাণীর হিংসা করে, সেই ব্যক্তি মৃত্যুর সময় তার দেহ এবং আত্মীয়-স্বজনদের পরিত্যাগ করে, প্রাণী হিংসাজনিত পাপের ফলে রৌরব নরকে নিপতিত হয়।এই জীবনে যে হিংসা-পরায়ণ ব্যক্তি অন্য প্রাণীদের যন্ত্রণা দেয়, মৃত্যুর পর যখন সে তার কৃত কর্মের ফলে যম-যাতনা প্রাপ্ত হয়, তখন সেই সমস্ত প্রাণীসমূহ, যাদের হিংসা করা হয়েছে, তারা ‘রুরু’ হয়ে তাকে পীড়া দেয়। এই জন্য পণ্ডিতেরা সেই নরককে রৌরব নরক বলেন। রুরু প্রাণীকে এই পৃথিবীতে দেখা যায় না, তারা সর্পের থেকেও হিংস্র।” ৪/মহারৌরব নরকঃ এবমেব মহারৌরবো যত্র নিপতিতং পুরুষং ক্রব্যাদা নাম রুরবস্তং ক্রব্যেণ ঘাতয়ন্তি যঃ কেবলং দেহন্তরঃ ॥ ১২ –(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১২) অনুবাদঃ”যারা অন্যদের কষ্ট দিয়ে নিজেদের দেহ ধারণ করে, তাদের মহারৌরব নরকে দণ্ডভোগ করতে হয়। সেই নরকে ক্রব্যাদ নামক রুরু পশুরা তাদের যন্ত্রণা দিয়ে মাংস আহার করে।” ৫/কুম্ভিপাক নরকঃ যস্ত্বিহ বা উগ্রঃ পশুন পক্ষিণো বা প্রাণত উপরন্ধয়তি তমপকরুণং পুরুষাদৈরপি বিগর্হিতমমূত্র যমানুচরাঃ কুম্ভীপাকে তপ্ততৈলে উপরন্ধয়ন্তি । ১৩ ॥ –(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৩) অনুবাদঃ “যে সমস্ত নিষ্ঠুর মানুষ তাদের দেহ ধারণের জন্য এবং জিহ্বার তৃপ্তি সাধনের জন্য নিরীহ পশু-পক্ষীকে হত্যা করে রন্ধন করে, সেই প্রকার ব্যক্তিরা নর- মাংসভোজী রাক্ষসদেরও ঘৃণিত। মৃত্যুর পর যমদূতেরা কুন্তীপাক নরকে ফুটন্ত তেলে তাদের পাক করে।” ৬/কালসূত্র নরকঃ যস্ত্বিহ ব্রহ্মধ্রুক্ স কালসূত্রসংজ্ঞকে নরকে অযুতযোজনপরিমণ্ডলে তাম্রময়ে তপ্তখলে উপর্যধস্তাদগন্যর্কাভ্যামতিতপ্যমানেহভিনিবেশিতঃ ক্ষুৎপিপাসাভ্যাং চ দহ্যমানান্তবহিঃশরীর আস্তে শেতে চেষ্টতেহবতিষ্ঠতি পরিধাবতি চ যাবন্তি পশুরোমাণি তাবদ্বর্ষসহস্রাণি ॥ ১৪ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৪) অনুবাদঃ” ব্রহ্মঘাতীকে কালসূত্র নামক নরকে নিক্ষেপ করা হয়, যার পরিধি ৮০,০০০ মাইল এবং যা তাম্রনির্মিত। নীচ থেকে অগ্নি এবং উপর থেকে প্রখর সূর্যের তাপে সেই তাম্রময় ভূমি অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়। সেখানে ব্রহ্মঘাতীকে অন্তরে এবং বাইরে দগ্ধ করা হয়। অন্তরে সে ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় দগ্ধ হয় এবং বাইরে সে প্রখর সূর্যকিরণ ও তপ্ত তাম্রে দগ্ধ হতে থাকে। তাই যে কখনও শয়ন করে, কখনও উপবেশন করে, কখনও উঠে দাঁড়ায় এবং কখনও ইতস্তত বিচরণ করে। এইভাবে একটি পশুর শরীরে যত লোম রয়েছে, তত হাজার বছর ধরে তাকে যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়।” ৭/অসিপত্রবন নরকঃ যস্ত্বিহ বৈ নিজবেদপথাদনাপদ্যপগতঃ পাখগুং চোপগতস্তমসিপত্রবনং প্রবেশ্য কশয়া প্রহরস্তি তত্র হাসাবিতস্ততো ধাবমান উভয়তোধারৈস্তালবনাসিপত্রৈশ্ছিদ্যমানসর্বাঙ্গো হা হত্যেহম্মীতি পরময়া বেদনয়া মূর্ছিতঃ পদে পদে নিপততি স্বধর্মহা পাখণ্ডানুগতং ফলং ভুঙক্তে ।। ১৫৪।। -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৫) অনুবাদঃ” আপৎকাল উপস্থিত না হলেও যে ব্যক্তি স্বীয় বেদমার্গ থেকে ভ্রষ্ট হয়ে পাষণ্ড ধর্ম অবলম্বন করে, যমদূতেরা তাকে অসিপত্রবন নামক নরকে নিক্ষেপ করে বেত্রাঘাত করতে থাকে। প্রহারের যন্ত্রণায় সে যখন সেই নরকে ইতস্তত ধাবিত হয়, তখন উভয় পার্শ্বের অসিতুল্য তালপত্রের ধারে তার সর্বাঙ্গ ক্ষত-বিক্ষত হয়। তখন সে “হায়, আমি এখন কি করব। আমি এখন কিভাবে রক্ষা পাব।” এই বলে আর্তনাদ করতে করতে পদে পদে মূর্ছিত হয়ে পড়তে থাকে। স্বধর্ম ত্যাগ করে পাষণ্ড মত অবলম্বনের ফল এইভাবে ভোগ করতে হয়।” ৮/সূকরমূখ যস্ত্বিহ বৈ রাজা রাজপুরুষো বা অদণ্ড্যে দণ্ডং প্রণয়তি ব্রাহ্মণে বা শরীরদণ্ডং স পাপীয়ান্নরকেহ মুত্র সুকরমুখে নিপততি তত্রাতি- বলৈবিনিষ্পিষ্যমাণাবয়বো যথৈবেহেক্ষুখণ্ড আর্তস্বরেণ স্বনয়ন্ কচিক্ষুর্জিতঃ কশ্মলমূপগতো যথৈবেহাদৃষ্টদোষা উপরুদ্ধাঃ ॥ ১৬ ॥ -(শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/১৬) অনুবাদঃ” ইহলোকে যে রাজা বা রাজপুরুষ দণ্ডদানের অযোগ্য
ঈশ্বর সাকার নাকি নিরাকার???

যারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে স্বীকার করে তাদের বলা হয় আস্তিক।সনাতন ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ বেদ বা শ্রুতি।বেদ প্রধানত চার প্রকার-ঋগ্,যর্জু(শুক্ল,কৃষ্ণ),সাম, অথর্ব।আবার প্রতিটি বেদের চারটি অংশ -সংহিতা,ব্রাহ্মণ,আরণ্যক,উপনিষদ।বেদ ছাড়াও সনাতন ধর্মের আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মগ্রন্থ হল-স্মৃতি,ইতিহাস(রামায়ণ, মহাভারত),পুরাণ,শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা,পঞ্চরাত্র ইত্যাদি। সমগ্র সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে সৃষ্টিকর্তা- ঈশ্বর,পরমেশ্বর, পরমব্রহ্ম, পরমাত্মা,ভগবান ইত্যাদি নামে পরিচিত। বেদ সহ সমগ্র সনাতনী শাস্ত্রে সে ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা হলেন সাকার( চিন্ময় ইন্দ্রিয়সম্পন্ন) এবং নিরাকার(জড় ইন্দ্রিয়শূণ্য) উভয়ই। সাকার শব্দের অর্থ হল যার আকার বা ইন্দ্রিয় বা রুপ রয়েছে।অথাৎ সাকার শব্দে যিনি মস্তক,চক্ষু, কর্ণ,হস্ত,পদ ইত্যাদি ইন্দ্রিয় বা রূপ বা আকার সমন্বিত। এবং নিরাকার শব্দের অর্থ হল যার আকার বা রুপ বা ইন্দ্রিয় নেই।অথাৎ নিরাকার শব্দে যিনি মস্তক(মাথা),চক্ষু(চোখ),কর্ণ( কান), হস্ত(হাত),পদ(পা) ইত্যাদি ইন্দ্রিয় বা রূপ সমন্বিত নয়।ঈশ্বর সাকার নাকি নিরাকার এ সম্পর্কে শুক্ল যজুর্বেদীয় বৃহদারণ্যক উপনিষদ এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা শাস্ত্রে স্পষ্ট ধারনা প্রদান করা হয়েছে। “দ্বে বাব ব্রহ্মণো রুপে মূর্তং চৈবামূতং। চ মর্ত্যং চামৃতং চ স্থিতং চ যচ্চ সচ্চ ত্যচ্চ।।” –বৃহদারণ্যক উপনিষদ ২/৩/১(শুক্ল যজুর্বেদ) অনুবাদঃ”ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের দুটি রুপ-মূর্ত ( মূর্তিমান বা সাকার) এবং অমূর্ত(অমূর্তিমান বা নিরাকার)। তিনি মর্ত্য ও অমৃত।তিনি স্থিতিশীল, গতিশীল,সৎ(সত্তাশীল) এবং ত্যৎ(অব্যক্ত)।” সর্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্ । অসক্তং সর্বভৃচৈব নির্গুণং গুণভোক্তৃ চ ॥ -(গীতা ১৩/১৫) শব্দার্থঃ সর্ব- সমস্ত,ইন্দ্রিয়-ইন্দ্রিয়ের, গুণ-গুণের, আভাসম্-প্রকাশক,সর্ব-সমস্ত,ইন্দ্রিয়-ইন্দ্রিয়,বিবর্জিতম্-রহিত,অসক্তম্-আসক্তি রহিত, সর্বভৃৎ-সকলের পালক, চ-এবং, এব-অবশ্যই, নির্গুণম-জড় গুণরহিত, গুণভোক্তৃ-সমস্ত গুণের ঈশ্বর ,চ-ও। অনুবাদঃ “সেই ঈশ্বর সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রকাশক, তবুও তিনি সমস্ত ইন্দ্রিয় বিবর্জিত। যদিও তিনি সকলের পালক তবুও তিনি সম্পূর্ণ অনাসক্ত। তিনি প্রকৃতির গুণের অতীত, তবুও তিনি সমস্ত গুণের ঈশ্বর।” উপরোক্ত শুক্ল যজুর্বেদীয় বৃহদারণ্যক উপনিষদ ২/৩/১ এর মতই শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৩/১৫ নং শ্লোক অনুসারে ঈশ্বর হলেন সাকার বা রুপ বা ইন্দ্রিয় সমন্বিত, এবং একইসাথে সে ঈশ্বর হলেন নিরাকার বা রুপহীন বা ইন্দ্রিয়শূণ্য।এ বিষয়ে “শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ” গ্রন্থের গীতা ১৩/১৫ নং শ্লোকের তাৎপর্যে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) প্রতিষ্ঠাতা আচার্য শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ বর্ণনা করেন- “পরমেশ্বর ভগবান যদিও সমস্ত জীবের সমস্ত ইন্দ্রিয়ের আঁধার কিন্তু তাদের মতো তাঁর ইন্দ্রিয় জড় নয়। প্রকৃতপক্ষে জীবাত্মারও(আত্মা) চিন্ময় ইন্দ্রিয় আছে,কিন্তু বদ্ধ অবস্থায় তারা জড় গুণের দ্বারা আচ্ছাদিত।তাই জড়ের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়ের কার্যকলাপ প্রকাশ হতে দেখা যায়। পরমেশ্বর ভগবানের ইন্দ্রিয়গুলি এইরকম আচ্ছাদিত নয়। তাঁর ইন্দ্রিয়গুলি অপ্রাকৃত এবং তাই তাদের বলা হয় নির্গুন। আমাদের হৃদয়ঙ্গম করতে হবে যে, তাঁর (ঈশ্বর)ইন্দ্রিয়গুলি ঠিক আমাদের মত নয়। আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয়জাত কর্মের উৎস যদিও তিনি, কিন্তু তাঁর ইন্দ্রিয়গুলি দিব্য ও কলুষমুক্ত। সেই কথা শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে (৩/১৯) ‘অপাননিপাদো জবনো গ্রহীতা’ খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পরমেশ্বর ভগবানের জড় জাগতিক কলুষযুক্ত কোন হাত নেই, কিন্তু তবুও তাঁর হাত আছে এবং সে হাত দিয়ে তিনি তাঁর উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত সমস্ত নৈবেদ্য গ্রহণ করেন। এটিই হচ্ছে বদ্ধ জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে পার্থক্য। ভগবানের জড় চক্ষু নাই কিন্তু তার চক্ষু আছে- তা না হলে তিনি দেখতে পান কি করে? তিনি অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছু দেখতে পান। তিনি সমস্ত জীবের হৃদয়ে বিরাজ করেন এবং অতীতেই আমরা কি করেছি, এখন আমরা কি করছি এবং আমাদের ভবিষ্যতে কি হবে তা সবই তিনি জানেন। “ সুতারাং বেদ ইত্যাদি সনাতনী শাস্ত্র অনুসারে ঈশ্বর হলেন সাকার,কারন তিনি চিন্ময় বা অপ্রাকৃত ইন্দ্রিয় সমন্বিত। আবার অন্যদিকে ঈশ্বর নিরাকার কারন তার কোন জড় জাগতিক বা জড় কলুষযুক্ত ইন্দ্রিয় নেই,কেননা তার ইন্দ্রিয়সমূহ অপ্রাকৃত। বৈদিক শাস্ত্রে অনভিজ্ঞ কিছু ব্যক্তি বেদাদি শাস্ত্র সম্পূর্ণভাবে অধ্যয়ন না করে অথবা বেদে বর্ণিত ঈশ্বরের নিরাকার তত্ত্বকে স্বীকার করে বেদের যে যে মন্ত্রে ঈশ্বরকে সাকার বলা হয়েছে সেসমস্ত বর্ণনা সমূহকে সরাসরি বা মূখ্য অর্থে অনুবাদ না করে গৌণ বা নিজেদের কাল্পনিক মতবাদে অনুবাদ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করছে যে ঈশ্বর কখনো সাকার নয়,তিনি নাকি শুধুই নিরাকার।অথচ বেদ অনুসারে ঈশ্বর সাকার ও নিরাকার উভয়ই। এরা সনাতন ধর্ম প্রচার ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞানকে হাতিয়ার বা প্রামানিক হিসেবে প্রচার করে,অথচ আধুনিক বিজ্ঞান অনুসারে মস্তক,হস্ত,পদ ইত্যাদি ইন্দ্রিয় সমন্বিত কাউকে যদি স্বীকার করা না হয়, তাহলে তা প্রাণ বা অস্তিত্বশূণ্য।পৃথিবীতে এমন কোন প্রাণযুক্ত বিষয় দেখা যাবে না,যেটির ইন্দ্রিয় বা আকার নেই।যেমন বলা যায়,কেউ বলল ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীনরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী হলেন মস্তক,হস্ত,পদ ইত্যাদি ইন্দ্রিয়হীন ব্যাক্তি।তাহলে কেউ বা কারো কথায় কেউ তা মেনে নিবে না বরং তাকে সকলে পাগল বলবে।ঠিক তেমনই যার কোন ইন্দ্রিয় বা দেহ বা রুপ নেই তাঁর যেমন কোন অস্তিত্ব থাকতে পারে না, ঠিক তেমনই যে বা যারা ঈশ্বরকে অপ্রাকৃত ইন্দ্রিয়শূণ্য মনে করে তাদের সে ঈশ্বর ধারণা হল ভ্রান্ত, তা কখনো সনাতনী শাস্ত্র অনুমোদন করে না। তাই শুক্লযজুর্বেদীয় ঈশোপনিষদের আবাহন মন্ত্রে বলা হয়েছে, ঈশ্বর হলেন সর্বতোভাবে পূর্ণ “ওঁ পূর্ণমদঃ পূর্ণমিদং পূর্ণাৎ পূর্ণমুদচ্যতে। পূর্ণস্য পূর্ণমাদায় পূর্ণমেবাবশিষ্যতে ॥”। অথাৎ ঈশ্বরের মধ্যে কোনো অপূর্ণতা নেই,কেননা ঈশ্বর পরিপূর্ণ । সুতরাং ঈশ্বর কখনোই সাকার হতে পারেন না, শুধুই ঈশ্বরের পরিচিতি হল তিনি নিরাকার, ঈশ্বর সমন্ধে এ ধরণের অপপ্রচার যারা করছেন, আমাদের মতে তাদের এ ধরনের প্রচার তাদের বেদ সমন্ধে অজ্ঞতারই পরিচায়ক। আবার বেদে ঈশ্বরকে সর্বশক্তিমান বলা হয়েছে। তিনি হলেন সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের সবকিছুরই পরম কর্তা। তাই তাদের ধারনা অনুসারে ঈশ্বর যদি রূপহীন বা ইন্দ্রিয়হীন হন তবে কি তাতে তাঁর সর্বশক্তিমত্তা খর্ব করা হয় না? আবার, আরেক দিক থেকে, আমরা সকলেই সাকার, আমাদের রূপ বা ইন্দ্রিয় রয়েছে, আমাদের পিতার রূপ রয়েছে, তার পিতারও রুপ ছিল, এটাই স্বাভাবিক। তবে যিনি সকলের আদি পিতা,যিনি হলেন সকলের পরম প্রভু পরমেশ্বর ভগবান, তিনি কি করে রূপহীন বা ইন্দ্রিয়হীন হবেন? অবশ্যই তাঁরও রূপ রয়েছে।আবার, সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই তাঁর সৃষ্টি অপেক্ষা কম গুণসম্পন্ন নন।সুতারাং ঈশ্বর, সর্বতোভাবে পূর্ণ তাঁর মধ্যে কোনো কমতি বা অভাব থাকবে না। সেজন্য তাঁর এ পূর্ণতা হেতু অবশ্যই ঈশ্বর সাকার অথাৎ তাঁর রূপ বা ইন্দ্রিয় রয়েছে, এটিই যুক্তিযুক্ত এটিই স্বাভাবিক। এখন আমরা বেদ শাস্ত্র থেকে বহুবিধ প্রমান সহকারে ঈশ্বর যে সাকার বা আকার বা রুপ বা ইন্দ্রিয়বিশিষ্ট সে সমন্ধে আলোচনা করব। বেদের শিক্ষায় ঈশ্বর সাকারঃ दि॒वो वा॑ विष्णऽउ॒त वा॑ पृथि॒व्या म॒होवा॑ विष्णऽउ॒रोर॒न्तरि॑क्षात्। उभा हि हस्ता॒ वसु॑ना पृ॒णस्वा प्रय॑च्छ॒ दक्षि॑णा॒दोत स॒व्याद्विष्ण॑वे त्वा ॥ দিবো বা বিষ্ণো উত বা পৃথিব্যা মহো বা বিষ্ণু উরোরন্তরিক্ষাৎ। উভো হি হস্তা বসুনা পূনস্বা প্রযচ্ছ দক্ষিণাদোত সব্যাদ্বিষ্ণবে দ্বা।। -(শুক্ল যজুর্বেদ ৫।১৯) “হে বিষ্ণু(ঈশ্বর),তুমি দ্যুলোক অথবা ভূলোক হতে কিংবা মহান বিস্তৃত অন্তরিক্ষলোক হতে, তোমার উভয় হস্ত ধনের দ্বারা পূর্ণ কর। এবং দক্ষিণ অথবা বাম হস্তে আমাদের দান কর।” हिरण्मयेन पात्रेण सत्यस्यापिहितं मुखम् । तत्त्वं पूषन्नपावृणु सत्यधर्माय दृष्टये ॥ হিরন্ময়েন পাত্রেন সত্যস্যাহপিহিতং মুখম। তৎ ত্বং পুষন্নপাবৃনু সত্যধর্মায় দৃষ্টয়ে।।” – (ঈশোপনিষদ ১৫,শুক্ল যজুর্বেদ) “হে প্রভু,হে সর্বজীবপালক,আপনার উজ্জ্বল জ্যোতির দ্বারা আপনার শ্রীমুখ আচ্ছাদিত।কৃপা করে সেই আচ্ছাদন দূর করুন এবং যাতে আমরা আপনাকে দেখতে পারি।” पूषन्नेकर्षे यम सूर्य प्राजापत्य व्यूह रश्मीन् समूह
স্বর্গ কি? স্বর্গ সম্পর্কে আলোচনা করুন। কেন মুক্তিকামী ব্যক্তি স্বর্গলোক কামনা করে না ???

আজকাল কিছু শাস্ত্রজ্ঞানহীন ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার করছে যে, স্বর্গ ও নরক নামে নাকি কোন কিছু নেই।তাদের কথা শুনলে আমাদের হাসি পায়।কারন সনাতনী সমগ্র শাস্ত্রে স্বর্গ এবং নরক সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে। নিম্নে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হল- স্বর্গঃ স্বর্গ হল জীবের পুন্যফলে লভ্য চতুর্দশ ভুবনের মধ্যে একটি সুখময় স্থান। বেদ(শ্রুতি),স্মৃতি,ইতিহাস(মহাভারত, রামায়ন) শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা , অষ্টাদশ পুরাণ, পঞ্চরাত্র ইত্যাদি বিভিন্ন শাস্ত্রে স্বর্গের বর্ণনা পাওয়া যায়।শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৩৮ নং শ্লোকে চতুর্দশ ভূবন বিশিষ্ট এই ব্রহ্মান্ডের কথা আলোচনা করা হয়েছে। অথাৎ আমাদের এই ব্রহ্মান্ডে রয়েছে ৭ টি উদ্ধলোক ও ৭ টি অধঃলোক। ব্রহ্মান্ডের ৭ টি উদ্ধলোক সমূহ হল – ভূলোক( পৃথিবী),ভূবলোক, স্বর্গলোক(ইন্দ্রলোক), মহলোক, জনলোক, তপলোক এবং সত্যলোক(ব্রহ্মলোক)। এবং ৭ টি অধলোক হল -অতল,বিতল,সুতল,তলাতল, রসাতল, মহাতল এবং পাতাল। “এতাবানেবান্ডকোশো যশ্চতুর্দশধা পুরাণেষু বিকল্পিত উপগীয়তে” – (শ্রীমদ্ভাগবত ৫/২৬/৩৮) ঋগ্বেদের ৩/৬২/১০ মন্ত্রে এ ব্রহ্মান্ডের উদ্ধলোকের তিনটি লোকের মধ্যে স্বর্গলোকের বিবরন পাওয়া যায়। “ওঁ ভূর্ভুবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং ভর্গো দেবস্য ধীমহি। ধিয়ো য়ো নঃ প্রচোদয়াৎ।” -ঋগ্বেদ ৩/৬২/১০ অনুবাদঃ “যিনি ভুলোক,ভুবলোক এবং স্বর্গলোক এই ত্রিলোকের স্রষ্টা,অথাৎ সমস্ত বিশ্বলোকের প্রসবিতা, সেই সচ্চিদানন্দঘন পরমব্রহ্মের বরনীয় জ্যোতিকে আমরা ধ্যান করি।তিনি আমাদের মন ও বুদ্ধিকে শুভ কার্যে প্রেরনা প্রদান করুন।” এছাড়াও বেদের বহু মন্ত্রে স্বর্গলোকের বর্ণনাপাওয়া যায়।ভগবদগীতা ২/২ নং শ্লোকে পরমাত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে স্বর্গলোক বা ইন্দ্রলোক সম্পর্কে বর্ণনা প্রদান করেন। “কুতস্ত্বা কশ্মলমিদং বিষমে সমুপস্থিতম্। অনার্যজুষ্টমস্বর্গ্যমকীর্তিকরমর্জুন।।” -(ভগবদগীতা ২/২,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ”প্রিয় অর্জুন, এই ঘোর সঙ্কটময় যুদ্ধস্থলে যারা জীবনের প্রকুত মূল্য বোঝে না, সেই সব অনার্যের মতো শোকানল তোমার হৃদয়ে কিভাবে প্রজ্বলিত হল? এই ধরনের মনোভাব তোমাকে স্বর্গলোকে উন্নীত করবে না, পক্ষান্তরে তোমার সমস্ত যশরাশি বিনষ্ট করবে।” “ত্রৈবিদ্যা মাং সোমপাঃ পূতপাপা যজ্ঞৈরিষ্ট্বা স্বর্গতিং প্রার্থয়ন্তে। তে পুন্যমাসাদ্য সুরেন্দ্রলোকম্ অশ্নন্তি দিব্যান্ দিবি দেবভোগান্।।” (গীতা ৯/২০,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ “ত্রিবেদজ্ঞগণ যজ্ঞানুষ্ঠান দ্বারা আমাকে আরাধনা করে যজ্ঞাবশিষ্ট সোমরস পান করে পাপমুক্ত হন এবং স্বর্গে গমন প্রার্থনা করেন। তাঁরা পুণ্যকর্মের ফলস্বরূপ ইন্দ্রলোক লাভ করে দেবভোগ্য দিব্য স্বর্গসুখ উপভোগ করেন।” “তে তং ভুক্ত্বা স্বর্গলোকং বিশালং ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি। এবং ত্রয়ীধর্মমনুপ্রপন্না গতাগতং কামকামা লভন্তে।।” (গীতা ৯/২১,ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ “তাঁরা সেই বিপুল স্বর্গসুখ উপভোগ করে পুণ্য ক্ষয় হলে মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন। এভাবেই ত্রিবেদোক্ত ধর্মের অনুষ্ঠান করে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের আকাঙ্ক্ষী মানুষেরা সংসারে কেবলমাত্র বারংবার জন্ম-মৃত্যু লাভ করে থাকেন।” উপরোক্ত আলোচনায় এভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় স্বর্গলোকের বর্ণনা প্রদান করেন,এবং সাথে সাথে স্বর্গকামীগনের অভিলাষিত স্বর্গলোকে গমন করার জন্য অনুৎসাহী করে গীতা ৭/৫ এবং গীতা ১৫/৬ নং শ্লোকে স্পষ্টভাবে তার স্বীয় ধাম চিন্ময় পরা প্রকৃতি গোলক বৃন্দাবন ও বৈকুন্ঠ ধামে ফিরে যাওয়ার জন্য আমাদের উৎসাহিত করেন,যেখানে গেলে আর কখনো আমাদের এই অপরা প্রকৃতি বা জড় জগতে ফিরে আসতে হবে না। “অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধিমে পরাম্। জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ।।” -(গীতা ৭/৫ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ “হে মহাবাহো! এই অপরা প্রকৃতি ( জড় জগৎ) ব্যতীত আমার আর একটি পরা প্রকৃতি(চিন্ময় জগৎ) রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য-স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জগৎকে ধারণ করে আছে।” ” ন তদ্ ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো ন পাবকঃ। যদ্ গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম।।” -(গীতা ১৫/৬ঃ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) অনুবাদঃ ” সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি বা বিদ্যুৎ আমার সেই পরম ধামকে আলোকিত করতে পারে না। সেখানে গেলে আর জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।” হরে কৃষ্ণ। প্রনাম। নিবেদন-স্বধর্মম্ : Connect to the inner self.