যজ্ঞ শব্দের অর্থ কি বিষ্ণু? যাজ্ঞিক শব্দের অর্থ কি বৈষ্ণব?

শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে “যজ্ঞ বৈ বিষ্ণু” যজ্ঞ হল স্বয়ং বিষ্ণু।তাই বেদ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ  কিছু ব্যক্তি বিশাল পন্ডিতের মত অপপ্রচার করছে বেদ অনুসারে বিষ্ণু মানে পরমেশ্বর নন,বিষ্ণু মানে যজ্ঞ। আর বৈষ্ণব মানে যাজ্ঞিক। তাই তাদের প্রচার অনুসারে তিলকধারী বৈষ্ণবকে  বেদে বৈষ্ণব বলা হচ্ছে না বরং যারা যাজ্ঞিক তাদের বুঝানো হচ্ছে।নিম্নোক্ত আলোচনায় তাদের অপপ্রচারের যথার্থ জবাব প্রদান করা হল।

বেদ অথাৎ শতপথ ব্রাহ্মণ অনুসারে বিষ্ণু শব্দে পরমাত্মা পরমেশ্বর বিষ্ণু,বৈষ্ণব শব্দে পরমেশ্বর বিষ্ণুর ভক্তকে বুঝানো হয়েছে। শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে “যজ্ঞ বৈ বিষ্ণু” যজ্ঞ হল স্বয়ং বিষ্ণু। কারন শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১.৩.১২ শ্লোকে বর্ণনা করা হয়েছে , যজ্ঞ হল ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতারের একটি নাম।তাই বিষ্ণুর একটি নাম হিসেবে যজ্ঞ শব্দটি বেদে বর্ণিত হয়েছে।

     ততঃ সপ্তম আকৃত্যাং রুচের্যজ্ঞোহভ্যজায়ত।

             -(শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ ১.৩.১২)
অনুবাদঃ সপ্তম অবতার হচ্ছেন প্রজাপতি রুচি ও তাঁর পত্নী আকৃতির পুত্র যজ্ঞ।

বিশ্লেষনঃ বেদে বর্ণিত বিষ্ণু,ইন্দ্র, সোম,ঈশান,শিব,রুদ্র,নারায়ন, বাসুদেব ইত্যাদি সমস্ত নাম এক পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের নাম।এ সম্পর্কে মহাভারতের শান্তি পর্বে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন-

শ্রীকৃষ্ণ উবাচঃ
ঋগ্বেদে সযজুর্বেদে তথৈবথর্বসামসু পুরাণে।
সোপনিষদে তথৈব জ্যোতিষে অর্জুন।। ৮।।
‎সাংখ্যে চ যোগশাস্ত্রে চ আয়ুর্বেদে তথৈব চ।
‎বহুনি মম নামানি কীর্তিতানি মহার্ষিভিঃ।। ৯।।
‎গৌণানি তত্র নামানি কর্মজানি চ কানি চিত।
‎নিরুক্তম কর্মজ্ঞম চ শৃণুস্ব প্রয়াতো অনঘ।। ১০।।

    -‎(মহাভারতঃ শান্তিপর্ব,মোক্ষধর্ম ৩২৭/৮-১০)

অনুবাদঃ শ্রীকৃষ্ণ বললেন, হে অর্জুন! ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, অথর্ববেদ, সামবেদ, পুরাণ, উপনিষদ, জ্যোতিষ, সাংখ্য শাস্ত্র, যোগশাস্ত্রে, আয়ুর্বেদে ঋষিরা অসংখ্য যেসব নাম উল্লেখ করেছেন, কিছু নাম আমার স্বরূপ সম্পর্কিত কিছু আমার কার্য্য সম্পর্কিত।হে পাপরহিত অর্জুন ! আমি তোমার কাছে সেই সব নাম ও তাদের মাহাত্ম্য বর্ণনা করছি, তুমি তা মনোযোগ সহকারে শ্রবণ কর

ছাদয়ামি জগদ্বিশ্বং ভূত্বা সূর্য্য ইবাংশুভিঃ।
সর্বভূতাধিবাসশ্চ বাসুদেবস্ততো হ্যহম্।। ৩৮।।
‎গতিশ্চ সর্বভূতানাং প্রজনশ্চাপি ভারত!।
‎ব্যাপ্তা মে রোদসী পার্থ ! কান্তিশ্চাভ্যধিকা মম।। ৩৯।
অধিভূতানি চান্তেষু তদিচ্ছংশ্চাস্মি ভারত।

ক্রমণাচ্চাপ্যহং পার্থ!বিষ্ণুরিত্যভিসংজ্ঞিতঃ।। ৪০।।

(মহাভারতঃ শান্তিপর্ব,মোক্ষধর্ম ৩২৭/৩৮-৪০)

অনুবাদঃ আমি সূর্যের ন্যায় হয়ে কিরণ দ্বারা সমগ্র জগৎ আচ্ছাদন করি, এই জন্য আমি বাসুদেব। অথবা আমি সর্বভূতের বাসস্থান বলে “বাসুদেব”। হে ভরতবংশীয় পৃথানন্দন ! আমি সর্বভূতের গতি বলে ” বিষ্ণু” ; কিংবা আমা হতেই সর্বভূত উৎপন্ন হয় বলে আমি “বিষ্ণু” ; অথবা আমি স্বর্গ ও মর্ত্য ব্যাপিয়া রয়েছি বলে “বিষ্ণু” কিংবা প্রলয়কালে আমি নিজদেহে সমস্ত ভূত প্রবেশ করাতে ইচ্ছা করি বলে আমি “বিষ্ণু” ; অথবা আমি বামন রূপে সমগ্র জগৎ আক্রমণ করেছিলাম বলে আমি বিষ্ণু নামে অভিহিত হয়ে থাকি।

সুতরাং উপরোক্ত আলোচনায় শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লেখিত বিষ্ণু শব্দটি পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে বুঝানো হয়েছে। এ সম্পর্কে  শতপথ ব্রাহ্মণে “যজ্ঞ বৈ বিষ্ণু ” অর্থে যজ্ঞ হল স্বয়ং বিষ্ণু।অথাৎ বিষ্ণু শব্দে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণকে নির্দেশ করে, যজ্ঞে শব্দে বিষ্ণুর একটি নামকে ইঙ্গিত করে।আর যারা যজ্ঞরুপী ভগবান বিষ্ণুর ভক্ত তাদের যাজ্ঞিক বা বৈষ্ণব বলা হয়েছে। অথাৎ যারা বর্তমানে দ্বাদশ অঙ্গে তিলকধারন করে ভগবান বিষ্ণুর প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত তারাই বৈষ্ণব।

আপনি যদি এরুপ ব্যাখাকে মানতে না চান তাহলেও বলতে হয় গীতা ৫/২৯ শ্লোক অনুযায়ী “শ্রীকৃষ্ণ হলেন সর্বপ্রকার যজ্ঞের পরম ভোক্তা।” ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন-

ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্।

-(গীতা ৫/২৯)
অনুবাদঃ আমি সমস্ত যজ্ঞ ও তপস্যার পরম ভোক্তা।

আর শ্রীকৃষ্ণ হলেন স্বয়ং বিষ্ণু। তাই যজ্ঞের পরম ভোক্তা বা লক্ষ্য হল স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বা বিষ্ণু।তাই যজ্ঞ শব্দে বিষ্ণুকে নির্দেশ করা হয়েছে। আর যারা চতুর্ভূজ বিষ্ণুকে পরমেশ্বররুপে জেনে তার প্রীতির জন্য যজ্ঞ অনুষ্ঠান করেন তিনি যাজ্ঞিক বা বৈষ্ণব। সুতরাং বেদ থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে,যারা পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু বা যজ্ঞরুপী বিষ্ণু অবতারের ভক্ত নয় তারা যাজ্ঞিক নয়। সুতরাং বিষ্ণু মানে পরমেশ্বর ভগবান বিষ্ণু,আর বৈষ্ণব মানে বিষ্ণু ভক্ত।

Sadgun Madhav Dash

Writer & Admin

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments